ভারতরত্ন পন্ডিত মদনমোহন মালব্য।

মদনমোহন মালব্য (১৮৬১—১৯৪৬) ছিলেন একজন ভারতীয় শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিশিষ্ট নেতা ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চার বারের সভাপতি। তাকে পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য বলা হয় এবং মহামনা সম্মানে ভূষিত করা হয়।

১৯১৬ সালে মদনমোহন মালব্য বারাণসীতে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় বা বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি (বি.এইচ.ইউ) প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় ১৯১৫ সালের বি.এইচ.ইউ আইন অনুসারে স্থাপিত। এটি এশিয়ার বৃহত্তম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে কলা, বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি, কৃষিবিজ্ঞান, চারুকলা, আইন ও প্রযুক্তি বিভাগে ৩৫,০০০-এরও বেশি ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করেন। মদনমোহন মালব্য ১৯১৯ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।

মদনমোহন মালব্য চার বার (১৯০৯, ১৯১৩, ১৯১৯ ও ১৯৩২ সাল) ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৩৪ সালে তিনি জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে হিন্দু মহাসভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য হিসেবে যোগ দেন।

মদনমোহন মালব্য ছিলেন দ্য ভারত স্কাউট অ্যান্ড গাইডসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বিশেষ প্রভাবশালী ইংরেজি সংবাদপত্র দ্য লিডারের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯০৯ সালে এটি এলাহাবাদে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯২৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার চেয়ারম্যানও ছিলেন। তারই উদ্যোগে ১৯৩৬ সালে এই পত্রিকার হিন্দি সংস্করণ হিন্দুস্তান দৈনিক প্রকাশিত হয়।

১৮৬১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের যুক্তপ্রদেশের (অধুনা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের উত্তরপ্রদেশ রাজ্য) এলাহাবাদ শহরে মদনমোহন মালব্যের জন্ম। তিনি এক গৌড় ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতার নাম পণ্ডিত ব্রিজ নাথ ও মাতার নাম মুনা দেবী। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন অধুনা মধ্যপ্রদেশের মালব (উজ্জয়িনী) অঞ্চলের সংস্কৃত পণ্ডিত। সেই থেকে তারা ‘মালব্য’ নামে পরিচিত। তাদের প্রকৃত পদবী ছিল চতুর্বেদী। মদনমোহন মালব্যের পিতা ছিলেন সংস্কৃত সন্ডিত। তিনি ভাগবত পুরাণ পাঠ করতেন।

মদনমোহন মালব্য প্রথমে সংস্কৃত পাঠশালা ও পরে একটি ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি পড়াশোনা শুরু করেছিলেন হরদেবের ধর্মজ্ঞানোপদেশ পাঠশালায়। এখানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে পরে বিদ্যাবর্ধিনী সভার একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি ভর্তি হন এলাহাবাদ জেলা স্কুলে। এখানে পড়ার সময় থেকে তিনি ‘মকরন্দ’ ছদ্মনামে কবিতা লেখা শুরু করেন। এই কবিতাগুলি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হত।

১৮৭৯ সালে তিনি মুয়ার সেন্ট্রাল কলেজ (অধুনা এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। হ্যারিসন কলেজের প্রিন্সিপাল তার জন্য একটি মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন। কারণ, সেই সময় মদনমোহন মালব্যের পরিবার আর্থিক অনটনে পড়েছিলেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন।

সংস্কৃতে স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে ভর্তি হতে চাইলেও তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল না হওয়ায় তার পিতা তাকে পারিবারিক পেশা ভাগবত পাঠের কাজে নিয়োগ করতে চান। ১৮৮৪ সালে মদনমোহন মালব্য এলাহাবাদের গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ যেন।

১৮৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মদনমোহন মালব্য কলকাতায় দাদাভাই নৌরজির সভাপতিত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। এখানে তিনি কাউন্সিলে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নিয়ে বক্তৃতা দেন। তার ভাষণে নৌরজি খুশি হননি। সেই সময় এলাহাবাদের নিকটস্থ কালাকঙ্করের শাসক রাজা রামপাল সিং হিন্দুস্তান নামে একটি হিন্দি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি পত্রিকাটিকে দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত করার জন্য একজন যোগ্য সম্পাদক খুঁজছিলেন। মদনমোহন মালব্যের ভাষণে তিনিও খুশি হননি। কিন্তু পত্রিকা সম্পাদনার জন্য তিনি তাকেই প্রস্তাব দেন। তাই ১৮৮৭ সালের জুলাই মাসে মদনমোহন মালব্য শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সেই জাতীয়তাবাদী দৈনিকটির সম্পাদনার কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি আড়াই বছর কাজ করেছিলেন। এরপর তিনি এলাহাবাদ ফিরে এসে এল.এল.বি পড়া শুরু করেন। সেই সময় এলাহাবাদে তিনি দি ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন নামে একটি ইংরেজি দৈনিকের সহ-সম্পাদনার কাজ শুরু করেন। আইন পড়া শেষ করে তিনি ১৮৯১ সালে এলাহাবাদ জেলা আদালতে ওকালতি শুরু করেন। পরে ১৮৯৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টে ওকালতি শুরু অরেন।

১৯০৯ ও ১৯১৮ সালে মদনমোহন মালব্য ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলে। তিনি ছিলেন একজন নরমপন্থী নেতা। ১৯১৬ সালের লখনউ চুক্তি অনুসারে মুসলমানদের জন্য পৃথক আইনসভার বিরোধিতা করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী তাকে “মহামনা” সম্মানে ভূষিত করেন।

১৯১১ সালে শিক্ষাবিস্তার ও সমাজসেবার জন্য তিনি তার লাভজনক আইনব্যবসা চিরকালের জন্য পরিত্যাগ করেন। সন্ন্যাস জীবন যাপনের জন্য তিনি সমাজসেবার কাজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। কিন্তু চৌরিচৌরার ঘটনায় ১৭৭ জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর ফাঁসির হুকুম হলে তিনি আদালতে তাদের হয়ে সওয়াল করেন এবং তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন।

১৯১২ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। এই কাউন্সিল ১৯১৯ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় রূপান্তরিত হলে তিনি ১৯২৬ সাল পর্যন্ত সেখানকার সদস্য থাকেন। মদনমোহন মালব্য অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। যদিও তিনি আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি ও খিলাফত আন্দোলনে কংগ্রেসের যোগদানের বিরোধিতা করেছিলেন।

১৯২৮ সালে তিনি মতিলাল নেহেরু, জওহরলাল নেহেরু ও অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে সাইমন কমিশনের বিরোধিতা করেন। ১৯৩২ সালের ৩০ মে, বিলাতি দ্রব্য বর্জন করে ভারতীয় দ্রব্য কেনার আবেদন জানিয়ে তিনি একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেন। ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

যদিও আইন অমান্য আন্দোলনের সময় ১৯৩২ সালের ২৫ মে তিনি দিল্লিতে অন্যান্য ৪৫০ জন কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে গ্রেফতার হন। কিন্তু এই বছরই সরোজিনী নাইডু গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি দিল্লিতে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন।[১৮] ১৯৩৩ সালে কলকাতায় মদনমোহন মালব্য আবার কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার আগে মদনমোহন মালব্যই একমাত্র নেতা যিনি চার বার কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৩২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ড. ভীমরাও রামজী আম্বেদকর (হিন্দুদের অনগ্রসর শ্রেণির প্রতিনিধি) ও মদনমোহন মালব্যের (হিন্দুদের অন্যান্য শ্রেণির প্রতিনিধি) মধ্যে পুনা চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে স্থির হয় প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে হিন্দুদের অনগ্রসর শ্রেণিগুলির জন্য আসন সংরক্ষিত থাকবে এবং তা হবে আইনসভার মধ্যেই, এর জন্য পৃথক আইনসভা গঠিত হবে না। এর ফলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড যে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার মাধ্যমে অনগ্রসর শ্রেণিগুলিকে ৭১টি আসন দিয়েছিলেন, তার বদলে এই শ্রেণিগুলিআইনসভায় ১৪৮টি আসন পায়। এই চুক্তির পর সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার আইনটি চুক্তি অনুযায়ী সংশোধিত হয়। এই চুক্তিতে ব্যবহৃত “অবদমিত শ্রেণি” কথাটি ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ও ১৯৫০ সালের ভারতীয় সংবিধানে “তফসিলি জাতি ও উপজাতি” শব্দে পরিণত হয়।

সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা আইনসভার বিরোধিতায় মদনমোহন মালব্য মাধব শ্রীহরি আনের সঙ্গে কংগ্রেস ছেড়ে কংগ্রেস ন্যাশানালিস্ট পার্টি গঠন করেন। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্বাচনে এই দল কেন্দ্রীয় আইনসভায় ১২টি আসন পেয়েছিল।

১৯১১ সালের এপ্রিল মাসে অ্যানি বেসান্ত মদনমোহন মালব্যের সঙ্গে দেখা করেন। তারা স্থির করেন বারাণসীতে একটি সাধারণ হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবেন। বেসান্তের প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজের সহকারী ফেলোগণ সহ বেসান্ত স্থির করেন যে এই কলেজ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হবে। সরকারও তাতে রাজি হয়। ১৯১৫ সালের কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আইন বলে ১৯১৬ সালে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এটি ভারতের একটি বিশিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৩৯ সালে মদনমোহন মালব্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার পরে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ (পরবর্তীকালে যিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন) এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন।

ভারত থেকে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও হরিজন আন্দোলনকে পরিচালনার ক্ষেত্রে মদনমোহন মালব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে তার সভাপতিত্বে আয়োজিত একটি সম্মেলনে হরিজন সেবক সংঘ স্থাপিত হয়।

মদনমোহন মালব্য বলেছিলেন, “যদি তুমি মানবাত্মার আন্তরিক পবিত্রতায় বিশ্বাস কর, তবে তুমি বা তোমার ধর্ম কখনই অন্য মানুষের স্পর্শ বা সঙ্গতে অপবিত্র বা কলুষিত হতে পারে না।”

অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে তিনি একটি হিন্দু পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি হিন্দু সমাজে অস্পৃশ্য বলে পরিচিত মানুষদের মন্ত্রদীক্ষা দিতেন। তিনি বলেছিলেন, “মন্ত্র দ্বারা তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব।”

তিনি মন্দির ও অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণের বাধা দূরীকরণে সচেষ্ট হয়েছিলেন। মূলত তারই উদ্যোগে হিন্দু মন্দিরে অস্পৃশ্যরা প্রবেশাধিকার পায়। ১৯৩৬ সালের মার্চ মাসে হিন্দু দলিত (হরিজন) নেতা পি. এন. রাজভোজ ২০০ জন অনুগামী নিয়ে রথযাত্রার দিন কলারাম মন্দিরে প্রবেশাধিকার চান। মদনমোহন মালব্য কলারাম মন্দিরের পুরোহিতদের উপস্থিতিদের তাদের দীক্ষা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেন। পরে এঁরা রথযাত্রা উৎসবেও অংশ নেন।

১৯০১ সালে মদনমোহন মালব্য এলাহাবাদে হিন্দু হোস্টেল (হিন্দু বোর্ডিং হাউস) নামে একটি ছেলেদের হোস্টেল স্থাপন করেন।

১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর বারাণসীতে মদনমোহন মালব্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর মদনমোহ মালব্যের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকীর আগের দিন তাকে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন (মরণোত্তর) দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

আজ মদনমোহন মালব্যের জন্মদিবস। মদনমোহন মালব্য (১৮৬১—১৯৪৬) ছিলেন একজন ভারতীয় শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক বিশিষ্ট নেতা ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চার বারের সভাপতি। তাকে পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য বলা হয় এবং মহামনা সম্মানে ভূষিত করা হয়।

১৯১৬ সালে মদনমোহন মালব্য বারাণসীতে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় বা বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি (বি.এইচ.ইউ) প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় ১৯১৫ সালের বি.এইচ.ইউ আইন অনুসারে স্থাপিত। এটি এশিয়ার বৃহত্তম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে কলা, বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি, কৃষিবিজ্ঞান, চারুকলা, আইন ও প্রযুক্তি বিভাগে ৩৫,০০০-এরও বেশি ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করেন। মদনমোহন মালব্য ১৯১৯ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন।

মদনমোহন মালব্য চার বার (১৯০৯, ১৯১৩, ১৯১৯ ও ১৯৩২ সাল) ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৩৪ সালে তিনি জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে হিন্দু মহাসভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য হিসেবে যোগ দেন।

মদনমোহন মালব্য ছিলেন দ্য ভারত স্কাউট অ্যান্ড গাইডসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বিশেষ প্রভাবশালী ইংরেজি সংবাদপত্র দ্য লিডারের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯০৯ সালে এটি এলাহাবাদে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯২৪ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকার চেয়ারম্যানও ছিলেন। তারই উদ্যোগে ১৯৩৬ সালে এই পত্রিকার হিন্দি সংস্করণ হিন্দুস্তান দৈনিক প্রকাশিত হয়।

১৮৬১ সালের ২৫ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের যুক্তপ্রদেশের (অধুনা ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের উত্তরপ্রদেশ রাজ্য) এলাহাবাদ শহরে মদনমোহন মালব্যের জন্ম। তিনি এক গৌড় ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতার নাম পণ্ডিত ব্রিজ নাথ ও মাতার নাম মুনা দেবী। তার পূর্বপুরুষরা ছিলেন অধুনা মধ্যপ্রদেশের মালব (উজ্জয়িনী) অঞ্চলের সংস্কৃত পণ্ডিত। সেই থেকে তারা ‘মালব্য’ নামে পরিচিত। তাদের প্রকৃত পদবী ছিল চতুর্বেদী। মদনমোহন মালব্যের পিতা ছিলেন সংস্কৃত সন্ডিত। তিনি ভাগবত পুরাণ পাঠ করতেন।

মদনমোহন মালব্য প্রথমে সংস্কৃত পাঠশালা ও পরে একটি ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি পড়াশোনা শুরু করেছিলেন হরদেবের ধর্মজ্ঞানোপদেশ পাঠশালায়। এখানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে পরে বিদ্যাবর্ধিনী সভার একটি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি ভর্তি হন এলাহাবাদ জেলা স্কুলে। এখানে পড়ার সময় থেকে তিনি ‘মকরন্দ’ ছদ্মনামে কবিতা লেখা শুরু করেন। এই কবিতাগুলি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হত।

১৮৭৯ সালে তিনি মুয়ার সেন্ট্রাল কলেজ (অধুনা এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। হ্যারিসন কলেজের প্রিন্সিপাল তার জন্য একটি মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন। কারণ, সেই সময় মদনমোহন মালব্যের পরিবার আর্থিক অনটনে পড়েছিলেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন।

সংস্কৃতে স্নাতকোত্তর পাঠক্রমে ভর্তি হতে চাইলেও তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল না হওয়ায় তার পিতা তাকে পারিবারিক পেশা ভাগবত পাঠের কাজে নিয়োগ করতে চান। ১৮৮৪ সালে মদনমোহন মালব্য এলাহাবাদের গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ যেন।

১৮৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে মদনমোহন মালব্য কলকাতায় দাদাভাই নৌরজির সভাপতিত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। এখানে তিনি কাউন্সিলে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নিয়ে বক্তৃতা দেন। তার ভাষণে নৌরজি খুশি হননি। সেই সময় এলাহাবাদের নিকটস্থ কালাকঙ্করের শাসক রাজা রামপাল সিং হিন্দুস্তান নামে একটি হিন্দি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি পত্রিকাটিকে দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত করার জন্য একজন যোগ্য সম্পাদক খুঁজছিলেন। মদনমোহন মালব্যের ভাষণে তিনিও খুশি হননি। কিন্তু পত্রিকা সম্পাদনার জন্য তিনি তাকেই প্রস্তাব দেন। তাই ১৮৮৭ সালের জুলাই মাসে মদনমোহন মালব্য শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে সেই জাতীয়তাবাদী দৈনিকটির সম্পাদনার কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি আড়াই বছর কাজ করেছিলেন। এরপর তিনি এলাহাবাদ ফিরে এসে এল.এল.বি পড়া শুরু করেন। সেই সময় এলাহাবাদে তিনি দি ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন নামে একটি ইংরেজি দৈনিকের সহ-সম্পাদনার কাজ শুরু করেন। আইন পড়া শেষ করে তিনি ১৮৯১ সালে এলাহাবাদ জেলা আদালতে ওকালতি শুরু করেন। পরে ১৮৯৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টে ওকালতি শুরু অরেন।

১৯০৯ ও ১৯১৮ সালে মদনমোহন মালব্য ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলে। তিনি ছিলেন একজন নরমপন্থী নেতা। ১৯১৬ সালের লখনউ চুক্তি অনুসারে মুসলমানদের জন্য পৃথক আইনসভার বিরোধিতা করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী তাকে “মহামনা” সম্মানে ভূষিত করেন।

১৯১১ সালে শিক্ষাবিস্তার ও সমাজসেবার জন্য তিনি তার লাভজনক আইনব্যবসা চিরকালের জন্য পরিত্যাগ করেন। সন্ন্যাস জীবন যাপনের জন্য তিনি সমাজসেবার কাজে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। কিন্তু চৌরিচৌরার ঘটনায় ১৭৭ জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর ফাঁসির হুকুম হলে তিনি আদালতে তাদের হয়ে সওয়াল করেন এবং তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন।

১৯১২ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। এই কাউন্সিল ১৯১৯ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভায় রূপান্তরিত হলে তিনি ১৯২৬ সাল পর্যন্ত সেখানকার সদস্য থাকেন। মদনমোহন মালব্য অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। যদিও তিনি আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি ও খিলাফত আন্দোলনে কংগ্রেসের যোগদানের বিরোধিতা করেছিলেন।

১৯২৮ সালে তিনি মতিলাল নেহেরু, জওহরলাল নেহেরু ও অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে সাইমন কমিশনের বিরোধিতা করেন। ১৯৩২ সালের ৩০ মে, বিলাতি দ্রব্য বর্জন করে ভারতীয় দ্রব্য কেনার আবেদন জানিয়ে তিনি একটি ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করেন। ১৯৩০ সালে তিনি প্রথম গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

যদিও আইন অমান্য আন্দোলনের সময় ১৯৩২ সালের ২৫ মে তিনি দিল্লিতে অন্যান্য ৪৫০ জন কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে গ্রেফতার হন। কিন্তু এই বছরই সরোজিনী নাইডু গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি দিল্লিতে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন।[১৮] ১৯৩৩ সালে কলকাতায় মদনমোহন মালব্য আবার কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভারতের স্বাধীনতার আগে মদনমোহন মালব্যই একমাত্র নেতা যিনি চার বার কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৩২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ড. ভীমরাও রামজী আম্বেদকর (হিন্দুদের অনগ্রসর শ্রেণির প্রতিনিধি) ও মদনমোহন মালব্যের (হিন্দুদের অন্যান্য শ্রেণির প্রতিনিধি) মধ্যে পুনা চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে স্থির হয় প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে হিন্দুদের অনগ্রসর শ্রেণিগুলির জন্য আসন সংরক্ষিত থাকবে এবং তা হবে আইনসভার মধ্যেই, এর জন্য পৃথক আইনসভা গঠিত হবে না। এর ফলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড যে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার মাধ্যমে অনগ্রসর শ্রেণিগুলিকে ৭১টি আসন দিয়েছিলেন, তার বদলে এই শ্রেণিগুলিআইনসভায় ১৪৮টি আসন পায়। এই চুক্তির পর সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার আইনটি চুক্তি অনুযায়ী সংশোধিত হয়। এই চুক্তিতে ব্যবহৃত “অবদমিত শ্রেণি” কথাটি ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ও ১৯৫০ সালের ভারতীয় সংবিধানে “তফসিলি জাতি ও উপজাতি” শব্দে পরিণত হয়।

সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা আইনসভার বিরোধিতায় মদনমোহন মালব্য মাধব শ্রীহরি আনের সঙ্গে কংগ্রেস ছেড়ে কংগ্রেস ন্যাশানালিস্ট পার্টি গঠন করেন। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্বাচনে এই দল কেন্দ্রীয় আইনসভায় ১২টি আসন পেয়েছিল।

১৯১১ সালের এপ্রিল মাসে অ্যানি বেসান্ত মদনমোহন মালব্যের সঙ্গে দেখা করেন। তারা স্থির করেন বারাণসীতে একটি সাধারণ হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবেন। বেসান্তের প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল হিন্দু কলেজের সহকারী ফেলোগণ সহ বেসান্ত স্থির করেন যে এই কলেজ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হবে। সরকারও তাতে রাজি হয়। ১৯১৫ সালের কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় আইন বলে ১৯১৬ সালে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এটি ভারতের একটি বিশিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ১৯৩৯ সালে মদনমোহন মালব্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার পরে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ (পরবর্তীকালে যিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন) এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন।

ভারত থেকে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ ও হরিজন আন্দোলনকে পরিচালনার ক্ষেত্রে মদনমোহন মালব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে তার সভাপতিত্বে আয়োজিত একটি সম্মেলনে হরিজন সেবক সংঘ স্থাপিত হয়।

মদনমোহন মালব্য বলেছিলেন, “যদি তুমি মানবাত্মার আন্তরিক পবিত্রতায় বিশ্বাস কর, তবে তুমি বা তোমার ধর্ম কখনই অন্য মানুষের স্পর্শ বা সঙ্গতে অপবিত্র বা কলুষিত হতে পারে না।”

অস্পৃশ্যতা দূরীকরণে তিনি একটি হিন্দু পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি হিন্দু সমাজে অস্পৃশ্য বলে পরিচিত মানুষদের মন্ত্রদীক্ষা দিতেন। তিনি বলেছিলেন, “মন্ত্র দ্বারা তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব।”

তিনি মন্দির ও অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রে বর্ণের বাধা দূরীকরণে সচেষ্ট হয়েছিলেন। মূলত তারই উদ্যোগে হিন্দু মন্দিরে অস্পৃশ্যরা প্রবেশাধিকার পায়। ১৯৩৬ সালের মার্চ মাসে হিন্দু দলিত (হরিজন) নেতা পি. এন. রাজভোজ ২০০ জন অনুগামী নিয়ে রথযাত্রার দিন কলারাম মন্দিরে প্রবেশাধিকার চান। মদনমোহন মালব্য কলারাম মন্দিরের পুরোহিতদের উপস্থিতিদের তাদের দীক্ষা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেন। পরে এঁরা রথযাত্রা উৎসবেও অংশ নেন।

১৯০১ সালে মদনমোহন মালব্য এলাহাবাদে হিন্দু হোস্টেল (হিন্দু বোর্ডিং হাউস) নামে একটি ছেলেদের হোস্টেল স্থাপন করেন।

১৯৪৬ সালের ১২ নভেম্বর বারাণসীতে মদনমোহন মালব্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর মদনমোহ মালব্যের ১৫৩তম জন্মবার্ষিকীর আগের দিন তাকে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন (মরণোত্তর) দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

পন্ডিত মদনমোহন মালব্যের জন্মদিবসে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.