আফ্রিকায় ফিরল ইবোলার আতঙ্ক: বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ স্ট্রেনে মৃত অন্তত ৮০, ভ্যাকসিন না থাকায় বিশ্বজুড়ে সতর্কতা জারী ‘হু’-এর

আফ্রিকায় ফিরল ইবোলার আতঙ্ক: বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ স্ট্রেনে মৃত অন্তত ৮০, ভ্যাকসিন না থাকায় বিশ্বজুড়ে সতর্কতা জারী ‘হু’-এর

করোনা মহামারির রেশ কাটতে না কাটতেই বিশ্বে নতুন করে মাথাচাড়া দিল মারণ ভাইরাস ইবোলা (Ebola)। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এবং উগান্ডায় নতুন করে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (Africa CDC) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র সাম্প্রতিক যৌথ রিপোর্ট অনুযায়ী, এই নতুন প্রাদুর্ভাবে ইতিমধ্যেই ৮০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ৩০০-র বেশি মানুষ এই মারণ রোগে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

এবারের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি অত্যন্ত বিরল ও মারাত্মক ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo) স্ট্রেনের কারণে ছড়াচ্ছে। বর্তমানে ইবোলার চিকিৎসায় বাজারে যে অত্যন্ত কার্যকর ভ্যাকসিনগুলি উপলব্ধ রয়েছে (যেমন— Ervebo), সেগুলি শুধুমাত্র ‘জায়ারে’ (Zaire) স্ট্রেনের বিরুদ্ধে কাজ করে। বুন্দিবুগিও স্ট্রেনের বিরুদ্ধে এই ভ্যাকসিন কোনো সুরক্ষা দেয় না এবং এর নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসাও এখনও বাজারে নেই। ফলে বিশ্ববাসীকে এখনই অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।


ইবোলা কী এবং ‘বুন্দিবুগিও’ স্ট্রেনের ইতিহাস

ইবোলা মূলত কয়েকটি ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়ায়, যার মধ্যে ইবোলা ভাইরাস, সুদান ভাইরাস এবং বুন্দিবুগিও ভাইরাস প্রধান। চিকিৎসকদের মতে, ইতিহাসে এর আগে মাত্র দু’বার এই বিরল বুন্দিবুগিও স্ট্রেনের দেখা মিলেছিল— প্রথমবার ২০০৭ সালে উগান্ডায় এবং দ্বিতীয়বার ২০১২ সালে কঙ্গোয়। দীর্ঘ ১৪ বছর পর আবার এই স্ট্রেন ফিরে আসায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘হু’। এই রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুর হার ২৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।


কীভাবে ছড়ায় এই মারণ রোগ?

সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক দূর করতে চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করেছেন যে, ইবোলা করোনাভাইরাস বা হামের মতো বায়ুবাহিত (Airborne) রোগ নয়। এটি সাধারণ সামাজিক মেলামেশা, হাওয়া বা মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায় না। ইবোলা ছড়ানোর মূল মাধ্যমগুলি হলো:

  • শারীরিক তরল: আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর শরীরের তরল পদার্থ (যেমন— রক্ত, লালা, বমি, মূত্র, বীর্য বা ঘাম)-এর সরাসরি সংস্পর্শে এলে।
  • দূষিত সামগ্রী: সংক্রমিত ব্যক্তির ব্যবহৃত সূচ, সিরিঞ্জ, বিছানার চাদর বা কাপড়ের ব্যবহার করলে।
  • মৃতদেহ স্পর্শ: ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্যের সময় মৃতদেহ সরাসরি স্পর্শ করলে।
  • বন্যপ্রাণী: সংক্রমিত বন্যপ্রাণী (যেমন— ফ্রুট ব্যাট বা বাদুড়, শিম্পাঞ্জি, বানর) শিকার বা তাদের কাঁচা মাংস খেলে।

রোগের লক্ষণসমূহ

ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানবদেহে মূলত নিম্নলিখিত উপসর্গগুলি দেখা দেয়: ১. হঠাৎ তীব্র জ্বর ও চরম ক্লান্তি। ২. পেশিতে ব্যথা, তীব্র মাথাব্যথা এবং গলা ব্যথা। ৩. রোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বমি, ডায়রিয়া এবং পেটে তীব্র ব্যথা। ৪. কিছু কিছু ক্ষেত্রে লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ নষ্ট হতে শুরু করে। ৫. চূড়ান্ত পর্যায়ে শরীরের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক অংশ থেকে মারাত্মক রক্তক্ষরণ (Rashes and Bleeding) শুরু হয়।


‘হু’ নির্দেশিত সুরক্ষাবিধি ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ

যেহেতু এই স্ট্রেনের কোনো প্রতিষেধক নেই, তাই সাধারণ সচেতনতা ও সতর্কতাই রোগ ছড়ানো রুখতে একমাত্র প্রধান হাতিয়ার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:

  • বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শ এড়ানো: মূলত বন্য বাদুড় বা বানর জাতীয় প্রাণী থেকে এই রোগ মানুষের শরীরে আসে। তাই জঙ্গল বা উপদ্রুত এলাকায় এই ধরনের বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। বন্যপ্রাণীর কাঁচা বা আধসেদ্ধ মাংস (Bushmeat) খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
  • আইসোলেশন ও পরিচ্ছন্নতা: ইবোলা আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন রোগীর থেকে সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। বাড়িতে কেউ অসুস্থ হলে তাঁকে দ্রুত আইসোলেশনে (Isolation) পাঠাতে হবে। সাবান ও জল দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন অথবা অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
  • পিপিই (PPE) ব্যবহার: স্বাস্থ্যকর্মী বা যাঁরা রোগীদের সেবা করছেন, তাঁদের অবশ্যই গ্লাভস, মাস্ক, গাউন এবং ফেস শিল্ডের মতো ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে।
  • মৃতদেহের সৎকার: ইবোলায় মৃত ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি অত্যন্ত বেশি থাকে। তাই প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সমস্ত সুরক্ষাবিধি মেনে মৃতদেহের সৎকার করতে হবে, কোনোভাবেই সাধারণ মানুষ যেন মৃতদেহ স্পর্শ না করেন।

আন্তর্জাতিক যাতায়াত ও নজরদারি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এখনই কোনো দেশ বা সীমান্তে যাতায়াত বা বাণিজ্যের ওপর সার্বিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। কারণ এতে আতঙ্ক ছড়ায় এবং মানুষ লুকিয়ে যাতায়াত শুরু করে, যা সংক্রমণ ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে আরও বিপজ্জনক। তবে কঙ্গো বা উগান্ডাগামী বা সেখান থেকে আসা আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্রিনিং ও বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই আন্তর্জাতিক জরুরি অবস্থা ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বজুড়ে নজরদারি বাড়ানো এবং আক্রান্ত আফ্রিকান দেশগুলিকে চিকিৎসা ও গবেষণায় আন্তর্জাতিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া। চিকিৎসকদের মতে, করোনা মহামারির তুলনায় ইবোলা অনেক দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব এবং কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং ও আইসোলেশনের মাধ্যমে এর বিস্তার রোধ করা সহজ। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই এই মারণ ভাইরাসের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.