প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকেও একাধিক যুগান্তকারী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার। এবার থেকে পশ্চিমবঙ্গে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হলো তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক দফতর এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের অধীনস্থ ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে দেওয়া সমস্ত সহায়তামূলক প্রকল্প। অর্থাৎ, ইমাম, মুয়াজ্জিন কিংবা পুরোহিতদের দেওয়া সরকারি ভাতা এবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ হতে চলেছে।
সোমবার নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে এই সিদ্ধান্তের কথা প্রথম জানিয়েছিলেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। এরপরই ক্যামাক স্ট্রিটের এক দলীয় সভায় এই স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে কড়া বার্তা দিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
“ভাতা নয়, আমাদের লক্ষ্য মেধা ও চাকরি” — ক্যামাক স্ট্রিটে মুখ্যমন্ত্রী
ক্যামাক স্ট্রিটের সভা থেকে তোষণের রাজনীতির তীব্র সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন:
“সরকারের কাজ কি ইমাম-মুয়াজ্জিন-পুরোহিতদের ভাতা দেওয়া? নাকি রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো করা? ইমাম-মুয়াজ্জিনদের স্রেফ ভাতা দেওয়া দরকার, নাকি তাঁদের সন্তানদের জন্য উপযুক্ত চাকরি দেওয়া প্রয়োজন? আজ রাজ্য মন্ত্রিসভা সব ধরনের ধর্মীয় ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তোষণের রাজনীতি আর চলবে না।”
উপাসনালয়ের লাউড স্পিকারের ব্যবহার নিয়েও এদিন কড়া বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের উপাসনালয়ের চৌহদ্দির মধ্যেই লাউড স্পিকারের আওয়াজ সীমাবদ্ধ রাখুন। ভোর চারটে থেকে কেন সাধারণ মানুষের অসুবিধা সৃষ্টি করা হবে?”
ভাতার বদলে এবার সর্বজনীন ‘বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ’
ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে রাজ্যের মেধাবী ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানোর বড় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, ধর্ম বা রাজনীতির ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা হবে না।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, যারা এতদিন ধর্মীয় ভাতা পাচ্ছিলেন, তাঁরা এখন থেকে মেধার ভিত্তিতে স্কলারশিপ পাবেন। যে সমস্ত মেধাবী পড়ুয়া অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, তারা আজ থেকেই ‘বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ’ পাবেন। তিনি বলেন, “পড়ুয়ারা হিন্দু, মুসলিম, শিখ কিংবা খ্রিষ্টান— যে কোনো ধর্মেরই হতে পারেন, তাতে কোনো সমস্যা হবে না। মেধাবান ছাত্রছাত্রীদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কিংবা আইনজীবী বানানোর জন্য ভারতীয় জনতা পার্টি প্রস্তুত।”
পার্ক সার্কাসের হাঙ্গামাকারীদের চরম হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর
সম্প্রতি কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা করে হাঙ্গামাকারীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র তথা পুলিশমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানান, বাংলায় গুন্ডাগিরির দিন শেষ।
পার্ক সার্কাসের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
“যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে, বাংলায় আর এসব হাঙ্গামা বরদাস্ত করা হবে না। এটাই শেষ। এরপর যদি কখনও এরকম ঘটনা ঘটে, তবে আমার থেকে খারাপ পুলিশমন্ত্রী আর কেউ হবে না। হাঙ্গামাকারীদের কাছে স্পষ্ট মেসেজ যাওয়া উচিত যে, এই সরকার শুধু দেখবে আর চুপ থাকবে— এমনটা আর হবে না।”
‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, কাশ্মীরের প্রসঙ্গ টেনে পুলিশের প্রশংসা
সোমবার কলকাতা পুলিশের দক্ষতার প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, পার্ক সার্কাসের ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে ইতিমধ্যেই ৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার (সিপি) নিজে এই গোটা ঘটনার তদারকি করছেন। পুলিশকে স্পষ্ট ভাষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
অতীতে কাশ্মীরে পাথর ছোড়ার ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কাশ্মীরে পাথর ছোড়া অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বাংলার কিছু মানুষেরও এমন অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে পুলিশের মধ্যেও একটা আতঙ্কের পরিবেশ ছিল। কিন্তু পুলিশ আর সেই আতঙ্কে নেই। পুলিশ যা করবে তা সম্পূর্ণ আইন অনুযায়ী করবে। পুলিশ আক্রান্ত হবে আর পুলিশমন্ত্রী এসি রুমে বসে দেখবে, সেই দিন চলে গিয়েছে।”

