নবান্নে নতুন জমানার প্রথম ১০ দিনেই ‘ডবল ইঞ্জিন’ ধাক্কা: দুর্নীতির অভিযোগে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও ডিসিপিসহ শ্রীঘরে এক ডজনেরও বেশি প্রভাবশালী

নবান্নে নতুন জমানার প্রথম ১০ দিনেই ‘ডবল ইঞ্জিন’ ধাক্কা: দুর্নীতির অভিযোগে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী ও ডিসিপিসহ শ্রীঘরে এক ডজনেরও বেশি প্রভাবশালী

“কথা নয়, কাজে বিশ্বাসী”— ভোটপ্রচারে রাজ্যবাসীকে দেওয়া ‘দুর্নীতিমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সরকার গঠনের প্রথম ১০ দিনেই নজিরবিহীন তৎপরতা দেখাল শুভেন্দু অধিকারীর নতুন বিজেপি সরকার। নির্বাচনী ইশতেহার ও স্লোগানে যে ‘তোলাবাজি, সিন্ডিকেট এবং দুর্নীতিমুক্ত’ বাংলার কথা বলা হয়েছিল, তা বাস্তবায়িত করতে এবার কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে রাজ্য পুলিশ। একই সঙ্গে সম্পূর্ণ ‘ফ্রি-হ্যান্ড’ পেয়ে রাজ্যে সমান্তরালভাবে ঝোড়ো ব্যাটিং শুরু করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি (ED) ও সিবিআই (CBI)-ও।

গত ৯ মে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণের পর মাত্র ১০ দিনের মধ্যে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় এজেন্সির যৌথ ‘ডবল ইঞ্জিন’ অভিযানে গ্রেফতার হয়েছেন এক ডজনেরও বেশি হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতা, কাউন্সিলর ও পুলিশ আধিকারিক। ধৃতদের তালিকায় রয়েছেন রাজ্যের সদ্যপ্রাক্তন মন্ত্রী থেকে শুরু করে খোদ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ‘অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ’ আইপিএস অফিসারও।

নবান্নে ক্ষমতা বদলের পর গত ১০ দিনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে হওয়া মেগা অ্যাকশনের পুঙ্খানুপুঙ্খ খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:


১. পুরনিয়োগ দুর্নীতিতে শ্রীঘরে সদ্যপ্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু

নতুন সরকার গঠনের মাত্র দু’দিনের মাথায়, অর্থাৎ ১১ মে রাতে ইডি-র হাতে গ্রেফতার হন রাজ্যের প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী তথা বিধাননগর বিধানসভা কেন্দ্রের সদ্য-পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী সুজিত বসু। পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় দক্ষিণ দমদম পুরসভায় বেআইনিভাবে প্রায় ১৫০ জন চাকরিপ্রার্থীর নাম সুপারিশ করার মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। দীর্ঘ টালবাহানার পর গত সোমবার রাত সওয়া ৯টা নাগাদ সিজিও কমপ্লেক্স থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে ইডি। বর্তমানে তিনি ১০ দিনের ইডি হেফাজতে রয়েছেন।

২. সোনা পাপ্পু মামলা: গ্রেফতার কালীঘাটের প্রাক্তন ওসি তথা ডিসিপি শান্তনু

১৪ মে রাতে রাজ্য রাজনীতি ও পুলিশ প্রশাসনকে স্তব্ধ করে দিয়ে ইডি গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশের পোস্টিংয়ে থাকা ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিশেষ আস্থাভাজন’ এবং কালীঘাটের প্রাক্তন ওসি হিসেবে পরিচিত শান্তনুবাবুর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারিতে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

বহুবার সমন এড়ানো এবং দেশ ছেড়ে পালানো রুখতে ইডি তাঁর বিরুদ্ধে ‘লুক আউট নোটিস’ জারি করেছিল। গত মাসে তাঁর ফার্ন রোডের বাসভবনে প্রায় ২০ ঘণ্টার ম্যারাথন তল্লাশি চালায় ইডি। অবশেষে ১৪ মে সকাল ১১টায় সিজিও কমপ্লেক্সে হাজির হলে সাড়ে ১০ ঘণ্টা জেরার পর রাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃত ব্যবসায়ী জয় কামদারের নথি এবং সোনা পাপ্পু ডিলিংয়ে এই পুলিশকর্তার সরাসরি আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র মিলেছে।

৩. দীর্ঘ নিখোঁজ পর্বের পর খোদ ‘সোনা পাপ্পু’ গ্রেফতার

ডিসি শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের গ্রেফতারির পর আর রক্ষে মেলেনি। ভোটের আগে থেকেই পলাতক ও নিখোঁজ থাকা মূল অভিযুক্ত ‘সোনা পাপ্পু’ সোমবার (১৮ মে) সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ বাধ্য হয়ে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি দফতরে আত্মসমর্পণ করতে আসেন। এরপর টানা ৯ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা শেষে রাতেই তাঁকে গ্রেফতার করেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা।


জেলায় জেলায় পুলিশ ও সিবিআই-এর সাঁড়াশি অভিযান

কলকাতার পাশাপাশি জেলাগুলিতেও তোলাবাজি, কাটমানি এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভাঙতে পুলিশ ও সিবিআই সমানভাবে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে:

  • মুর্শিদাবাদ (১৩-১৪ মে): ১৩ মে বহরমপুর পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর শান্তনু মজুমদার ওরফে মেজো-কে তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করে জেলা পুলিশ। এর ঠিক পরের দিন, অর্থাৎ ১৪ মে মুর্শিদাবাদ জেলাতেই শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় দু’জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে সিবিআই।
  • নদিয়া ও আসানসোল (১৭-১৮ মে): ১৭ মে তোলাবাজির অভিযোগে নদিয়ার কৃষ্ণনগর-১ পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ স্মরজিৎ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ১৮ মে (সোমবার) আসানসোলে রাষ্ট্রায়ত্ত কয়লাখনি ও শিল্পাঞ্চলে তোলাবাজি সিন্ডিকেট চালানোর অভিযোগে আইএনটিটিইউসি (INTTUC)-র ব্লক সভাপতি রাজু অহলুওয়ালিয়াকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এর আগেই রাজুর ৩ শাগরেদকে পুলিশ খাঁচায় পুরেছিল।
  • কোচবিহার (১৭ মে): দিনহাটায় ঘুষ নিয়ে পুরসভার জাল বা নকল বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করানোর অভিযোগে গ্রেফতার হন প্রাক্তন পুরপ্রধান গৌরীশঙ্কর মাহেশ্বরী। এই একই জালিয়াতি মামলায় মৌমিতা ভট্টাচার্য নামে এক তৃণমূল যুবনেত্রী তথা পুরকর্মীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া ঘুঘুমারিতে আবাস যোজনার ঘর পাইয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের থেকে ‘কাটমানি’ নেওয়ার অভিযোগে তৃণমূলের বুথ সভাপতি প্রতাপচন্দ্র চন্দ এবং পঞ্চায়েত সদস্যা সেলিনা খাতুনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

রাজনৈতিক মহলের বিশ্লেষণ: নবান্নের দ্বিবিধ বার্তা

নতুন সরকারের প্রথম ১০ দিনের এই অভূতপূর্ব ঝোড়ো অভিযান প্রসঙ্গে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ওয়াকিবহাল মহলের মত, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আসলে রাজ্যবাসীকে স্পষ্ট দুটি বার্তা দিতে চেয়েছেন:

প্রথমত, দুর্নীতিমুক্ত পশ্চিমবঙ্গ গড়ার যে প্রতিশ্রুতি বিজেপি দিয়েছিল, তা কেবল নির্বাচনী বুলি ছিল না। তোলাবাজি ও কাটমানি সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকলে শাসক-বিরোধী কাউকেই রেয়াত করা হবে না।

দ্বিতীয়ত, রাজ্যে পূর্বতন সরকারের মতো কেন্দ্রীয় এজেন্সির (CBI-ED) কাজে কোনো রাজনৈতিক বাধা সৃষ্টি করা হবে না। পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সংস্থা— দুই ‘ইঞ্জিন’ স্বাধীনভাবে কাজ করে আইনের শাসন কায়েম করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.