ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার মনসুর আলি খান পটৌডী এবং খ্যাতনামা বলিউড অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের পুত্র সইফ আলি খান আজ বলিপাড়ায় শাহরুখ, সলমন ও আমিরের পাশাপাশি ‘চতুর্থ খান’ হিসেবে নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছেন। তবে তারকা সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর এই সাফল্যের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। নব্বইয়ের দশকে কেরিয়ারের চরম চড়াই-উতরাইয়ের সময়ে মায়ের একটি মাত্র মন্তব্যই সইফের চোখ খুলে দিয়েছিল এবং তাঁকে একজন প্রকৃত অভিনেতায় রূপান্তরিত হতে সাহায্য করেছিল।
১৯৯৩ সালে ‘পরম্পরা’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে সইফের। যদিও প্রথম ছবি মুক্তির আগেই অন্য একটি প্রজেক্ট থেকে বাদ পড়েছিলেন তিনি। এরপর নব্বইয়ের দশক জুড়ে বেশ কিছু হিন্দি ছবিতে কাজ করলেও একক নায়ক (সোলো হিরো) হিসেবে বক্স অফিসে তেমন কোনো বড় সাফল্য পাননি তিনি। এই সময়ে ‘ম্যায় খিলাড়ি তু আনাড়ি’, ‘ইয়ে দিললাগি’, ‘কাচ্চে ধাগে’, ‘হম সাথ সাথ হ্যায়’ এবং ‘কয়া কহেনা’র মতো জনপ্রিয় ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। ছবিগুলি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলেও অভিনেতা হিসেবে সইফ একক পরিচিতি বা পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে ব্যর্থ হন।
মায়ের মন্তব্য এবং কেরিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট
২০০০ সালের পর থেকে সইফের ঝুলিতে কিছু হিট ছবি আসতে শুরু করে। বিশেষ করে ২০০৪ সালে যশরাজ ফিল্মসের ব্যানারে মুক্তি পাওয়া ‘হম তুম’ ছবিটির মাধ্যমে তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘোরে। রানি মুখোপাধ্যায়ের বিপরীতে এই রোমান্টিক ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য সইফ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কারও লাভ করেন। এরপর ‘সালাম নমস্তে’, ‘রেস’, ‘লভ আজ কাল’ এবং ‘ককটেল’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।
তবুও ছেলের এই অভিনয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি খোদ মা শর্মিলা ঠাকুর। তিনি সইফকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “তোমাকে অভিনেতা হিসেবে তেমন গুরুত্বপূর্ণ বা গম্ভীর মনে হয় না।” মায়ের এই কড়া মূল্যায়ন সইফকে ভেতর থেকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
মায়ের সেই ভূমিকার কথা স্মরণ করে সইফ বলেন:
“আমি আগে মাকে বলতাম, আমি অমুক জায়গায় শুটিং করতে যাচ্ছি, দারুণ লোকেশন। তখন একদিন মা বলল— আমি সেই দিনটার অপেক্ষায় আছি, যেদিন তুমি এসে বলবে এই চরিত্রটা ফুটিয়ে তুলে আমার দারুণ লেগেছে। আসলে মাই আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। তারপর থেকেই আমি অভিনয় নিয়ে সত্যিকারের চিন্তাভাবনা শুরু করি।”
চরিত্র যাপন ও ‘ল্যাংড়া ত্যাগী’র ম্যাজিক
মায়ের পরামর্শ শোনার পর থেকেই সইফ নিজেকে ভাঙতে শুরু করেন এবং লোকেশনের চেয়ে চরিত্রের গভীরে ঢোকার ওপর বেশি জোর দেন। এর পরেই ২০০৬ সালে বিশাল ভরদ্বাজের ‘ওমকারা’ ছবিতে খলনায়ক ‘ল্যাংড়া ত্যাগী’র চরিত্রে অভিনয় করে সবাইকে চমকে দেন তিনি। সইফের কেরিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় হিসেবে গণ্য করা হয় এই চরিত্রটিকে।
পরবর্তী সময়ে ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মে ‘সেক্রেড গেমস’-এর মতো ওয়েব সিরিজে তাঁর অভিনয় অভিনেতা হিসেবে তাঁকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। আজ সইফ স্বীকার করেন, একজন তারকাসন্তানের ইমেজ ভেঙে আজ যে তিনি একজন শক্তিশালী চরিত্র অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তাঁর মা শর্মিলা ঠাকুরের সেই মূল্যবান বার্তারই।

