বেআইনি নির্মাণ নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কঠোর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালতের স্পষ্ট বার্তা— অবৈধ জমিতে বা নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে তৈরি হওয়া ফ্ল্যাট কিনে কোনও ক্রেতা অতিরিক্ত আইনি সুরক্ষা দাবি করতে পারেন না; সেই বেআইনি নির্মাণ ভাঙা হবেই। হাওড়া পুরসভা এলাকার একটি বেআইনি নির্মাণ সংক্রান্ত মামলায় রবিবার বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ সাফ জানায়, বেআইনিভাবে নির্মিত ফ্ল্যাট কিনলে ক্রেতা মূল বিক্রেতার চেয়ে বেশি আইনি অধিকার পেতে পারেন না।
রাজ্যজুড়ে বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে পুরসভাগুলির অতি-সক্রিয়তার মাঝেই ছুটির দিনে এই মামলার শুনানির জন্য বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ বসানোর অনুমতি দিয়েছিলেন হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল।
মামলার পটভূমি: প্রতিবেশীদের বিবাদ ও পুরসভার তদন্ত
হাওড়া পুরসভা এলাকার একটি চারতলা ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সূত্রপাত। ভবনটি পুরসভার অনুমোদিত নকশা (Sanctioned Plan) মেনে তৈরি কি না, তা নিয়ে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হাই কোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হয়। আদালত তখন হাওড়া পুরসভাকে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দেয়।
পুরসভার তদন্তে উঠে আসে যে, পুরো ভবনটি নির্মাণের ক্ষেত্রেই পুরসভার নিয়মবিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে। তবে ভবনটির তিনতলা পর্যন্ত নির্মাণের অনুমোদন থাকলেও, চারতলাটি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। এরপর পুরসভা বাড়ির মালিককে অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিলেও তা কার্যকর হয়নি। পরবর্তীতে পুরসভা নিজেই ওই ভবনটি ভাঙার কাজ শুরু করলেও, চারতলাটি পুরোটা না ভেঙেই কাজ থামিয়ে দেয়।
ফ্ল্যাট ক্রেতাদের আবেদন ও পুরসভার বিরুদ্ধে অভিযোগ
এরই মধ্যে গত বছর (২০২৫ সাল) মামলার অন্যতম আবেদনকারী মৌসুমী রায় এবং তাঁর পরিবার ওই ভবনের চারতলার ফ্ল্যাটটি কেনেন। তাঁদের বক্তব্য, গত বছর নভেম্বর মাসে ফ্ল্যাটটির আইনি রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে। এখন পুরসভা আগাম কোনও নোটিস না দিয়েই আকস্মিকভাবে তাঁদের ফ্ল্যাটটি ভাঙতে উদ্যোগী হয়েছে। মৌসুমীদের দাবি, তাঁদের পক্ষ বা বক্তব্য না শুনেই পুরসভার এই ভাঙার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সিঙ্গল বেঞ্চের ভাঙার নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই মূলত ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়েছিলেন এই ক্রেতারা।
“সরকারি সিদ্ধান্তের আগে ব্যক্তিগত শুনানি বাধ্যতামূলক নয়”, রায় আদালতের
মামলাকারীদের সমস্ত যুক্তি খণ্ডন করে হাই কোর্টের বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, সিঙ্গল বেঞ্চের রায় মেনেই পুরসভা ওই ভবনের অবৈধ চারতলাটি ভেঙে ফেলতে পারবে।
হাই কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: আদালত জানায়, এটা ঠিক যে মামলাকারীরা অনেক পরে ওই সম্পত্তি কিনেছেন। কিন্তু তার জেরে ওই বেআইনি কাঠামোর ওপর তাঁদের কোনও আইনি অধিকার তৈরি হয় না; আইনি অধিকার কেবল মূল জমির মালিকেরই থাকে। ক্রেতারা স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের যে দাবি তুলেছেন, তাও খারিজ করে দুই বিচারপতির বেঞ্চ জানায়, প্রতিটি সরকারি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষের ব্যক্তিগত শুনানি করা বাধ্যতামূলক নয়। শুনানির সুযোগ দিলে পরিস্থিতি বদলে যেত, এমন কোনও জোরালো প্রমাণ মামলাকারীরা দেখাতে পারেননি।
বেআইনি নির্মাণে রাজ্যের কঠোর অবস্থান
বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বেআইনি ও অননুমোদিত নির্মাণ নিয়ে রাজ্যের নতুন সরকারকে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে। কলকাতা-সহ রাজ্যের একাধিক পুরসভা ইতিমধ্যেই বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে ব্যাপক সক্রিয়তা দেখাচ্ছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে বুলডোজ়ার চালিয়ে ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও উঠছে। এই সংবেদনশীল আবহে ছুটির দিন রবিবারেও এই বিশেষ মামলার জরুরি শুনানি সম্পন্ন করল কলকাতা হাই কোর্ট।

