একদিকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে পরমাণু ও সামরিক সংঘাত রুখতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পাকিস্তান। দুই মহাশত্রু শিবিরের শর্ত ও রফাসূত্র চালাচালি করার গুরুদায়িত্ব এখন ইসলামাবাদের কাঁধে। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি ফেরানোর এই কূটনৈতিক তৎপরতার আবহেই আন্তর্জাতিক মহলকে চমকে দিয়ে সৌদি আরবে বিপুল সেনা ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করল পাকিস্তান। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ‘রয়টার্স’ (Reuters)-এর এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্টে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক জলসীমা ও ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যেই জরুরি ভিত্তিতে ৮ হাজার সেনা সৌদিতে পাঠিয়েছে। এর পাশাপাশি পাঠানো হয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানের একটি পূর্ণাঙ্গ স্কোয়াড্রন এবং একটি শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System)।
গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তির জের: ‘এক দেশে হামলা মানেই যৌথ প্রতিরোধ’
হঠাৎ কেন এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সৌদিতে সেনা ও যুদ্ধবিমান পাঠাল পাকিস্তান? রয়টার্স জানাচ্ছে, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি দ্বিপাক্ষিক ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ রয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই বিশেষ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ রিয়াদে গিয়ে সৌদির যুবরাজ তথা ক্রাউন প্রিন্স মহম্মদ বিন সলমনের সঙ্গে এক হাই-প্রোফাইল বৈঠকে মিলিত হন। যদিও এই চুক্তির সমস্ত শর্ত ও কৌশলগত দিক নিয়ে দুই দেশের কেউই কোনোদিন প্রকাশ্যে মুখ খোলেনি। তবে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো— চুক্তিবদ্ধ যেকোনো একটি দেশের ওপর বহিরাগত আক্রমণ হলে, দ্বিতীয় দেশ তা নিজেদের ওপর আক্রমণ বলে গণ্য করবে এবং সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে তাৎক্ষণিক সাহায্য করবে। সেই শর্ত মেনেই এই বিশাল বাহিনী পাঠিয়েছে ইসলামাবাদ।
সৌদির খরচে জেএফ-১৭ (JF-17) স্কোয়াড্রন মোতায়েন
পাক ও সৌদি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, প্রায় ১৬টি যুদ্ধবিমান নিয়ে গঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ ফাইটার স্কোয়াড্রন সৌদিতে পাঠিয়েছে পাকিস্তান বিমানবাহিনী। এই স্কোয়াড্রনের সিংহভাগই হলো চীনের সঙ্গে যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি পাকিস্তানের প্রধান যুদ্ধবিমান ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ (JF-17 Thunder)।
এর আগে গত এপ্রিল মাসের শুরুতেও এই একই যুদ্ধবিমান রিয়াদে পাঠিয়েছিল পাকিস্তান। সামরিক চুক্তি অনুযায়ী, সৌদিতে মোতায়েন করা এই যুদ্ধবিমান এবং বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্বে থাকবে পাকিস্তানি সেনারাই। তবে এই মিশন ও রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় বিপুল আর্থিক খরচ বহন করবে সৌদি আরব সরকার।
ইরানের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার হুমকি ও ইসলামাবাদের ভারসাম্য নীতি
সম্প্রতি ইরানে ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ বিমান হামলার পর তেহরান তীব্র প্রত্যাঘাতের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্য) যে যে দেশে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তার প্রত্যেকটিকে নিশানা করা হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সৌদিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিও ইরানের এই ‘হিট লিস্ট’-এ চলে আসে।
সৌদি আরব এই সম্ভাব্য ইরানি ড্রোন বা মিসাইল হামলা থেকে নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতেই পাকিস্তানের থেকে এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান আনিয়েছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
অন্যদিকে, ইরান হুমকি দেওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান এই সংঘাতে উভয় পক্ষের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে অত্যন্ত সতর্কভাবে ‘ভারসাম্য নীতি’ বা ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট কূটনীতি মেনে চলছে। দুই পক্ষের মাঝে মধ্যস্থতাকারী হতে পাকিস্তান নিজেই আগ্রহ দেখায় এবং তাদের উদ্যোগেই সম্প্রতি ইসলামাবাদে একটি গোপন বৈঠকে বসেছিল ইরান ও আমেরিকার প্রতিনিধি দল। যদিও সেই বৈঠকে চূড়ান্ত কোনো রফাসূত্র মেলেনি।
আপাতত আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে এক সাময়িক যুদ্ধবিরতি চলছে। কিন্তু কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় এই যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকবে, তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল। এই চরম অনিশ্চয়তার মাঝে সৌদিতে পাকিস্তানের এই বড়সড় সামরিক পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— তবে কি পর্দার আড়ালে ফের সৌদি বা মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে বড়সড় হামলার ছক কষছে ইরান? আর সেই কারণেই কি আগেভাগে নিজেদের দুর্গ মজবুত করতে পাকিস্তানি ফৌজকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে রিয়াদ? উত্তর খুঁজছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।

