“রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়, কিন্তু সৌজন্য আর গুরুভক্তি চিরন্তন।”— নির্বাচনী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এবং রাজনৈতিক বৈরিতা ভুলে এক অভূতপূর্ব নজির তৈরি হলো বীরভূমের রামপুরহাটে। ‘বিকশিত রামপুরহাট’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার তথা রামপুরহাটের পাঁচবারের বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়ে তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা। রাজনীতিতে এই ধরনের সৌজন্যের ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল ও সুধী সমাজ।
বিজেপির এই নতুন বিধায়কের এমন স্বতঃস্ফূর্ত সৌজন্য সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন বর্ষীয়ান তৃণমূল নেতা আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ও। রামপুরহাট বিধানসভা এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নের স্বার্থে তিনি নতুন বিধায়ককে সব ধরনের সহযোগিতা ও সুপরামর্শ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
শিক্ষক আশিসবাবুর হাত ধরেই ছাত্র ধ্রুবর রাজনৈতিক আশীর্বাদ
পরাজিত আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ। রামপুরহাট কলেজের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক আশিসবাবু প্রথম জীবনে কংগ্রেসের টিকিট থেকে হেরে পরবর্তীতে তৃণমূলে যোগ দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে ফরওয়ার্ড ব্লকের মহম্মদ হান্নাকে পরাজিত করে প্রথমবার বিধানসভায় প্রবেশ করেন তিনি। প্রথমদিকে বীরভূম জেলা তৃণমূল সভাপতি অনুব্রত মণ্ডলের সঙ্গে তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে তিনি মন্ত্রিত্ব পাননি। পরে সেই দূরত্ব মিটিয়ে যথাক্রমে কৃষি, প্রাথমিক শিক্ষা, আয়ুষ এবং তথ্য ও পরিসংখ্যান দফতরের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর পদ সামলান। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গের ১৩তম ডেপুটি স্পিকার হিসেবে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন।
তবে ২০২৬-এর এই নির্বাচনে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে তিনি পরাজিত হন। কাকতালীয়ভাবে, বিজেপির এই নতুন বিধায়ক ধ্রুব সাহা একসময় রামপুরহাট কলেজে আশিসবাবুরই ছাত্র ছিলেন। ফলে ছাত্রের কাছে নিজে পরাজিত হলেও, ধ্রুবকে জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করেন এবং আরও উন্নতি করার পরামর্শ দেন শিক্ষক আশিসবাবু।
“সহযোগিতার হাত সর্বদা থাকবে” — আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়
রবিবার শিক্ষক ও ছাত্র তথা প্রাক্তন এবং বর্তমান বিধায়ক বেশ কিছুক্ষণ রামপুরহাটের উন্নয়ন নিয়ে একান্তে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে আবেগাপ্লুত আশিসবাবু সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
“ধ্রুব সাহা আমার ছাত্র প্রতিম। ও এখন এই এলাকার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছে। রামপুরহাটের মানুষের স্বার্থে ও যখনই আমার কাছে সাহায্য বা কোনো গাইডেন্স চাইবে, আমি তখনই ওকে পরামর্শ দেব। সহযোগিতার হাত সর্বদা থাকবে।”
ধ্রুব সাহার এই সৌজন্য সাক্ষাৎকে তিনি সুস্থ গণতন্ত্রের মূল মন্ত্র বলে অভিহিত করেন।
‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্নীতি দমনের পরামর্শ
সাক্ষাৎ শেষে বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা তাঁর শিক্ষকের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “প্রাক্তন বিধায়ক আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। উনি টানা ২৫ বছর এই রামপুরহাটের বিধায়ক ছিলেন, মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছেন। তাই ওঁর কাছে আশীর্বাদ নিতে আসাটা আমার নৈতিক কর্তব্য। তাছাড়া একসময় বিজেপির সঙ্গে তৃণমূলের যখন নির্বাচনী জোট ছিল, তখন উনি আমাদের সঙ্গেই ছিলেন।”
দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মূল মন্ত্রের কথা স্মরণ করিয়ে ধ্রুববাবু আরও বলেন:
“আমাদের যশস্বী প্রধানমন্ত্রী বলেছেন— ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস এবং সবকা প্রয়াস।’ তাই আগামী দিনে বিকশিত রামপুরহাট গড়ার জন্য স্যারের এই ‘প্রয়াস’ এবং ওঁর ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের চলার পথে অত্যন্ত কাম্য।”
ধ্রুব সাহা জানান, রামপুরহাটের পরিকাঠামো ও চিকিৎসা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন নিয়ে স্যার (আশিসবাবু) তাঁকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে রামপুরহাট হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালকদের একটি বড় চক্র রোগীদের বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার নাম করে ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি নার্সিংহোমে ঢুকিয়ে দিচ্ছে এবং মোটা টাকা কমিশন আদায় করছে। এই স্বাস্থ্য দুর্নীতি অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক।
এদিনের এই ঐতিহাসিক সৌজন্য সাক্ষাতের সময় বিধায়ক ধ্রুব সাহার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিজেপি মহিলা মোর্চার জেলা সভানেত্রী রশ্মি দে, বীরভূম সাংগঠনিক জেলার সহ-সভাপতি নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জেলা কোষাধ্যক্ষ সুরজিৎ সরকার।

