দ্বিতীয়পর্ব : বলদ বাঁধ গ্রাম ও কুলমাতার সাতকাহন

আন্ধং কুষ্ঠঞ্চ দারিদ্রং রোগ শোকঞ্চ দারুণং |
বন্ধুস্বজন-বৈরাগ্যং দুর্গে ত্বং হর দুর্গতিং ||

রাজ্য তস্য প্রতিষ্ঠা চ লক্ষীস্তস্য সদা স্থিরা |
প্রভুত্বং তস্য সামর্থ্যাং যস্য ত্বং মস্তকোপরি ||

শাক্ত ধর্ম ও তন্ত্র একই মুদ্রার দুই দিক বলে একটি ধারণা বহুল প্রচলিত। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয় বলেই অনেকে মনে করেন। কেননা, ভারতীয় ধর্মচেতনার বিকাশের প্রভাতকাল থেকেই একটি বিকল্প লোকায়তিক জ্ঞান, কর্ম ও সাধনার ধারা হিসেবে তান্ত্রিক ধারাটি বরাবর বিদ্যমান ছিল। এই ধারাটির বিকাশ ঋগ্বেদের কিছু অংশে, অথর্ববেদে এবং ব্রাহ্মণ সাহিত্যে পরিলক্ষিত হয়। বুদ্ধও এই ধারাটি থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। তাঁর দেহাত্মবাদ বা নৈরাত্ম্যবাদের উৎস প্রাচীন তান্ত্রিক বিশ্ববীক্ষার মধ্যে অন্বেষণ করা যায় বলে কেউ কেউ মনে করেন।

একটা সময়ে এসে তান্ত্রিক ধারার অনুগামীরা বৌদ্ধমত গ্রহণ করার পরেও নিজেদের প্রাচীন জীবনচচর্চা ও সাধন পদ্ধতিকে বজায় রেখেছিলেন এবং সংঘের মধ্যেই নানা ধরনের গুহ্যসমাজের সৃষ্টি করেছিলেন। এই তন্ত্রসাধকদের প্রভাবেই পরবর্তীকালে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের ( বজ্রযান) উদ্ভব হয়।

‘তান্ত্রিক আদর্শসমূহ কিভাবে বৈষ্ণবধর্মকে প্রভাবিত করেছিল তার প্রমাণ লক্ষ্মীতন্ত্র (নবম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে রচিত) থেকে পাওয়া যায় যেখানে লক্ষ্মী বিষ্ণুর চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং সকল সৃষ্টির নিমিত্ত কারণ।

মুদ্রা, সীল ও ভাস্কর্যে এই দেবীর মূর্তি পদ্মফুলের উপর উপবিষ্ট অথবা দণ্ডায়মান ভঙ্গীতে দেখা যায়। আর একটি প্রচলিত ভঙ্গীর নাম গজলক্ষ্মী যেখানে দুটি হস্তীর জলসেচনের দ্বারা তাঁকে অভিষিক্ত হতে দেখা যায়। মহাভারতে (৪/৬, ৬/২৩) দুর্গাকে বাসুদেবের ভগিনী এবং নন্দগোপকুলোদ্ভবা বলা হয়েছে। হরিবংশের আর্যাস্তবেও তাঁকে লক্ষ্মী, বলদেবের ভগিনী, নন্দগোপসূতা প্রভৃতি আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্যে (যা সচরাচর চণ্ডী নামে পরিচিত) দেবী বৈষ্ণবী শক্তি যোগনিদ্রারূপিণী মহামায়া যাঁর প্রেরণায় বিষ্ণু মধু ও কৈটভকে বধ করেছিলেন।

শুম্ভনিশুম্ভ ও মহিষাসুরমর্দিনী দেবী অন্যান্য দেবতাগণ কর্তৃক নারায়ণী হিসাবে স্তুত হয়েছেন। কৃষ্ণবলরামের ভগিনী একানংশা নামে প্রসিদ্ধিলাভ করেছিলেন। বৃহৎসংহিতায় বরাহমিহির বলেছেন কৃষ্ণবলদেয়োর্মধ্যে একানংশা কার্যা। ভুবনেশ্বরের অনন্তবাসুদেবের মন্দিরস্থ গর্ভগৃহে কৃষ্ণবলরামের মধ্যস্থিত একানংশা মূর্তি আজও বর্তমান। পুরীর জগন্নাথ বলরামের মধ্যবর্তী ইনিই সুভদ্রা। বৈষ্ণবী বা লক্ষ্মীর শক্তি উপাদানটি বৈদান্তিক বৈষ্ণব তাত্ত্বিকেরাও অস্বীকার করেননি। রামানুজের শ্রীবৈষ্ণব ও মধ্ব সম্প্রদায় ব্রহ্ম বা বিষ্ণুর শক্তি হিসাবে লক্ষ্মীর উপাসক ছিলেন।

পক্ষান্তরে নিম্বার্ক, বল্লভ ও শ্রীচৈতন্য সম্প্রদায়ের নিকট এই শক্তি রাধা। কৃষ্ণ ও রাধার মিলন, শূন্যতা ও করুণা অথবা প্রজ্ঞা ও উপায়ের মতই পুরুষ ও স্ত্রী আদর্শেই মিলনের প্রতীক। দক্ষিণ ভারতের বৈখানস সম্প্রদায় অন্যান্য বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মত ব্রহ্ম, জীবাত্মা ও জড়জগৎ এই ত্রিতত্ত্ব মানলেও সর্বোপরি ব্রহ্মস্বরূপ বিষ্ণুর শক্তি হিসাবে শ্রী বা লক্ষ্মীকে স্থান দেন যিনি ব্রহ্মের বিভূতি বা ঐশ্বর্য, ‘নিত্যানন্দ-মূল-প্রকৃতি’ এবং চেতন ও অচেতন জগতের স্রষ্টা। গুহ্যাতিগুহ্য তন্ত্রে বিষ্ণুর দশাবতারের সঙ্গে শাক্ত দশমহাবিদ্যার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।

সে যা হোক, যে দেবী বিশালাক্ষীর কথা বলছিলাম সেখানে ফিরে যাই।বাংলার কৃষিজীবী, জলজীবী ও বনজীবী লোকসমাজে জঙ্গলজননী বিশালাক্ষীর প্রভাব অসীম। এক সময় সুন্দরবনের জঙ্গলমহল যত প্রসারিত হয়েছে; বিশালাক্ষী পূজার ক্ষেত্র ততই বিস্তৃ্ত‌ হয়েছে। কৃষক, জেলে, মৌয়ালি-বাওয়ালি প্রভৃতি পেশার মানুষের নয়নের মণি ইনি।

বলদবাঁধ নাম করন ও দেবীর আবির্ভাব নিয়ে পূর্বেই আমি বলেছিল। এ হেন প্রাচীন কৃষ্ণবল্লভপুর অথবা দেবীর আশীর্বাদে প্রাপ্ত নাম বলদবাঁধ গাঁয়ে দেবী বিশালাক্ষী প্রকৃতই বিশাল। তিনি আমাদের মত সাধারণের চোখে হয়ত ভয়াল, রুদ্র দর্শনা কিন্তু তিনিই সাধারণ গ্রামবাসীকে রক্ষা করেন। ৮ ফুট উচ্চ দেবীমূর্তি চতুর্ভুজা । তাঁর বাম হস্তদ্বয় সশস্ত্র , দক্ষিণ হস্তদ্বয় বরাভয় মুদ্রা। মন্দিরের দৈর্ঘ্য ২৭ ফুট ১০ ইঞ্চি। প্রস্থ ৩১ ফুট। গর্ভ গৃহে প্রবেশের মুখটি খিলানাকৃতির। সেই খিলানের ব্যাস ৩ ফুট ৮ ইঞ্চি। মন্দিরটি দক্ষিণ মুখী। মন্দিরচত্বর ১৮ কাঠা জমির উপরে অবস্থিত।

মা বিশালাক্ষীর মন্দিরটির উত্তর দিক দিয়ে বয়ে গেছে কানা নদী।গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে ৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১ ফুট ৬ ইঞ্চির প্রস্থের একটি বাঁধানো বেদীর উপরে দেবীর অবস্থান।দেবীর গাত্র বর্ণ কাঁচা হলুদ, পরনে নীল পাড় লাল শাড়ি। যদিও পূজা পার্বন ও ভক্ত গনের দেওয়া কাপড় পরিবর্তন করা হয়। পদতলে শায়িত শ্বেতবর্ণ কৃত্তিবাস মহাদেবস্বরূপ মহাকাল। তাঁর অর্ধনিমিত চক্ষু, মাথায় জটা। ডান হস্ত মাথার তলায় দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে আছেন।বাম পা সামনের দিকে , ডান পা টি পিছনের দিকে। ত্রিনয়ন মহাকালের কণ্ঠদেশে রুদ্রাক্ষের মালা, হস্তে রুদ্রাক্ষের বলা, কর্ণে ধুতুরা ফুল। অহিভূষণ মহাকালের বাম হস্তে ডমরু ও কল্কে। হাতটি কিঞ্চিৎ ঊর্ধ্বমুখী। সেই হাতের কনুইয়ের ভাঁজে হরিদ্রাভ মুন্ড। মুন্ডের কর্তিত গলা হতে রক্ত ঝরছে । মুন্ডের আয়ত চক্ষু, পুষ্ট গুমফ , কপালে রক্ত তিলক । মহাকালের পিছনে আরেকটি হরিৎ বর্ণের নরমুন্ড । তার ঘনসবুজ মুখ বর্ন , তার মাথায় বাবরি চুল, পাকানো গোঁফ, বিস্ফারিত দৃষ্টি।

শায়িত মহাকালের বামস্কন্ধের উপর দেবী দক্ষিণ চরন স্থাপিত। আবার মহাকালের জঙ্ঘার উপরে উপবেশন করে আছেন স্বয়ং কালভৈরব ।তাঁরও দেহের বর্ণ সবুজ, পরনে রক্তবর্ণ খাটো ধুতি , মাথায় রুক্ষ জটা। আধবোজা চক্ষু, রক্তবর্ণের ওষ্ঠ। গলায় ও হাতে রুদ্রাক্ষের মালা । পায়ে আলতা, করতল রক্তিম। এই কালভৈরবের দক্ষিণ স্কন্ধের উপর বিশালক্ষীর বাম চরণ স্থাপিত । এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে রয়েছে আরও কয়েকটি ছিন্নমূন্ড ও তাদের মাঝখানে একটি দংশন উদ্যত বিষধর সর্প।

।।ওঁ ইদং নেত্রত্রয়ং দিব্যং চন্দ্র-সূর্য্যানল প্রভং।
তারকার ময়ং দেবী পশ্য ত্বং ভূবনত্রয়ং।।

অর্থাৎ-এই দিব্য ত্রিনেত্র সূর্য, চন্দ্র ও অগ্নি প্রভা সম্পন্ন ,আপনি তারণ করেন ও ত্রিভুবন পালন পোষণ করেন ।

দেবী বিশালক্ষী দেহাবয়ব পুরুষালী । তিনি মুক্তকেশী ও আয়তলোচনায। বিশাললোচনী তাই তাঁর নাম বিশালাক্ষী।তাঁর গলদেশে তেরোটি মুন্ডের মালা। মুখমন্ডল দীর্ঘ এবং লম্বাটে।কর্ণ যুগল মুখমন্ডল এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃহৎ । তবে বৃহৎ মুখমন্ডলের তুলনায় দেহের নিম্ন ভাগ অপেক্ষাকৃত ছোট বা খাটো । দেবীর মুখমন্ডলের গঠন খানিকটা বর্ধমানের নতুনগ্রামের তৈরি কাঠের পুতুলের মত । একের বারেই পেলবতা হীন ও সামগ্রিকভাবে নারী সুলভ নয়। অর্থাৎ , তাঁর এই রূপ যুদ্ধের রূপ। তিনি মহাপরাক্রান্ত , রুদ্র তেজে দীপ্তঃমান। তিনি তাঁর বিশাল অক্ষি দ্বারা মহামায়া রূপে কাল ও জগৎকে অবলোকন করেন ।তিনি তাঁর তেজে সকল পাপ ও অশুভকে নাশ করেন ।

শিবদূতী উগ্রচণ্ডা প্রত্যঙ্গে পরমেশ্বরী ।
বিশালাক্ষী মহামায়া কৌমারী সঙ্খিনী শিবা ॥ ॥

চক্রিণী জয়ধাত্রী চ রণমত্তা রণপ্রিয়া ।
দুর্গা জয়ন্তী কালী চ ভদ্রকালী মহোদরী ॥ ॥

দেবীর গলায় হার, মাথায় মুকুট, কানে দুল, হাতে চুড়ি, বাহুতে অঙ্গদ , পায়ে নুপুর আছে । দেবীর সিঁথিতে সিঁদুর চর্চিত । দেবীর করতল ও পদযুগল রক্তিম । দেবীমুর্তির সম্মুখভাগে একটি দুই ধাপের বেদী। বেদীর দৈর্ঘ্য এক ফুট ছয় ইঞ্চি। প্রস্থ এক ফুট। এটিই হ সেই জনৈক্য তান্ত্রিক প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন পঞ্চমুন্ডির আসন । বর্তমানে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতীকস্বরূপ বেদীর উপর নির্মিত পাঁচটি ছিন্নমূন্ড নির্মাণ করে রাখা আছে ।

জঙ্গল ঘেরা বিশালাক্ষী মন্দির , বলদ বাঁধ

বলদবাঁধ গ্রামে দেবী বিশালাক্ষী গ্রামদেবীর আসন লাভ করার পর থেকে স্থানীয় চক্রবর্তীর সেবা পূজার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁরাই এখনো পর্যন্ত মা বিশালক্ষী সেবায়েত ও পুরোহিত। এনারা এখানে প্রাচীন বাসিন্দা এবং বাৎস্য গোত্র।

সকাল দশটায় সিদ্ধ চাল ফলমূল আর বাতাসা দিয়ে পঞ্চপচারে হয় দেবীর নিত্য পূজা । সন্ধ্যায় জলবাতাসা সহযোগে শীতল পূজা হয়। বৈশাখ মাসে বৈকালিক হয় ছোলা বাতাসা দিয়ে। অন্নভোগ নেই। সম্ভব অন্ত্যজ শ্রেণীর ডাকাত দ্বারা পূজিত বলে। তবে গ্রাম বাসীরা দেবীকে পরমান্ন নিবেদন করে থাকেন।

গর্ভগৃহে ঢোকার খিলান

বলদবাঁধ গ্রামের দেবী মাতা বিশালাক্ষীর বার্ষিক পূজা বা গ্রামষোলআনা পূজা হয় বৈশাখী বুদ্ধপূর্ণিমায়। একটি প্রকৃতপক্ষে দেবী প্রতিষ্ঠা তিথি মোহৎসব । দেবীকে সেই ডাকাত সর্দার কিভাবে বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সে কথা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। তাই ঐদিন ষোড়শোপচারে জোড়া পাঁঠা বলি দিয়ে ধুমধাম করে দেবীপূজা হয় । পূর্বে বলি কার্য করতেন তারকচন্দ্র কর্মকার। তাঁর মৃত্যুর পর এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন নালিকুলের কর্মকার বংশ বংশানুক্রমে । উৎসবে ঢাক বাজান কার্তিক রুইদাস।সেই যে বিশালাক্ষীর আদি শিলা খন্ড , যেটি হল মূল পূজ্য ও উপাস্য ,তাঁকে বারি সিঞ্চন করেন ভক্তকুল।

উৎসব উপলক্ষে বিশালাক্ষী ময়দানে দুচারটে দোকান বসে। সৃষ্টি হয় মেলার পরিবেশ। দিনে দিনে উৎসব ও মেলার জাঁক বাড়ছে। বুদ্ধপূর্ণিমা ব্যতীত নীল ষষ্ঠীর দিন ও শিবরাত্রির দিন প্রচুর ভক্ত সমাগম ঘটে । তাঁদের আবেদনেই ১৪০৬ বঙ্গাব্দে ৪ ঠা পৌষ হরি মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

নিস্তব্ধ ও রহস্যময় মন্দির চত্বর

তিন দশক পূর্বে বিশালাক্ষী মন্দির সংলগ্ন সাঁইবাবলার জঙ্গল কেটে গ্রামের শিক্ষিত মানুষজন একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকে দুই থেকে তিনজন করে কিষেন দিয়ে অর্থাৎ শ্রম প্রদান করে , সাঁইবাবলার মোটা গুঁড়ি দিয়ে মাটির স্কুল ঘর তৈরি করেন । কিন্তু উপযুক্ত পরিচালনার অভাবে কিছুকাল পরে সে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৪৬ থেকে ৪৭ খ্রিস্টাব্দে বিশালাক্ষী মন্দির সংলগ্ন মাঠে একটি হাট বসানো হয়েছিল। সেখানে পাইকারদের অনুরোধ করা হয় সেই হাটে দোকান দেবার জন্য। পঞ্চানন মিত্র ,কান্ত কোলে, গোপাল চট্টপাধ্যায় প্রমুখের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে সময় এক সপ্তাহ হাট চলেছিল। এরপর নানা অসুবিধা , যাতায়াত ব্যবস্থা খারাপ হবারজন্য ,বিক্রিবাটা কম হওয়ার জন্য এবং বলদবাঁধের জমি এক ফসলী হওয়ার কারণে হাট উঠে যায়। বর্তমানে নিকটস্থ হাট-বাজার ভান্ডারহাটির হাট কিংবা হরিপালের উড়িয়া বাজার।

পথ পরিবহন সংক্রান্ত আলোচনা সূত্রে বিধুমনী আঢ‍্য রোড নির্মানের ইতিহাস এক্ষেত্রে অনিবার্যভাবে উল্লেখযোগ্য । গৃহদেবতা শ্রী শ্রী ৺শ্রীধর জিউ র কৃপায় ভান্ডারহাটি নিবাসী গোপাল চন্দ্র আঢ‍্য‍্ রাস্তা মহাশয়ের পত্নী শ্রীমতী বিধুমনী দাসীর সাহায্যে এই রাস্তা প্রস্তুত করা হয়েছিল ১২৯৭ বঙ্গাব্দে।পথ নির্মাণের সময় পথিকদের পিপাসা নিবারণার্থে দুই মাইল অন্তর একটি করে ইদারা খনন করা হয় । প্রথমে পাথর ফেলা রাস্তা ছিল । পরে তা পিচ রাস্তায় পরিণত হয় ।

ভান্ডারহাটির গোপাল চন্দ্র আঢ‍্য একজন প্রতিষ্ঠিত ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন। নিঃসন্তান হবার কারণে তাঁর বিধবা পত্নী বিধুমনী দাসী নৃসিংহপ্রসাদকে দত্তক নেন।।যুবক নৃসিংহপ্রসাদ প্রায়শই জুরিগাড়ি হাঁকিয়ে প্রায়ই হরিপালে যেতেন । এ পথে আসতে জেঁজুর হয়ে কানা দামোদর পার হতে হত। এদিকে নদী ঘাটটি ছিল জেঁজুর ঘোষেদের।

স্বভাবিক ভাবেই সেই ঘাটে ঘোষদের বাড়ির বেশি খাতির ছিল। এই নিয়ে আঢ‍্য ও ঘোষদের মধ্যে মনোমালিন্য সূচিত হয়। আঢ‍্যরা লেঠেল জোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় মাতা বিধুমনী দাসীর নির্দেশে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার নিমিত্তলক্ষ টাকা ব্যয়ে নৃসিংহপ্রসাদ কানা নদীর উপর কাঠের সেতু সাতমাইল পাকা রাস্তা নির্মাণ করে দেন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে….. প্রথম প্রথম লোকে একে নৃসিংহ আঢ‍্যির রাস্তা বলত। কিন্তু ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে জেঁজুর ঘোষ পরিবারের জনৈক বংশধর হরিপাল স্টেশন বাজারের শেষ প্রান্তে একটি ফলক বসিয়ে সেই পথের নামকরণ করলেন বিধুমনী আঢ‍্য রোড । এখন আর সেই কাঠের পুল নেই।

অরণ্যঘেরা পরিবেশে , কানা নদীর ধারে , বালিখাদের কাছে অবস্থান করছেন রহস্যময়ি প্রাচীন দেবী মা বিশালক্ষী । নিস্তব্ধ মন্দির চত্বর অসম্ভব রহস্যে ঘেরা। সেখানে আদিম শিলা খন্ড , জৈনক তান্ত্রিক ও তন্ত্রের আদিম সারকথা নীরবে বলে যায়। দিন যায় রাত যায় …..দেবী বলদবাঁধ কে রক্ষা করে চলেন।

হাওড়া তারকেশ্বর রেল পথ পেরিয়ে হরিপাল স্টেশন। সেখান থেকে বাস টার্মিনাস থেকে ধনিয়াখালি দশঘরা গামী বাসে পৌঁছে যাওয়া যায় সেই অরণ্যে তন্ত্রে পূজিতা মা বিশালাক্ষী র মন্দিরে…. এই আগাম শীত কিংবা এই ধূসর হেমন্তে আমরা সেখানে যেতেই পারি। হয়তো আমরা আরও কিছু রহস্যকে জানতে পারব।

ওঁ দুগাচণ্ডেশ্বরী চণ্ডী বারাহী কাৰ্ত্তিকা তথা ।
হরসিদ্ধা তথা কালী ইন্দ্রাণী বৈষ্ণবী তথা ॥
ভদ্রকালী বিশালাক্ষী ভৈরবী সৰ্ব্বরূপিণী ।
এতাশ্চ সৰ্ব্বযোগিন্তো ভৃঙ্গরৈঃ স্বাপয়ন্তু তাঃ ॥

সমাপ্ত

দুর্গেশনন্দিনী

তথ্যঃ হুগলি জেলার লৌকিক দেবদেবী

নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য/ ধর্ম ও সংস্কৃতি, প্রাচীন ভারতীয় প্রেক্ষাপট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.