আচার্য চাণক্য কুটিল নীতির নয়, রাষ্ট্র নির্মাণের স্রষ্টা


সাম্প্রতিককালে সােশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ‘চাণক্য নামটা খুবই ট্রেন্ড হচ্ছে। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত, ফেসবুক, টুইটার, হােয়াটসঅ্যাপে যে পারছেন সেই বিশেষজ্ঞের মতাে চাণক্য এই বলেছেন, ওই বলেছেন বলে অনেক ভারী ভারী জ্ঞানের কথা শুনিয়ে দিচ্ছেন। যদিও তাদের মধ্যে। কতজন যে বিশেষজ্ঞ এবং চাণক্য সম্পর্কে কতটা কী জানেন, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ইউটিউবে। তাে হাজারাে ভিডিয়াের ছড়াছড়ি। যার মধ্যে প্রকৃত বিশেষজ্ঞের তথ্য ও বিশ্লেষণ সমৃদ্ধ ভিডিয়াের সংখ্যা। খুবই কম। আর সবার ওপর দিয়ে এক কদম এগিয়ে গেছেন গুটি কয়েক সংবাদপত্রের জনাকয়েক সর্বজ্ঞ। সাংবাদিক। তারা ভারতের প্রায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলেরই এক বা দু’জন করে ব্যক্তিকে সেই দলের অথবা। সেই দল যে পন্থার (দক্ষিণ/মধ্য/বাম) রাজনীতি করে, তার ‘চাণক্য বলে দেগে দিচ্ছেন। তা এতােই যখন। চাণক্যের ছড়াছড়ি বর্তমান ভারতে তাহলে আমাদের এই দেশটার এতাে দুর্দশা হয় কী করে? ইতিহাস বলে, পৃথিবীতে চাণক্য একজনই ছিলেন, সেই মহামতির জন্মভূমি থেকে কর্মভূমি সবই ছিল এই ভারতবর্ষ। তবে আজকের ভারতবর্ষ নয়, প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশ। যেখানে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশ, ব্রহ্মদেশ সবই ছিল এক অখণ্ড বিশাল ভারত ভূখণ্ডের অঙ্গ।
সােশ্যাল মিডিয়াতে অঢেল সময় ব্যয় করে যাঁরা চাণক্যের নামে বড়াে বড়াে বুলি কপচাচ্ছেন, তাঁদের কিছু বলার নেই। বাক্য ও মতামত প্রকাশের অধিকার সকলের আছে, ফলত যা খুশি বলার ওপরে একটা। অধিকার জন্মে গেছে। এর জন্য কোনও কর লাগে না। এদের মধ্যে আবার ছােটো-বড়াে একাধিক রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন মাপের নেতারাও আছেন। তারা আজকের চাণক্য হওয়ার দৌড়ে নেমে পড়েছেন। ‘সাম-দাম-দণ্ড-ভেদ’– এই চতুর্বিধ নীতিকে ব্যবহার করেন জনতার চোখে ধুলাে দিয়ে নিজেদের আখের গােছানাের কাজে। বিরােধীদের কুপােকাত করার কাজে। সে বিষয়ে তারা সিদ্ধহস্ত। কিন্তু মানুষের প্রতি তাদের দায়িত্ব বা দায়বদ্ধ থাকার প্রশ্নে অথবা রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, অখণ্ডতা ও সীমানাকে সর্বাগ্রে কেমন করে সুরক্ষিত রাখতে হবে, সেই বিষয়টা তাদের কাছে অনেক পেছনের সারিতে। রাষ্ট্রনা থাকলে যে সাধারণ মানুষ থেকে দলের নেতা, কারােরই কোনও স্বার্থ পূরণ হবে না, সেটা ক’জন মাথায় রাখেন? কিন্তু খ্রিস্টের জন্মের ৩৭০ বছর আগে রাষ্ট্রতত্ত্বের যে স্রষ্টা এই ভারতে জন্মেছিলেন, তিনি এই চতুর্বিধ নীতিকে সম্পূর্ণ ভাবে কাজে লাগিয়েছিলেন জনকল্যাণ, জনতার সামগ্রিক বিকাশ ও উন্নতি, রাষ্ট্রের কৃষি-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রশাসন ও রাজনীতির শুদ্ধিকরণ এবং অখণ্ড ভারতরাষ্ট্রের নির্মাণ ও তার সুরক্ষার কাজে। যেখানে শাসক রাজা সর্বোচ্চ কর্তব্যের অধিকারী হলেও শেষ পর্যন্ত প্রজার প্রকৃত সেবক হতে বাধ্য। আজকের ভােট প্রার্থী নয়। নাগরিকের কাছে চূড়ান্ত ভাবে দায়বদ্ধ। আজকের দিনে তা দলীয় স্বার্থ ও দলের সুপ্রিমাের কাছে। শাসকের কোনও ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই, নিহিত ক্ষেত্রে স্বার্থ বলে কিছু থাকতে পারে না। রাজধর্মের অনুশাসন তাঁকে পালন করতেই হবে, কারণ জনগণের হিত ও সুখেই শাসকের হিত ও সুখ। শাসক যদি সেই রাজধর্ম পালনে ব্যর্থ হন, নিজের আখের গােছাতে থাকেন, তাহলে তার কোনও অধিকার নেই সিংহাসনে বসে থাকার। আজকের দিনে ভারতীয় রাজনীতির কারবারিদের ক্ষেত্রে তা কার্যত ‘ডুমুরের ফুল।
একদা পশ্চিমবঙ্গে অনিল বিশ্বাসকে বলা হতাে সিপিআইএমের চাণক্য। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পামুলাপার্তি বেঙ্কট নরসিমহা রাওয়ের মৃত্যুর পর তাঁকেও সম্বােধন করতে শুনেছিলাম চাণক্য হিসেবে। শেষে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখােপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরে তাকেও বলা হলাে চাণক্য। কিন্তু নিখাদ সত্য হলাে— এঁরা প্রত্যেকেই নিজেদের কর্মকর্তব্যের সর্বোচ্চ স্থানে গেছেন, নিজেদের চূড়ান্ত যােগ্যতা ও কর্মদক্ষতাকে প্রমাণ করেছেন। অনেকেই চাণক্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন কিন্তু এঁরা কেউই চাণক্য নন। যাঁরা এঁদেরকে চাণক্য হিসেবে সম্বােধন করেছেন বা চাণক্যের সঙ্গে তুলনা করছেন, তাঁরা কার্যত চাণক্যকে যেমন অপমান করছেন, তেমনি একই সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠিত মানুষদেরকেও অপমান করছেন। কারণ এঁদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও দলীয় রাজনীতির অভ্যন্তরীণ যে বিস্তৃত পার্থক্য আছে, তাকে উপেক্ষা করে যাওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। যদিও তারা জানতেন উভয়ের অন্তর’কে। কিন্তু মহামতি চাণক্য এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। কারণ ২৩৬০ বছর আগে চাণক্য রাজনৈতিক ও রাজনীতির প্রভেদ কী এবং কখন উভয়ে একে-অপরের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বা পড়তে পারে, সেই ধারণার অভিজ্ঞতালব্ধ তাত্ত্বিক জ্ঞানকে লিপিবদ্ধ করে গেছেন অখণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষিতে। সুতরাং তার সঙ্গে এঁদের তুলনা যারা করেন, তাদের পাণ্ডিত্য নিয়ে প্রশ্ন তােলা উচিত।
ভারতের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের যােগ্য কাণ্ডারি শুধু নয়, মহামতি চাণক্য হলেন Philosopher of the state craft’। তিনি তাঁর অর্থশাস্ত্রের রাষ্ট্রের জনসমাজ সম্পর্কিত হেন বিষয় নেই, যাকে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন। R.A. Kangleর The Kautilya Arthasastra 268 263690, “Arthasastra is the science which is the means of the acquisition and protection of the earth’। পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় তক্ষশীলার ছাত্র তথা সেখানকারই আচার্য রূপে চাণক্য বিশ্বের তৎকালীন সভ্যতাগুলাের সামনে উপস্থিত করেছিলেন অপার শক্তিশালী মৌর্য সাম্রাজ্যকে, চন্দ্রগুপ্তের মতাে শাসককে তৈরি করেছিলেন সমাজের প্রান্তিক স্তর থেকে। ভারত কয়েক সহস্রাব্দ ধরে বহিঃশত্রুর আক্রমণের শিকার। শত্রুর আক্রমণের সামনে সুদৃঢ় ভাবে টিকে থাকতে গেলে অভ্যন্তরীণ রাজ্যগুলাের দ্বিধাদ্বন্দ্বকে ত্যাগ করে ঐক্যবদ্ধ ভারত গঠন করা ছাড়া আর কোনও উপায় যে নেই, তাতিনি দেখিয়েছেন প্রথম। রাজনীতির শুদ্ধিকরণের জন্য নিজের সমগ্র জীবন দান করেছেন। তার রাজনীতি ধর্মের প্রধান্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে, যে ‘ধর্ম পশ্চিমের সম্প্রদায় ভিত্তিক রিলিজিয়ন নয়, সম্পূর্ণ রূপে ভারতীয়। যেখানে ন্যায়, নীতি, কর্তব্য, উত্তর-দায়িত্ব হলাে মুখ্য। রিলিজিয়নের ভারতীয় সমার্থক শব্দ রূপে ‘ধর্ম’কে ইংরেজরা চিহ্নিত করেছেন। চাণক্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাহিত্যে প্রথম একটি কেন্দ্রীভূত ও শক্তিশালী সরকারের পরিচয় প্রকাশ করেন। অর্থশাস্ত্রেই প্রথম রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ও প্রকৃতি সংক্রান্ত বিস্তারিত আলােচনা পাওয়া যায়। তিনিই প্রথম রাষ্ট্রের ও বৃহত্তর সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজা (শাসকের অপরিহার্য গুণাগুণ ও যােগ্যতা, সর্বোচ্চ ভূমিকা), মন্ত্রী ও আমলাতন্ত্রের, জনপদের গুরুত্ব, রাজকোষ, বিচারব্যবস্থা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলােচনা করেছেন। রাষ্ট্রের নিজস্ব অতি দক্ষ-শিক্ষিত গুপ্তচর বাহিনী থাকা কেন প্রয়ােজন, তা কবেই নথিভুক্ত করেছেন। আইনের অনুশাসন, জনকল্যাণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিরিখে শাসনব্যবস্থার মানকে বিচার করার সূত্র দিয়েছেন।
পাশ্চাত্য শিক্ষা জানিয়েছে, ম্যাকিয়াভেলি (১৫১৬) হলেন আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক। চাণক্য হলেন ভারতের ম্যাকিয়াভেলি। কিন্তু দুজনের মধ্যে প্রায় ১৯০০ বছরের তফাত। ভারতীয় বহু গ্রন্থের প্রতিলিপি বিদেশিদের মাধ্যমে আরব দুনিয়া ও ইউরােপে ছড়িয়েছে। আবার আক্রমণকারীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অজস্র পাণ্ডুলিপি অনেক কিছু জ্বালিয়েছে। অতীতের প্রভাব ভবিষ্যতের ওপরে পড়তে পারে, কিন্তু অতীতকে ভবিষ্যতের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। চাণক্য কখনােই ম্যাকিয়াভেলি হতে পারেন না, কারণ চাণক্য অ্যারিস্টটলের সমসাময়িক। জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রেও জেনেছি উড্রো উইলসন হলেন জনক। কিন্তু ২৩০০ বছর আগে ভারতে যে বিশাল জনপ্রশাসন ব্যবস্থা বিস্তার করেছিল তাতে চাণক্যের কী ভূমিকা ছিল তার প্রমাণ প্রমথনাথ ব্যানার্জির Public Administation in Ancient India, K.K. Mishra-7 Police Administation in Ancient India-সহ আরও অজস্র গ্রন্থ। রাষ্ট্রের যে স্বতন্ত্র পররাষ্ট্রনীতি ও তাকে পরিচালনা করার জন্য দক্ষ কূটনীতির প্রয়ােজন, তা প্রথম চাণক্য রচনা করেন, যখন আজকের ইউরােপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও অস্তিত্বই ছিল না।
সংসদীয় ব্যবস্থায় দুজন শাসক সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হলেন – রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। বাস্তবে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মেনেই কাজ করেন। প্রণব মুখােপাধ্যায়কে রাষ্ট্রপতির সর্বোচ্চ পদে তাঁর দল কংগ্রেস বসিয়েছিল, তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে। যদিও প্রণব মুখােপাধ্যায় নিজে কয়েকবার (প্রধানত ২০০৪-২০১৪) প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে থেকে সিংহাসনে বসতে গিয়েও শেষ অব্দি বসতে পারেননি। কেন, সবাই জানেন, রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের পথে যেন কোনও বাধা না আসে। অজয় মুখােপাধ্যায়, সতীশ সামন্তের বাংলা কংগ্রেস থেকে যাত্রা শুরু করে সিদ্ধার্থশংকর রায়ের হাত ধরে প্রণব মুখােপাধ্যায়ের কংগ্রেসের রাজনীতিতে আসা। পরবর্তী সময়ে নিজের জ্ঞান, তুখােড় উপস্থিত বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা, বাগ্মিতা, রাজনীতির অনুশীলন ও ধৈর্যের সাহায্যে ১৯৮০-র দশকে ইন্দিরা গান্ধীর অন্যতম পরামর্শদাতা ও অর্থদপ্তর-সহ পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রের মতাে একাধিক দপ্তরের মন্ত্রী হয়ে ভারতের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রনির্মাণের কাজে অবদান রেখেছেন। কিন্তু দলীয় হাইকমান্ডের সঙ্গে মতবিরােধ হওয়ার জেরে কংগ্রেস ছেড়ে তাঁকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল রাজীব গান্ধীর অমলে। আবার বাস্তববাদী ছিলেন বলেই, সমস্ত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। দলীয় ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজের প্রভাব ফেললেও রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে পর্যন্ত, নিজের দর্শন ও পার্টি লাইনের বিরুদ্ধে যেতে পারেননি। এমনকী, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সভাতে যাবেন কেন বা গিয়ে কী বলবেন, সে নিয়েও তার দল থেকেই অনেক আতঙ্কমাখা শ্লেষ। উঠতে দেখা যায়।
নরসিমহা রাও ভারতের একমাত্র সংখ্যালঘু সরকারের মুখিয়া ছিলেন, যে সরকার পুরাে পাঁচ বছর শুধু ক্ষমতায় ছিল তাই নয়, পণ্ডিত নেহরুর আমল থেকে চলে আসা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কাঠামােকেই মূল সমেত উৎপাটিত করে। দু’হাত বাড়িয়ে উদারিকরণ, বেসরকারিকরণ, বিশ্বায়নের ত্রিশক্তিকে ভারতে স্বাগত জানায়, দেউলিয়া হতে চলা ভারতীয় অর্থনীতিকে বাঁচানাের জন্য। নতুন ভারতের নতুন অর্থনীতির জনক তিনি। কারণ প্রধানমন্ত্রী যদি বাস্তব প্রয়ােজনকে চিনতে না পারেন, তাহলে কোনও মন্ত্রী একক ভাবে রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করতে পারেন না। শেষ কথা প্রকৃত শাসকই বলবেন। গােপনীয়তাকে ত্যাগ করে প্রকাশ্যে ইজরায়েলে প্রথম ভারতীয় দূতাবাস গড়ে তােলেন, প্রথম পূর্ব-এশিয়ার দিকে সামগ্রিক ভাবে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এগিয়ে যান। সমাজতন্ত্রের পতনকে আঁচ করে আমেরিকার সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গঠনে উদ্যোগী হন। এসবের পরেও তিনি সম্প্রদায়িকতা ও দুর্নীতির অভিযােগ বিদ্ধ হয়েছেন, হর্ষদ মেহেতা কেসে তার নাম জড়িয়েছে। সােনিয়া গান্ধী কংগ্রেসের ব্যাট হাতে নেওয়ার পর তাঁর গতি কী হলাে, সে সবাই দেখেছেন। আসলে তিনিও দলীয় সীমারেখার বাইরে বেরিয়ে আসতে পুরােপুরি পারেননি, চেষ্টা করার ফল হাতেনাতে পেয়েছিলেন।
অনিল বিশ্বাস তাে কখনাে চাণক্য হতেই পারেন না। তিনি যে আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, সেখানে রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়। রাষ্ট্রকে শ্রেণী শােষণের যন্ত্র রূপে দেখা হয়। রাষ্ট্রের ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে সমাজতন্ত্র কায়েম হবে আশা করা হয়। আমলাতন্ত্রকে মার্কস প্যারাসাইটিক নেচার অব জার্মের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিপ্লব বা বন্দুকের নল দিয়ে লেনিন বা মাও যে সমাজতন্ত্র কায়েম করেছিলেন তা মহামতি চাণক্যেরশাসনতন্ত্র ও জনকল্যাণের সম্পূর্ণ বিপরীত। কমিউনিজমের কাছে সবার ওপরে দল কিন্তু কৌটিল্যের কাছে রাষ্ট্রের সামগ্রিকতা। সমাজের সর্বস্তরে (বিশেষত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে) দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও আনুগত্য কায়েম করার ক্ষেত্রে তিনি সিদ্ধহস্ত হলেও তাঁর সেই কুটিল কৌশল কৌটিল্য শব্দের সঙ্গে তুলনীয় নয়।
স্বাধীনতার পর পণ্ডিত নেহরু ভারতের বিদেশনীতি, অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি নির্মাণে মার্কসীয় নির্ভরতা তত্ত্বের উদগাতা অন্দরে গুন্ডাদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এক্ষেত্রে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নাস্তি। বিচ্ছন্নতা ছিল মৌলিক উপাদান। ফলত, উপস্থিত বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে অলীক ভাবাদর্শবাদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ফল কী হয়, জোটনিরপেক্ষতার প্রধান পৃষ্ঠপােষক নেহরু চীন আক্রমণের সময়ে নির্বান্ধব থেকে বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাঁর উত্তরসূরিরা বাস্তববাদী হতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত আদর্শবাদী থেকে গেছেন। না হলে, ১৯৯৮-এর ১১ মে পােখরানে পরমাণু শক্তির পরীক্ষা হয় ১৯৭৪-এর পর? নরসিমহা রাও থেকে প্রণব মুখােপাধ্যায় প্রত্যেকেই এই পথের পথিক। বিগত সাত দশকেও ভারতের নিজস্ব স্বতন্ত্র প্রতিরক্ষা নীতি তৈরি হলাে না? ভারত স্বাধীনতার পর আচার্য চাণক্যকে অনুসরণ করেনি, কারণ নীতি নির্মাতাদের মাথায় ছিল সেই মেকলেবাদী কৌশলী শিক্ষা—‘ভারতের নিজস্ব সৃষ্টি বলে কিছু ছিল না, সবই সাহেবদের দান। অন্যদিকে, মাও-য়ের নেতৃত্বে চীন তার দেশের কৌটিল্য অর্থাৎ ‘হান ফেইজী (২৮০-২৩৩ খ্রি.পূ.)-র রাজনৈতিক দর্শন প্রথম দিন থেকে অনুসরণ করছে। চাণক্যের দর্শন সর্বাগ্রে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করার কথা বলে, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের রাজনীতি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়ােজনীয়তার ওপরে প্রশ্ন তুলে দেয়। চাণক্য নীতি ১৩০০ বছর পরেও কতটা প্রাসঙ্গিক ও সমসাময়িক, তার প্রমাণ বর্তমান সরকারের চাণক্য রচিত বিজিগীষু রাজার দ্বাদশ রাজমণ্ডলের doctrine-কে অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে। প্রমাণ পাওয়া যায়। যারা চাণক্যের দর্শন জানেন, তারাই বুঝতে পারবেন দ্বাদশ রাজমণ্ডলের সাফল্য আজকের দিনে কত প্রাসঙ্গিক।
কাশ্যপ সেনগুপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.