অবশেষে ইডি-র জালে কসবার ‘ডন’ সোনা পাপ্পু, সিজিও-তে ৯ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা শেষে গ্রেফতার

অবশেষে ইডি-র জালে কসবার ‘ডন’ সোনা পাপ্পু, সিজিও-তে ৯ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা শেষে গ্রেফতার

লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই যাঁর নাম নিয়ে রাজ্য রাজনীতি ও অপরাধজগতে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল, সেই বিতর্কিত ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুকে অবশেষে গ্রেফতার করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। দীর্ঘ কয়েক মাস পলাতক থাকার পর, সোমবার সকালে আকস্মিকভাবেই সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি দফতরে আত্মসমর্পণ করতে আসেন তিনি। এরপর সকাল থেকে টানা ৯ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা শেষে রাতে তাঁকে আর্থিক প্রতারণা, তোলাবাজি এবং বেআইনি অর্থ লেনদেনের মামলায় সরকারিভাবে গ্রেফতার করেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা।


রবীন্দ্র সরোবরের অশান্তি ও ফেসবুক লাইভ রহস্য

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্র সরোবর থানা এলাকায় একটি মারাত্মক গোষ্ঠী সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় প্রথম বড়সড়ভাবে নাম জড়ায় কসবার এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সোনা পাপ্পুর। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ছিল, ওই হিংসাত্মক ঘটনার নেপথ্যে মূল চক্রান্তকারী ছিলেন বিশ্বজিৎ স্বয়ং এবং তাঁর দলবলই এলাকায় তাণ্ডব চালিয়েছিল। পুলিশ এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন শাগরেদকে গ্রেফতার করলেও সোনা পাপ্পু সুকৌশলে গা ঢাকা দেন।

পলাতক অবস্থাতেই পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে দু-দুবার ফেসবুক লাইভে আসেন পাপ্পু। সেখানে তিনি দাবি করেন, কোনো রকম অশান্তি বা অপরাধের সঙ্গে তিনি যুক্ত নন এবং তাঁকে রাজনৈতিকভাবে ফাঁসানো হচ্ছে।


তল্লাশিতে উদ্ধার বিদেশি পিস্তল ও কোটি টাকার সম্পত্তি

পলাতক সোনা পাপ্পুর খোঁজে তল্লাশি চলাকালীনই আচমকা তাঁর কসবার বাসভবনে হানা দেয় ইডি। একই সঙ্গে তল্লাশি চালানো হয় বেহালার নামী ব্যবসায়ী জয় কামদারের বাড়িতেও। ওই মেগা অভিযানে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, একটি বিলাসবহুল দামি গাড়ি এবং কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির নথি বাজেয়াপ্ত করেন কেন্দ্রীয় আধিকারিকেরা।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সোনা পাপ্পুর বাড়ি থেকে একটি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করে ইডি। তদন্তে জানা যায়, ধৃত ব্যবসায়ী জয় কামদারের মাধ্যমেই এই বেআইনি বিদেশি অস্ত্রটি কিনেছিলেন পাপ্পু। পরবর্তীতে অস্ত্রটি গড়িয়াহাট থানায় জমা দেয় ইডি এবং পাপ্পুর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনেও (Arms Act) মামলা রুজু করা হয়।


ডিসিপি শান্তনু ও জয়ের পর এবার মূল পাণ্ডা শ্রীঘরে

ইডি সূত্রে খবর, সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে কলকাতা ও জেলার বিভিন্ন থানায় তোলাবাজি, হুমকি এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ভুরি ভুরি এফআইআর (FIR) দায়ের হয়েছিল। এই সিন্ডিকেট ও আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্তে নেমে ইডি প্রথমে গ্রেফতার করে বেহালার ব্যবসায়ী জয় কামদারকে।

জয়কে জেরার সূত্র ধরেই গত মাসে ফার্ন রোডে কলকাতা পুলিশের তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের বাড়িতে ম্যারাথন হানা দেয় ইডি। কালীঘাটের প্রাক্তন ওসি তথা এই ডিসিপির সাথে সোনা পাপ্পুর কোটি কোটি টাকার অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ মেলে। ইডি ডিসি শান্তনুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করার পর তাঁকেও গ্রেফতার করে।


ভিনরাজ্যে আত্মগোপন ও বিনা নোটিসে হাজিরা

সহযোগী জয় কামদার ও প্রভাবশালী পুলিশকর্তা শান্তনু সিংহ বিশ্বাস গ্রেফতার হলেও সোনা পাপ্পু কোথায়, তা নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রহস্য দানা বেঁধেছিল। তদন্তকারীরা অনুমান করছিলেন, ট্র্যাকিং এড়াতে তিনি ভিনরাজ্যে আত্মগোপন করেছিলেন। কিন্তু ভিনরাজ্যে থেকেও কীভাবে তাঁর কাছে বিপুল অর্থের জোগান আসছিল, তা নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছিল ইডি।

এর আগে ইডি-র তরফে সোনা পাপ্পুকে একাধিকবার সমন বা নোটিস পাঠানো হলেও তিনি হাজিরা এড়িয়ে যান। তবে সোমবার সকালে কোনো পূর্ব নোটিস ছাড়াই নাটকীয়ভাবে স্ত্রী-কে সঙ্গে নিয়ে সিজিও কমপ্লেক্সে পৌঁছে যান পাপ্পু। ইডি আধিকারিকদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের সময় বহু প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান এবং তদন্তে সম্পূর্ণ অসহযোগিতা করেন তিনি। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার বয়ান রেকর্ড ও টানাপোড়েনের পর রাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সোনা পাপ্পুর এই গ্রেফতারির ফলে কলকাতার তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজের বহু রাঘববোয়ালের নাম সামনে আসবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.