সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য খণ্ডন ভারতের, নেদারল্যান্ডসে কড়া জবাব বিদেশ মন্ত্রকের

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য খণ্ডন ভারতের, নেদারল্যান্ডসে কড়া জবাব বিদেশ মন্ত্রকের

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেদারল্যান্ডস সফর চলাকালীন ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা (Press Freedom) এবং সংখ্যালঘু অধিকার (Minority Rights) নিয়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেনের (Rob Jetten) করা মন্তব্যকে উড়িয়ে দিল নয়াদিল্লি। দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আবহে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রীর তোলা উদ্বেগের তীব্র বিরোধিতা করেছে ভারত সরকার। বিদেশ মন্ত্রকের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, এই ধরনের মন্তব্য ভারতের সুপ্রাচীন গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং বহুত্ববাদী সভ্যতাগত চরিত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।


ডাচ প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ ও সংবাদপত্রের রিপোর্ট

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেদারল্যান্ডস সফরের ঠিক প্রাক্কালে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন ভারতকে নিয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন। ডাচ সংবাদপত্র ‘ডে ভল্সক্রান্ট’ (De Volkskrant)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী জেটেন মন্তব্য করেন যে, ডাচ সরকারের উদ্বেগ কেবল ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েই নয়, বরং সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারও বিপন্ন।

দ্বিপাক্ষিক স্তরে মোদী-জেটেন বৈঠকের ঠিক আগের মুহূর্তে ডাচ প্রধানমন্ত্রীর এই পাবলিক স্টেটমেন্ট আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শোরগোল ফেলে দেয়।


“ভারত সম্পর্কে ধারণাই নেই!” — যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে তোপ ভারতের

প্রধানমন্ত্রী মোদীর ডাচ সফরের প্রথম দিনেই এই বিতর্কিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। একটি যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে নেদারল্যান্ডসের এক সাংবাদিক দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মুখোমুখি কোনো যৌথ প্রেস কনফারেন্স না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা নিয়ে ডাচ সরকারের উদ্বেগের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন।

সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের কড়া জবাব দিতে গিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের (পশ্চিম) সচিব সিবি জর্জ বলেন:

“ভারতের সামাজিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো সম্পর্কে যথাযথ ধারণার অভাব থেকেই প্রায়শই আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই ধরনের ভিত্তিহীন সমালোচনা উঠে আসে। যিনি বা যাঁরা এই ধরনের প্রশ্ন তুলছেন, তাঁদের আসলে ১৪০ কোটির এই সুবিশাল দেশ সম্পর্কে কোনো সম্যক জ্ঞান নেই।”


৫০০০ বছরের সভ্যতা ও ধর্মের সহাবস্থানের খতিয়ান

ভারতের বহুত্ববাদী সমাজের পক্ষে জোরালো সওয়াল করে বিদেশ মন্ত্রকের সচিব সিবি জর্জ তুলে ধরেন দেশের ঐতিহাসিক ও জনমিতিক (Demographic) সত্য। তিনি ডাচ সংবাদমাধ্যমকে মনে করিয়ে দেন যে, ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র এবং সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্যে অনন্য।

ভারতের এই ধর্মীয় সহনশীলতার সপক্ষে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেন:

  • চার ধর্মের উৎসভূমি: হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখ— বিশ্বের এই চার প্রধান ধর্মের উৎপত্তি ভারতেই হয়েছে এবং শতাব্দী ধরে এগুলি দেশে সমানভাবে বিকশিত হচ্ছে। বিশ্বের আর কোনো দেশে একসঙ্গে চার-চারটি ধর্মের জন্ম হয়নি।
  • নিপীড়নহীন ইতিহাস: ইহুদি সম্প্রদায় গত ২৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতে সম্পূর্ণ শান্তিতে বসবাস করছে এবং তারা এ দেশে কোনোদিন কোনো ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হয়নি। একইভাবে খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম ধর্মও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের মাটিতে বিকশিত হয়েছে।
  • সংখ্যালঘু জনসংখ্যা বৃদ্ধি: ভারতে সংখ্যালঘুরা যে সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে রয়েছেন, তার প্রমাণ হিসেবে সিবি জর্জ জনসংখ্যা বৃদ্ধির খতিয়ান দেন। তিনি জানান, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় ভারতে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র ১১ শতাংশ। বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে।

ভারতীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক উৎসবের উদাহরণ টেনে বিদেশ মন্ত্রকের সচিব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশ্য বলেন, “সম্প্রতি আমাদের দেশে যে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, তার ভোটদানের হার সকলের জানা দরকার। দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছেন। ভারতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে এখানেই।”

নয়াদিল্লির পক্ষে সাফ জানানো হয়েছে, কোনো রকম কর্তৃত্ববাদী শাসন ছাড়াই ভারত সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বজায় রেখে একদিকে যেমন বিশ্বের দ্রুততম অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে, তেমনই কোটি কোটি মানুষের দারিদ্র্য দূরীকরণ করছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও বহুত্ববাদের প্রতীক ভারতকে নিয়ে পশ্চিমী দুনিয়ার এই ধরনের মন্তব্য অনভিপ্রেত ও যুক্তিহীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.