শ্যামাপ্রসাদ শারদ সম্মান: হিন্দু বাঙালীর দুর্গা পুজো এবং বুদ্ধিজীবীদের শারদোৎসব

Spread the article

এসেছে শরৎ, হিমের পরশ
লেগেছে হাওয়ার ‘পরে,
সকাল বেলায় ঘাসের আগায়
শিশিরের রেখা ধরে।

আমলকী-বন কাঁপে, যেন তার
বুক করে দুরু দুরু –
পেয়েছে খবর পাতা-খসানোর
সময় হয়েছে শুরু।

শিউলির ডালে কুঁড়ি ভ’রে এল,
টগর ফুটিল মেলা,
মালতীলতায় খোঁজ নিয়ে যায়
মৌমাছি দুই বেলা।

গগনে গগনে বরষন-শেষে
মেঘেরা পেয়েছে ছাড়া –
বাতাসে বাতাসে ফেরে ভেসে ভেসে,
নাই কোনো কাজে তাড়া।

দিঘি-ভরা জল করে ঢল্ ঢল্,
নানা ফুল ধারে ধারে,
কচি ধানগাছে খেত ভ’রে আছে –
হাওয়া দোলা দেয় তারে।

যে দিকে তাকাই সোনার আলোয়
দেখি যে ছুটির ছবি –
পূজার ফুলের বনে ওঠে ওই
পূজার দিনের রবি।

হ্যাঁ, শরৎ এসে গিয়েছে। জায়গায়-জায়গায় কাশফুলের দোলাও ইতিউতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলাফলস্বরূপ, প্রত্যেকটা বাঙালীর অবচেতন হৃদয় আজ ময়ূরের মতই নৃত্যমান। কারণ, “মা” আসছেন।

কুমোরটুলি-কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা প্রত্যেকেই এখন মায়ের মৃন্ময়ী রূপের গঠনে নাওয়া-খাওয়া ভুলেছে। সারা বছর মায়ের আগমনের এই চারটে দিনের জন্যই তো প্রত্যেকটা বাঙালী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। প্রায় মাস তিনেক আগে থেকেই তারা কাউন্টডাউন করতে শুরু করে দেন আর ক’দিন বাকি তাদের “দুর্গা পুজো”-এর?

দুর্গা পুজো নাকি শারদোৎসব?

তবে বিগত কয়েক বছরে এই রাজ্যের বর্তমান এবং প্রাক্তন শাসকদল তথা তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের বদান্যতায় “দুর্গা পুজো” পরিণত হয়েছে “শারদোৎসব”-এ। অত্যন্ত সচেতনভাবে তারা প্রত্যেকটি পুজো কমিটির কাছে বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ একপ্রকার ফতোয়া জারি করে আসছে, যাতে পুজো কমিটিগুলো তাদের বাৎসরিক পুজোর সমস্ত প্রচারে “দুর্গা পুজো”-এর বদলে “শারদোৎসব” শব্দটিই ব্যবহার করে।

কিন্তু কেন? কেন এই অযাচিত ফতোয়া?

আসলে হিন্দু বাঙালী যাতে তার হিন্দুত্ব পরিচয় ত্যাগ করে বিশ্বনাগরিক হওয়ার দৌড়ে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যায়, মূলতঃ তার জন্যই প্রাক্তন রাজ্য সরকার কর্তৃক এই ষড়যন্ত্রের সূচনা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রাজ্যের বর্তমান শাসকদলও সেই ষড়যন্ত্রকে সমূলে উৎপাটিত না করে সেটিকেই সারজল দিয়ে বিষবৃক্ষে রূপান্তরিত করেছে। যে ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপনের মাধ্যমে বাঙালীরা নিজেদেরকে একাত্মীভূত করতে পারবে বা বহিঃশত্রুর মোকাবিলায় নিজেদের মধ্যে ধর্মীয় বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে পারবে, সেই ধর্মীয় অনুষ্ঠানটিকেই এরা সুকৌশলে “উৎসব”-এর রূপ দিয়ে দিতে চায়; যাতে সেই উৎসবটি কেবলমাত্র চারদিনের মোচ্ছব বা হৈ-হুল্লোড়েই পরিণত হয়ে থাকতে পারে, পুজো উপলক্ষে ধর্মীয় আত্মীকরণের কোনো সুযোগ যেন বাঙালীরা না পায়।

কেউ এখন প্রশ্ন করতেই পারেন, বাঙালীদের এইভাবে ধর্মবিমুখ করে তাদের কোন উদ্দেশ্যটা সিদ্ধি হবে?

উত্তর হলো, হবে। এতে তাদের জঘন্য এক উদ্দেশ্য সাধিত হবে। ধর্মের নামে, দ্বিজাতিতত্ত্বের নামে একবার এই দেশ বিভাজিত হয়েছে। ইতিহাস ও পরিসংখ্যান বলছে, এই দেশ বিভাজনের ফলে সব থেকে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত যদি কোনো সম্প্রদায় হয়ে থাকে, তাহলে সেটা বাঙালী সম্প্রদায়ই। এখানে উল্লেখ্য, সমগ্র লেখায় “বাঙালী” শব্দটায় কেবলমাত্র “হিন্দু বাঙালী”-কেই বোঝানো হয়েছে। কারণ, দৈনন্দিন জীবনে নামমাত্র কিছু বাংলা শব্দের সাথে নাস্তা, পানি, গোসল, আব্বু, আম্মি, ফুফা, আপু নামক এক দুর্বোধ্য ঊর্দু ও আরবী শব্দভান্ডার ব্যবহার করে, এমনকি নিজের নামটাও আরবীয় রেখে কেউ “বাঙালী” হতে পারে না। বাঙালী হতে গেলে তার বাড়িতে তুলসীতলা থাকবে, তার জীবনে দুর্গাপুজা বাদ দিয়েও পয়লা বৈশাখ থাকবে, হালখাতা থাকবে, অক্ষয় তৃতীয়া থাকবে, জামাইষষ্ঠী থাকবে, রথের মেলায় পাঁপড় ভাজা খাওয়ার আনন্দ থাকবে, আর কিছু হোক না হোক, তার নামটা ন্যূনপক্ষে বাঙালী থাকবে। এগুলোর কোনোটাই যদি কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তারা বাংলাতে কথা বললেও (তাও একগাদা বিজাতীয় আরবী শব্দভান্ডার নিয়ে) তাদেরকে বাদ দিয়েই আমাদের বাঙালীত্ব এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

সমগ্র ভারতের সাথে বাংলা ও বাঙালীদের উপর বিজাতীয় শত্রুর অত্যাচার বিগত কয়েক শতক যাবৎ প্রায় প্রতিনিয়তই হচ্ছে। সেই সমস্ত ঘটনাবলীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বৃহৎ আকারে বাঙালীদের ধর্ম ও বাঙালীত্বের উপর যে আক্রমণটি নেমে আসে, সেটি হলো ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের প্রেক্ষাপট। তবে সৌভাগ্যবশতঃ সেই সময় এক সিংহ বাঙালীর জন্যই আপামর বাঙালী জাতি ধনে-প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম। কে সেই মহান বাঙালী? একটু পরে সেই সুমহান মনীষীর সম্পর্কে আলোচনায় আসছি। সেই মহান মানুষটির অমানুষিক পরিশ্রমে ও অধ্যবসায়ে এবং অবশ্যই ওই সময়ের বুদ্ধিজীবী-বিজ্ঞানী ও বঙ্গ কংগ্রেসের নেতাদের দাপটে বাঙালী তার মোট ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু বর্তমানে বাঙালীকে বিশ্বমানবতার পাঠ পড়িয়ে ও বিশ্বনাগরিকতার অলীক স্বপ্নে ডুবিয়ে রেখে সেই এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডেও অবৈধ বিদেশী দখলদারদের অবৈধ অধিকার দেওয়ানোর উদ্দেশ্যেই এই ষড়যন্ত্রের সূচনা। পরিবর্তে এই ষড়যন্ত্রকারীরা পাবেন প্রচুর বিদেশী মুদ্রা, অগুণতি সুযোগ-সুবিধা ও সীমাহীন খ্যাতি। ঠিক যেমনটা এককালে তারা পেয়েছিলো উদ্বাস্তু আন্দোলনকে সর্বহারা ও শ্রেণীশত্রু আন্দোলনে ডাইভার্ট করার পুরষ্কার হিসেবে।

তাই সাধু সাবধান!!! ঘরপোড়া গরু যেমন সিন্দুরে মেঘ দেখলেই ডরায়, আমাদের বাঙালীদের বর্তমান অবস্থাও কিঞ্চিৎ তেমনই। বিগত আট বছরে আমরা দেখেছি, মহরমের চাঁদা না দেওয়ায় কী’ভাবে এক বাঙালীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিশেষ এক ধর্মীয় সম্প্রদায় বা আমরা দেখেছি, ফেসবুকে একটি নাবালক ছেলে সামান্য পোস্ট করার জন্য কী’ভাবে সেই একই ধর্মীয় সম্প্রদায় বসিরহাট জ্বালিয়েছে? শুধুই কি তাই? আমরা কি ভুলে গিয়েছি সাইকেল গ্যারেজে পাওনা টাকা চাওয়ায় সমুদ্রগড়ে কী’ভাবে বাঙালী সম্প্রদায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে সেই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়? শাসক দলেরই দুই গোষ্ঠীর বিবাদকে কী’ভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত করা যায়, ধুলাগড়ে সেটাও দেখিয়েছে সেই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়। এ ছাড়া সেই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দাপট আমরা দেখেছি উস্থি-ক্যানিংয়ে। এপার বাংলায় অবস্থা আজ এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে প্রত্যেকটি পুজোর আগে পটুয়াপাড়ায় মূর্তিভাঙা বা বিসর্জনের শোভাযাত্রা চলাকালীন ভক্তদের উপর পাথর ছোঁড়া বা শোভাযাত্রা বানচাল করার কু-প্রচেষ্টা আজ ওপার বাংলার প্রত্যেকটি পুজোর মতই নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাহঃ, এখানেই শেষ নয়। তেহট্টতে নবী দিবস (অবশ্য এই নবী দিবসের সাথে বাংলা ও বাঙালীর ঠিক কিসের সম্পর্ক, সেই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে কিন্তু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজ মুখে কুলুপ আঁটে) পালন না করতে পারায় বাঙালীদের সরস্বতী পুজো বন্ধ করে দেওয়া হয় মাত্র বছর দুয়েক আগে। এমনকি, এই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দাবীতে বীরভূমের কাংলাপাহাড়িতে ১১ বছর যাবৎ দুর্গা পুজো বন্ধ থাকে। তারপর ১২ তম বছরে হাইকোর্ট থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে সেখানে পুজো সম্পন্ন করা হয়, তাও মহাষ্টমীর দিনে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একবারও নিজেকে আপনি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা দেশের অন্তর্গত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা রাজ্যের নাগরিক হিসেবে ভাবতে পারছেন কি? আজ আপনি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও আপনার সব থেকে বড় ধর্মীয় উৎসব পালন করতে আদালতে যেতে হচ্ছে; ঈশ্বর না করুন, কোনোদিন আপনি এই ভুমিতে সংখ্যালঘু হয়ে যান। চিন্তা করতে পারছেন কি তারপরে আপনার সামাজিক-ধর্মীয় অবস্থান ঠিক কী হতে পারে? অবশ্য তার সব থেকে বড় প্রমাণ তো পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা কাশ্মীরের প্রত্যেকটি ভূমিপুত্র আপনার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। দুর্ভাগ্য, আপনি সেক্যুলারিজমের নেশায় বুঁদ থেকে সেগুলোর কিছুই প্রত্যক্ষ করতে পারেননি। আর এসবের থেকেও বড় প্রশ্ন হলো, সেই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়টি যদি সত্যিই বাঙালী হতো বা নিজেদেরকে মনেপ্রাণে বাঙালী বলেই মনে করতো, তাহলে কি সেই তারাই বাঙালীর সব থেকে বড় উৎসবে এইভাবে প্রতিনিয়ত বাধাদান করতো? অবশ্য একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের মতে, “দুর্গাপুজো” নয়, বাঙালীদের নাকি সব থেকে বড় ধর্মীয় উৎসব এখন “ঈদ”।

এবার একবার ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখুন। ১৯৪৬ সালের আগস্টে “দ্য গ্রেট ক্যালকাটা রায়ট” আর সেই একই বছরের অক্টোবরে “নোয়াখালী গণহত্যা”-তে লুণ্ঠিত হলেন আপনি, ধর্ষিতা হলেন আপনি, এমনকি নিজের স্বদেশের-স্বভূমির দুই-তৃতীয়াংশ খোয়ালেন সেই আপনিই। আপনি কখনই মানুষে-মানুষে ধর্মীয় পরিচয়ে বিভেদ করেননি, চিরকাল “সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ, সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ”-কে মনমন্দিরে মেনে চলেছিলেন; কিন্তু সেই ১৯৪৬ থেকে ২০১৯, নোয়াখালি থেকে সন্দেশখালি, কখনও রাজনৈতিক সংঘর্ষের রূপে, কখনও ভাষার সংঘাতের রূপে আবার কখনও বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের রূপে – প্রত্যেক ক্ষেত্রে কিন্তু একটা ফ্যাক্টরই কমন, প্রত্যেক ক্ষেত্রেই কোনোরকম অপরাধ না করেও জীবন গেলো সেই আপনারই, যৌবন গেলো আপনারই, আবার রাজনৈতিক ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটব্যাঙ্কের লোভে লাগামহীন অনুপ্রবেশের ফলে সেই আপনারই জীবিকা বড়সড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়লো। অর্থাৎ প্রত্যেক ক্ষেত্রেই শুধু আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কিন্তু কেশাগ্র অবধি কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। আসলে, মার্জারের যত লম্ফজম্ফ যে কোমল মাটিতেই!!! তারপরেও সব কিছু হারিয়ে বেঁচে ছিলেন শুধু বারো মাসে তেরো পার্বন নিয়ে। এইবার সেখানেও থাবা বসিয়েছে এই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং অবশ্যই তাদের দালাল তথা আপনারই স্বধর্মীয় কিছু মান্যগণ্য ব্যক্তিবর্গ। হাতে আপনাকে বহুবার মেরেছে, ভাতেও মেরেছে। এবার আপনার শেষ আশ্রয়টুকু, এই অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ ভূমি আর আপনার সংস্কৃতির শিকড়টুকু ছিনিয়ে নিয়ে আপনাকে নিজভূমে পরাবাসী করা আর সহায়-সম্বলহীন করাটাই যে তাদের শেষ উদ্দেশ্য। কারণ, তাতেই যে তাদের স্বপ্নের গজওয়া-ই-হিন্দ পরিপূর্ণতা পাবে।

অতঃকিম?

১৯৫১ থেকে ২০১১ অবধি এই রাজ্যের আদমশুমারির পরিসংখ্যান আপনি পাল্টাতে পারবেন না। স্বল্প পরিসরে সমস্ত কিছু আলোচনা সম্ভব না, শুধু ১৯৮১ থেকে ১৯৯১ অবধিই যদি আমরা আলোচনায় আনি, তাহলে দেখবো, শুধুমাত্র এই দশ বছরেই যবন সম্প্রদায়ের এক দশকীয় বৃদ্ধির হার ছিল ২.১%। এই পরিসংখ্যান বিপরীত অভিমুখে ধাবিত করতে আপনি টাইম মেশিনে করে গেলেও সফল হবেন না। কারণ, এর অশুভ সূচনা লুক্কায়িত আছে ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসের নেহেরু-লিয়াকত চুক্তির মধ্যেই, যেই চুক্তির বিরোধিতা করে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা থেকে প্রাসাদোপম সুযোগ-সুবিধার জীবন ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় বেরিয়ে এসেছিলেন সেই উপরোক্ত সিংহবাঙালী পুরুষ, স্বর্গীয় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, পিতা – “বাংলার বাঘ” রূপে খ্যাত স্বর্গীয় আশুতোষ মুখার্জী। কারণ, তিনি বুঝেছিলেন, এই চুক্তির পরে একজন হিন্দুও পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার দুঃসাহস দেখাবে না, কারণ, হায়নার মুখের শিকার হতে কেইই বা চায়, কিন্তু অপরদিকে শুধুমাত্র সেই বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়ই আবার এই খণ্ডিত ভারতবর্ষে ফিরে আসবে, অর্থাৎ, এই চুক্তির ফল হবে একমুখী এবং তা হিন্দু, বিশেষতঃ বাঙালীদের জন্য হবে মারাত্মক। ফলতঃ, হলোও সেটাই।

কিন্তু আজ শ্যামাপ্রসাদ স্বর্গগত হয়েছেন। তাহলে এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকটি বাঙালীর কী করণীয় হওয়া উচিৎ?

যে’ভাবে প্রত্যেক মুহূর্তে আমাদেরই চোখের সামনে আমরা আমাদের মাটি-রুটি-বেটি হারিয়েছি, সেটার পুনরুদ্ধারে আমাদেরকেই দাপট দেখাতে হবে। কারণ, মাটি কারোর বাপের হয় না, মাটি হয় দাপের (দাপটের)। তাই সর্বপ্রথমে আমাদের সুশীলতার ভেক ছাড়তে হবে, আত্মঘাতী ছদ্ম-সেক্যুলারিজমের জাল ছিঁড়ে বেরোতে হবে। নিজের আর এক ছটাক জমিও যাতে বেহাত না হয়, তার জন্য সবার আগে নিজেদের ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ, আমাদের শাস্ত্রেই তো উল্লেখিত আছে, ধর্মঃ রক্ষতিঃ রক্ষিতাঃ অর্থাৎ ধর্ম রক্ষা পেলে ধর্মই তার উপাসকদের রক্ষা করবে। তাই যতই আমাদের কাছে বৈদেশিক সম্পদের হাতছানি আসুক না কেন, যতই আমাদেরকে কেউ প্রলোভিত করার চেষ্টা করুক না কেন, শ্যামাপ্রসাদজীর দেখানো পথকেই পাথেয় করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদেরকে এই বিজাতীয় যবনশক্তির মোকাবিলা করতে হবে। তার জন্য অন্যতম উপায় হলো, সর্বাগ্রে আমাদের বারো মাসের তেরো পার্বনগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাঙালীদের প্রধান উৎসব “দুর্গাপুজো”-ই হবে, কোনো বিজাতীয় বা বৈদেশিক পরব হবে না, সেটার নিশ্চয়তা দান করতে হবে। আর সেই প্রধান উৎসবকে আমরা “শারদোৎসব” নামে অভিহিত করবো না, বরং “দুর্গাপুজো”-ই বলবো, যাতে ধর্মীয়ভাবে এক বাঙালী আরেক বাঙালীর সাথে একাত্মীভূত হতে পারে।

কেন “শ্যামাপ্রসাদ শারদ সম্মান”?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আসুন, একটু ইতিহাসের দিকে চোখ বুলাই, যেই নির্মম ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে বাঙালীকে যেতে হয়েছে সেই ১৯০৫ সালের “বঙ্গভঙ্গ” থেকে।

আলোকিত, ধীশক্তিসম্পন্ন, তেজস্বী বাঙালীকে ধ্বংস করার জন্য উদ্যত হয়েছিল যে মহাশক্তিরা, তাদের মধ্যে অন্যতম বা সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। বস্তুতঃপক্ষে, ১৯১১ সালে ব্রিটিশরাজ কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ রোধের সময় থেকেই ঘনিয়ে এলো বাঙালী হিন্দুর কাল। যে সময়ে পৃথিবীজুড়ে উচ্চারিত হতো “Rule, Britannia! rule the waves: Britons never will be slaves”, সেই একই যুগে বাঙালী হিন্দুদের তেজস্বী প্রতিবাদ ও প্রত্যাঘাত হেতু বঙ্গভঙ্গ রোধ ব্রিটিশ রাজের কাছে চূড়ান্ত অপমানজনক মনে হয়েছিল। ফেব্রুয়ারী ১৭, ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জন, ভারতবর্ষের তৎকালীন ভাইসরয়, একটি চিঠি লেখেন William St John Fremantle Brodrick (Secretary of State for India) কে,

“The Bengali is who like it themselves as a nation and who dream of a future when the English will be turned out and a Bengali Babu will be installed in the Government House, Calcutta, of course, bitterly resent any interfere that will be likely to interfere with the realization of this dream. If we are weak enough to yield to their clamor now, we shall not be able to dismember or deduce Bengal again; and you will be cementing and solidifying on the Eastern flank of India, a force already formidable and certain to be a source of increasing trouble in the future.”

– “Genesis of Pakistan” – Nagarkar.

বাঙালি হিন্দুর সম্বন্ধে লর্ড কার্জনের এই মূল্যায়ন আমাদের সাহায্য করে পরবর্তী যুগে ব্রিটিশ কর্তৃক বাঙালীর ধ্বংসের ধারাবাহিকতাকে অনুধাবন করতে। ব্রিটিশের যোগ্য সহযোগী হিসেবে মুসলিম লীগের পাকিস্তান গঠন ও হিন্দু জাতির নিশ্চিহ্নকরণের অভিমুখে ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কার্যাবলী এক নব অধ্যায়ের সৃষ্টি করে।

সমগ্র বাংলাতে হিন্দু আধিপত্য ক্রমাগত ক্ষুণ্ন করার সাথে ১৯৩২ সালের Communal Award, ভারত রক্ষা আইন – ১৯৩৫ প্রণয়নের মাধ্যমে অবস্থা এই পর্যায়ে পৌঁছল যে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ শ্রী নীরোদ চন্দ্র চৌধুরী পর্যন্ত স্বীকার করলেন, “হিন্দুদের দেখার কিছু থাকলো, বলার কিছু থাকলো কিন্তু করার কিছু থাকলো না”। অর্থাৎ ১৯৩৫-৩৬ সালের মধ্যেই অবিভক্ত বঙ্গের একদা প্ৰচণ্ড শক্তিশালী বাঙালী হিন্দু, কি শিক্ষা, কি অর্থনীতিতে, পথের কপর্দকহীন ভিক্ষুকে পরিণত হল প্রায়। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাও সম্পূর্ণ হল ১৯৩৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক “শ্রীপদ্ম”-এর বিদায়ের মাধ্যমে। শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে এই প্রথম মুসলমান ও হিন্দুর সম্মুখ সমর হল ও শিক্ষাক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক কর্ম সত্বেও হিন্দু সমাজ পরাজিত হল। ৪০-এর দশকের বাংলার মুসলিম লীগ সরকার দ্বারা আনীত মহা বিতর্কিত ও সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতদুষ্ট “Secondary Education Bill” এবং তার বিরুদ্ধে শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হিন্দু সমাজের সংগ্রাম রাজনৈতিক উত্তাপকে এক নয়া মাত্রা প্রদান করে। সংগ্রাম এত গুরুতর হয়ে ওঠে যে জনাব আবু হোসেন সরকারের মতো ব্যক্তিও বলে ওঠেন যে এই বিল শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তবায়িত হলে, “হিন্দুস্তান বা পাকিস্তান র পরিবর্তে চারিদিকে শুধু গোরস্থানই থাকবে।”

কিন্তু পাকিস্তান গঠনের নেশায় উন্মত্ত মুসলিম লীগ ও জিন্না এই জ্ঞানগর্ভ উপদেশ শোনার জন্য অপেক্ষা করেননি। বাংলার বিধানসভায় একের পর এক বিল এনে হিন্দু জমিদারশ্রেণীর ক্ষতিসাধন করে কৃষকদরদী সাজার উন্মাদনা তখন লীগকে গ্রাস করেছে, কিন্তু অচিরেই বোঝা গেল দরদের পরিবর্তে সমগ্র বাংলাতে এক ইসলামিক রাজত্ব গড়ার জন্যে তারা মরিয়া। তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ হল আগস্ট ১৬, ১৯৪৬
-এর সম্মুখ সমর, ইতিহাসে যা প্রসিদ্ধ “Direct Action Day” হিসেবে। একইসময়ে ক্রমশ রসাতলে যাওয়া পরিস্থিতির ওপর রাশ টানার পরিবর্তে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ সরকার উত্তাপ অনুভব করলেন সেই আগুনের যা সমগ্র ভারতকে দগ্ধ করল। ১৬ ই আগস্ট ও তারপরের কয়েকটি দিন কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যা যা ঘটল, তাকে বোধহয় নারকীয় আখ্যাও দেওয়া চলেনা। তার প্রারম্ভ হয়েছিল মুসলিম লীগের নেতৃত্বে নৃশংসতম ইসলামী আক্রমণে, শেষ হল হিন্দুদের ভয়াল, ভয়ঙ্কর প্রত্ত্যুত্তরে। অক্টোবর ১০, ১৯৪৬ – কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার রাত্রে গোলাম সারওয়ারের নেতৃত্বে নোয়াখালীর সংখ্যালঘু হিন্দুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল কাশেমের ফৌজ, যে অগ্নি নির্বাপিত করতে স্বয়ং গান্ধীজিকে ছুটে আসতে হয়েছিল সেখানে এবং নোয়াখালীর প্রতিক্রিয়ায় ২৬ শে অক্টোবর বিহারে হিন্দুরা ঝাঁপিয়ে পড়ল সেখানকার মুসলমান অধিবাসীদের ওপর। তারপরই জ্বলে উঠল উত্তরপ্রদেশের গড়মুক্তেশ্বর। এর মধ্যেই ঘটলো শ্রীহট্টের গণভোটের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় – যেদিন গণতন্ত্রের সমস্ত ধ্যানধারণার বলাৎকার করে শ্রীহট্টকে তুলে দেওয়া হল পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ও তার সাথেই পূর্ণ হল বাঙালী হিন্দু সমাজের সর্বনাশের ইতিবৃত্ত। বাঙালীর সেই পলায়ন আজও থামেনি। ‘৪৭-এ তার পরিচয় ছিল ধুবুলিয়া উদ্বাস্তু ক্যাম্পের অধিবাসী হিসেবে, আজ তার পরিচয় আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পের উদ্বাস্তু হিসেবে।

কিন্তু ১৬ ই আগস্ট যে ভয়ঙ্কর ঘটনাপ্রবাহ শুরু হল কলকাতায় (ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একদা রাজধানী) তা থামলো না এমনকি ভারতের স্বাধীনতার পরেও, এমনই ভয়ঙ্কর ছিল পারস্পরিক বিদ্বেষ, তৎসহ হিন্দু প্রতিক্রিয়া।

২৭ শে ডিসেম্বর, ১৯৪৬-এ অখিল ভারত হিন্দু মহাসভার গোরক্ষপুর অধিবেশনে দেশভাগের দাবী তুলে “স্বধর্ম রক্ষার কারণে রক্তস্নান”-এর জন্যে হিন্দুদের প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন এল.বি.ভোপটকর। মহাসভা এই উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করে ফেলে; চারমাস পরে সাতচল্লিশের এপ্রিল মাসে বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার তারকেশ্বর অধিবেশনে নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দেশভাগকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন। নির্মলচন্দ্র বলেন, হিন্দুদের কাছে এটা জীবন-মরণের প্রশ্ন; “বাঙলার হিন্দুরা জাতীয় সরকারের অধীনে একটি স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠন করবে”। দিল্লীর একটি সভায় শ্যামাপ্রসাদ এমনও বলেন যে, “পাকিস্তান যদি নাও হয়, তাহলেও বাঙলার হিন্দুদের জন্য একটা আলাদা প্রদেশ চাই” (Even if Pakistan is not conceded….we shall demand the creation of a new province composed of the Hindu majority areas in Bengal)। সাতচল্লিশের গোড়াতেও শ্যামাপ্রসাদ দেশভাগের কথা বলেননি; কিন্তু এখন তাঁর মনে হয়, দেশভাগ ছাড়া অন্য কোন সমাধান তিনি দেখতে পাচ্ছেন না।“

কলকাতার নাগরিক জীবন তখন একেবারে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছে। টানা কারফিউ চলছে অঞ্চলে-অঞ্চলে। দাঙ্গার পিছনে সরকারের মদত রয়েছে। হিন্দু পত্র-পত্রিকার ওপরেও দমনপীড়ন চলছে। এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিবলে অমৃতবাজার পত্রিকা, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড, আনন্দবাজার পত্রিকা, মডার্ন রিভিউ-এর ওপর জরিমানা ধার্য করা হয়; বাজেয়াপ্ত করা হয় জমা রাখা টাকা (ডিপোজিট)। ক্রমাগত দাঙ্গায় উৎপীড়িত হিন্দুর ক্ষোভ তাই একটা সমাধানের দিশা দেখতে পায় হিন্দু মহাসভার দাবীতে; হিন্দু পত্র-পত্রিকাও সমর্থন করেন সেই দাবী।

‘অর্চনা’ পত্রিকা (শ্রাবণ, ১৩৫৪) তারকেশ্বর অধিবেশনের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা ছাপে। মডার্ন রিভিউ (মে, ১৯৪৭) মন্তব্য করে: “দেশভাগ এখন একটা ‘গৃহীত সত্য’ (accepted fact) হয়ে গিয়েছে”। ডিসেম্বর মাসেই ‘প্রবাসী’ লিখেছিল: “দুই সম্প্রদায়ের মিলনের আশা সুদূর পরাহত। ……বঙ্গ বিভাগের প্রস্তাব স্থিরভাবে বিচার করা প্রয়োজন হইয়াছে”। সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করে পরবর্তীকালে ‘প্রবাসী’; ‘শনিবারের চিঠি’ (বৈশাখ, ১৩৫৪) পরিষ্কার লেখে: “পৃথক হইয়া যাওয়াই ভাল”। হিন্দু পত্র-পত্রিকার প্রচারে হিন্দু মহাসভার দাবী প্রায় গণদাবীর চেহারা নেয়। গ্যালপ পোলের ভেতর দিয়ে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ প্রমাণ করে দেয়, পাঠকদের ৯৮ শতাংশই বাঙলা ভাগ চায়; বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করার জন্যে অমৃতবাজার পত্রিকা “বেঙ্গল পার্টিশন ফান্ড” নামে একটা তহবিলই খুলে ফেলে।

কে ছিলেন না এই মহতী সংগ্রামে? পশ্চিমবঙ্গের দাবী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্য্যায় একাকী, কিন্তু ক্রমে যুক্তি ও বোধে শাণিত হয়ে তাঁর পাশে দৃঢ়চিত্তে এসে দাঁড়িয়েছিলেন শ্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, শ্রী নলিনাক্ষ সান্যাল, পন্ডিত লক্ষীকান্ত মৈত্র, শ্রী নীহারেন্দু দত্ত মজুমদার, মেজঃ জেনাঃ এসি চ্যাটার্জি, শ্রী নলিনীরঞ্জন সরকার, শ্রী যাদবেন্দ্রনাথ পাঁজা, শ্রী বিধানচন্দ্র রায়, ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডঃ মেঘনাদ সাহা, স্যার যদুনাথ সরকার, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, ডঃ মাখলাল রায়চৌধুরী, অমৃতবাজার-যুগান্তর পত্রিকা গোষ্ঠী, আনন্দবাজার পত্রিকা, দৈনিক বসুমতি, Modern Review ও প্রবাসী গোষ্ঠী, ডঃ রাধাকুমুদ মুখোপাধ্যায়, ডঃ বিনয় সরকার প্রমুখ ব্যক্তিগণ।

এমতাবস্থায়, ২০শে জুন, ১৯৪৭ অখণ্ড বাংলার হিন্দু প্রধান অঞ্চলের সদস্যরা পৃথকভাবে বসেন। কংগ্রেসের সঙ্গে হিন্দু মহাসভা ও কম্যুনিস্ট প্রতিনিধিরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট দেয় এবং পক্ষে সর্বমোট ভোট পড়ে ৫৮টি। মুসলিম লীগ বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের বিরোধী হিসেবে দলবদ্ধভাবে ভোট দেয়; তাদের পক্ষে ভোট পড়ে ২১টি। ৫৮-২১ ভোটে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব, সমস্ত প্রতিকূলতার বিপক্ষে আসীন হয়ে গৃহীত হয়। এটি বলা প্রয়োজন, মাউন্টব্যাটেন রোদেয়াদে এটি পূর্ব থেকেই সিদ্ধান্ত ছিল, একটি বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিরা বাংলা ভাগে ইচ্ছুক হলেই তবেই প্রস্তাব গৃহীত হবে। হিন্দু বিভাগে সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেস সেই পথেই যায়, সৃষ্টি হয় পশ্চিমবঙ্গের। সোচ্চারে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মহম্মদ আলী জিন্নাকে বলেন, “Jinnah, you have divided our India and I have divided your Pakistan”। সমগ্র কলকাতা ছাড়াই পূর্ব পাকিস্তান মেনে নিতে বাধ্য হয়ে মহম্মদ আলী জিন্না একে তুলনা করেছিলেন, “Moth eaten Pakistan” (পোকায় কাটা পাকিস্তান)-এর সাথে।

হ্যাঁ, এই মহান মনীষীর জন্যই বাঙালী সম্প্রদায় বেঁচে গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে; এই মহান মনীষীর জন্যই বাঙালী সম্প্রদায় তাদের ঘরের প্রত্যেকটি দুর্গা, প্রত্যেকটি লক্ষ্মী, প্রত্যেকটি সরস্বতীকে সেদিন বেআব্রু হওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলো। আমরা তো ঘরে কন্যাসন্তান হলেই বলি যে “ঘরে লক্ষ্মীর আগমন হয়েছে” বা “রূপে সরস্বতী, গুণে লক্ষ্মী” তো আমাদের প্রবাদবাক্যই আছে আর প্রত্যেকটা বাঙালী ঘরের গৃহিণীরা তো একেকজন দুর্গাই বটে; তাহলে যে ঋষিপ্রতিম ব্যক্তির জন্য সমগ্র বাঙালী সমাজ সেদিন রক্ষা পেলো, রক্ষা পেলো প্রত্যেকটি বাঙালী পরিবারের “দুর্গা”, সেই স্থানে দাঁড়িয়ে বাঙালীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব “দুর্গাপুজো” তো সেই সুমহান যশস্বী ব্যক্তির প্রতি উৎসর্গ করেই করা উচিৎ, তাই নয় কি?

আর সে জন্যই, আমরা “বঙ্গীয় মাতৃভূমে” নাম্নী একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক-অলাভদায়ী তথা জাতীয়তাবাদী সংগঠনের পরিচালনায় “শ্যামাপ্রসাদ শারদ সম্মান: ২০১৯”-এর আয়োজনের মাধ্যমে আমাদের পথচলা শুরু করেছি। আশা রাখবো, প্রত্যেকটি জাতীয়তাবাদী নাগরিক, প্রত্যেকটি পুজো সংস্থা ও প্রত্যেকটি সচেতন সংস্থা/প্রতিষ্ঠান আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে অকুন্ঠ সমর্থনের মাধ্যমে আমাদের আগামীতে পথ চলার রসদ সংগ্রহে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন/দাঁড়াবে।

সুমন্ত্র মাইতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *