নববর্ষের আবহে ভোট-মহড়া: ‘মাছে-ভাতে’ বাঙালিয়ানা বনাম ‘সাংস্কৃতিক সংহতি’, তুঙ্গে তৃণমূল-বিজেপি তরজা

নববর্ষের আবহে ভোট-মহড়া: ‘মাছে-ভাতে’ বাঙালিয়ানা বনাম ‘সাংস্কৃতিক সংহতি’, তুঙ্গে তৃণমূল-বিজেপি তরজা

পয়লা বৈশাখের পুণ্যলগ্নে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র এক অভিনব ‘বাঙালিয়ানা’র যুদ্ধে রূপ নিল। নববর্ষের উৎসবকে হাতিয়ার করে লোকসভা ভোটের প্রচারে কেউ নামলেন ডালায় রুই মাছ সাজিয়ে, কেউ বা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরে মেলালেন পা। একদিকে তৃণমূলের দাবি— বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস কেড়ে নেবে, অন্যদিকে বিজেপির পালটা যুক্তি— তারা বাঙালির আত্মমর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই লড়ছে।

মমতার শুভেচ্ছা ও মোদীর ‘খোলা চিঠি’

নববর্ষের সকালেই ভিডিও বার্তায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রীতি ও সংহতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, “বাংলা সংস্কৃতির পীঠস্থান। আসুন শান্তি ও সংস্কৃতির বার্তা দিয়ে আমরা নতুন ভোর নিয়ে আসি।” পালটা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছার পাশাপাশি রাজ্যবাসীকে একটি ‘খোলা চিঠি’ দিয়েছেন। সেখানে তিনি বিগত ১৫ বছরের ‘অপশাসন’ ও ‘দুর্নীতি’র প্রসঙ্গ টেনে দাবি করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার আজ চরম সংকটে।

‘মাছ-রাজনীতি’ ও অরূপ বিশ্বাসের ‘দাওয়াই’

টালিগঞ্জের প্রার্থী তথা রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস নববর্ষের সকালে এক অভিনব পদযাত্রা করেন। পরনে বাঙালি পোশাক এবং হাতে ডালা ভর্তি বিশাল রুই মাছ। তাঁর অভিযোগ, “বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে মাছ খাওয়া বন্ধ করা হচ্ছে। বিজেপি এ রাজ্যে এলে বাঙালির মাছ-ভাত কেড়ে নেবে।”

এই অভিযোগের পালটা দিতে দেরি করেনি বিজেপি। প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি বিদ্রুপের সুরে বলেন, “ইলিশ মাছ নিয়ে আসুন, আমি নিজে বেছে খাইয়ে দিচ্ছি।” রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের দাবি, “আমি নিজে মাছ ছাড়া ভাত খেতে পারি না। তৃণমূল আসলে ইস্যুহীন হয়ে এসব অবান্তর কথা বলছে।” পালটা জবাব দিতে কলকাতা বন্দরের বিজেপি প্রার্থী রাকেশ সিংহ ও ব্যারাকপুরের কৌস্তভ বাগচিও ধুতি-পাঞ্জাবি পরে হাতে মাছ নিয়ে মিছিলে শামিল হন।

শুভেন্দুর শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক প্রচার

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ভবানীপুরে ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’র আয়োজন করেন। দলীয় পতাকার বদলে সেখানে মণীষীদের ছবি এবং দলীয় স্লোগানের বদলে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। সন্ধ্যায় হাজরায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কেষ্টপুরে তরুণজ্যোতি তিওয়ারির আয়োজনে বাংলা ব্যান্ডের জলসাও নজর কেড়েছে।

জেলা ও গ্রামবাংলার চিত্র

কলকাতার পাশাপাশি জেলাগুলিতেও বাঙালিয়ানার এই লড়াই ছড়িয়ে পড়ে। শিলিগুড়িতে বিজেপি প্রার্থী শঙ্কর ঘোষের নেতৃত্বে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের হয়, যেখানে কুলো, শঙ্খ ও মঙ্গলঘটের প্রাধান্য ছিল। অন্যদিকে উলুবেড়িয়ায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও আসানসোলে মলয় ঘটকরা তৃণমূলের হয়ে শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তীর দাবি, “আমরা সারা বছরই বাঙালির অধিকারের জন্য লড়ি। বিজেপি জোর করে বাঙালি সাজার চেষ্টা করছে।”

বামেদের কটাক্ষ

তৃণমূল ও বিজেপির এই ‘মাছ-রাজনীতি’ ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাকে তীব্র সমালোচনা করেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তাঁর কটাক্ষ, “রাজ্যের হাল খারাপ করে দিয়ে এখন দুই দল মাছ হাতে রাস্তায় নেমে বাঙালি সাজছে। কী মাছ জিজ্ঞাসা করলেই ওরা উল্টো দিকে ছুটবে।”

ভোটের আবহে উৎসবের আঙিনাকে যেভাবে দুই প্রধান প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত করল, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও চলছে জোর চর্চা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.