আরজি কর কাণ্ড: সিবিআইয়ের তদন্তকারী অফিসার সীমা পাহুয়াজাকেও কাঠগড়ায় তোলার দাবি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের

আরজি কর কাণ্ড: সিবিআইয়ের তদন্তকারী অফিসার সীমা পাহুয়াজাকেও কাঠগড়ায় তোলার দাবি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের

উন্নাও বা হাথরসের মতো দেশ কাঁপানো গণধর্ষণ মামলার তদন্তভার সামলেছেন যিনি, সেই রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত সিবিআই (CBI) অফিসার সীমা পাহুয়াজার ভূমিকা নিয়েই এবার গুরুতর প্রশ্ন উঠে গেল আরজি কর কাণ্ডে। অতীতে যাঁর ক্ষুরধার তদন্তের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল দেশের আমলাতন্ত্র, এবার আরজি করের ঘটনার তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে তাঁকেই তদন্তের আওতায় আনার দাবি তুললেন বিজেপি সাংসদ তথা কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।

২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমে কলকাতা পুলিশ তদন্ত শুরু করে সঞ্জয় রায় নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্বভার যায় সিবিআই-এর হাতে। কেন্দ্রীয় সংস্থা এই মামলার তদন্তভার দেওয়ার জন্য বেছে নেয় তাদের অন্যতম সাহসী ও নির্ভীক অফিসার হিসেবে পরিচিত সীমা পাহুয়াজাকে। তবে সিবিআই দায়িত্ব নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এই ধর্ষণ ও খুনের মামলায় নতুন করে কাউকে গ্রেফতার করতে না পারায় খোদ নির্যাতিতার মা-বাবাই তদন্তের গতিপ্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এমনকি, শিয়ালদহ আদালত চত্বরে নির্যাতিতার বাবার ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয়েছিল তদন্তকারী অফিসার সীমাকে।


রাজ্য রাজনীতিতে বদল ও অভিজিতের বিস্ফোরক দাবি

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়েছে। রাজ্যে এখন বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠিত। আরজি করের নির্যাতিতার মা পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে লড়াই করে বর্তমানে জয়ী বিধায়ক। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরই শুভেন্দু অধিকারী আরজি কর কাণ্ডের ফাইল পুনরায় খোলার ঘোষণা করেছেন এবং কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে কলকাতা পুলিশের তৎকালীন তিন শীর্ষ আইপিএস কর্তাকে সাসপেন্ডও করেছেন।

এই আবহে শনিবার সিবিআই অফিসার সীমার ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত বিস্ফোরক দাবি করেন বিজেপি সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান:

“আরজি কর মামলায় সঠিক তথ্যপ্রমাণ তুলে আনার পরিবর্তে প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে সিবিআই-এর তদন্তকারী অফিসার সীমা পাহুয়াজাকেই এবার অভিযুক্ত হিসেবে তদন্তের আওতায় আনা উচিত।”


সীমার অতীত সাফল্য ও কর্মজীবন

আরজি কর মামলা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হলেও সীমা পাহুয়াজার অতীত কর্মজীবন অত্যন্ত উজ্জ্বল ও সাফল্যমণ্ডিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু খতিয়ান:

  • ঐতিহাসিক মামলার তদন্ত: উত্তরপ্রদেশের উন্নাও এবং হাথরসের গণধর্ষণ মামলা ছাড়াও হিমাচল প্রদেশের বহুল আলোচিত কোঠারি ধর্ষণ মামলার তদন্তে মূল দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
  • ভোট-পরবর্তী হিংসার তদন্ত: একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে হওয়া ভোট-পরবর্তী হিংসার ঘটনা খতিয়ে দেখতে সিবিআই যে বিশেষ দল গঠন করেছিল, সীমা ছিলেন তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
  • পদোন্নতি ও পোস্টিং: ১৯৮৮ সালে সিবিআইতে যোগ দেন সীমা। ২০১৩ সালে তিনি ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্ট (DSP) এবং ২০২২ সালে অ্যাডিশনাল সুপারিন্টেনডেন্ট অফ পুলিশ (ASP) পদে উন্নীত হন। একসময় গাজ়িয়াবাদের অ্যান্টি কোরাপশন ব্যুরোতেও কর্মরত ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি দিল্লির স্পেশ্যাল ক্রাইম বিভাগে যুক্ত রয়েছেন।
  • রাষ্ট্রীয় সম্মান: কর্মক্ষেত্রে সততা ও সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালের ১৫ অগস্ট ‘পুলিশ মেডেল’ এবং ২০২১ সালে দেশের সর্বোচ্চ ‘রাষ্ট্রপতি পদক’-এ ভূষিত হন সীমা পাহুয়াজা।

অতীতে একাধিক জটিল মামলার জট খোলা এই দুঁদে সিবিআই আধিকারিককে ঘিরেই এখন নতুন সরকারের অন্দরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আরজি করের তদন্তে সীমার ভূমিকা নিয়ে প্রাক্তন বিচারপতির এই দাবি কেন্দ্রীয় এজেন্সির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.