বিরোধীদের প্রবল সমালোচনা ও ‘গণতন্ত্র ছিনতাই’-এর অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকেই মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করতে মরিয়া নরেন্দ্র মোদী সরকার। এই লক্ষ্য পূরণে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে সংসদের তিন দিনের বিশেষ অধিবেশন। এই অধিবেশনে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বা ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিলের পাশাপাশি লোকসভার আসন সংখ্যা একলাফে ৮৫০-এ উন্নীত করার প্রস্তাবিত বিলটিও পেশ করা হতে চলেছে।
তিনটি বিল ও আসন পুনর্বিন্যাসের রূপরেখা
সাংসদদের কাছে পাঠানো বিলের খসড়া অনুযায়ী, সরকার মোট তিনটি বিল আনতে চলেছে: ১. ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল: মহিলা সংরক্ষণের আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে। ২. আসন পুনর্বিন্যাস বিল: লোকসভার বর্তমান ৫৪৩টি আসন বাড়িয়ে ৮৫০ করার প্রস্তাব। ৩. কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল।
রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে লোকসভার আসন সংখ্যা ৮৫০ হবে, যার এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ২৮৩টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
সাংবিধানিক ধারা ও সংশোধনীর জটিলতা
বর্তমানে সংবিধানের ৮১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী লোকসভার সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা ৫৫২ হতে পারে। প্রস্তাবিত আসন বৃদ্ধি কার্যকর করতে হলে এই ধারার পরিবর্তন আবশ্যক। এছাড়া সংবিধানের ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাধারণত জনগণনার রিপোর্ট প্রকাশের পরই সীমানা পুনর্বিন্যাস (Delimitation) শুরু করা যায়। কিন্তু মোদী সরকার নতুন জনগণনার রিপোর্ট আসার আগেই এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ৮২ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব এনেছে।
‘গণতন্ত্র ছিনতাই’-এর অভিযোগে সরব বিরোধীরা
কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক পরিকল্পনা’ বলে অভিহিত করেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “বিজেপি নিজেদের সুবিধামতো লোকসভা আসনগুলি সাজিয়ে নিতে চাইছে। প্রস্তাবিত বিলগুলি সীমানা পুনর্বিন্যাসের সাংবিধানিক সুরক্ষা কবচ সরিয়ে দিচ্ছে, ফলে সমস্ত ক্ষমতা চলে যাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ডিলিমিটেশন কমিশনের হাতে।”
কংগ্রেস সাধারণ সম্পাদক কেসি বেণুগোপাল এই বিলকে ‘ভয়ঙ্কর’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “এটি গণতন্ত্রকে সংকটে ফেলবে। ২০২৩ সালেই মহিলা সংরক্ষণ বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছিল। এখন আসন পুনর্বিন্যাসের শর্ত জুড়ে দিয়ে আদতে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিকৃত করার চেষ্টা চলছে।” বিরোধীদের দাবি, বর্তমান ৫৪৩টি আসনের মধ্যেই ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ কার্যকর করা হোক।
বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র রণকৌশল
সংসদের বিশেষ অধিবেশনের প্রাক্কালে বুধবার দিল্লিতে বৈঠকে বসে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে ও রাহুল গান্ধীর উপস্থিতিতে আয়োজিত এই বৈঠকে তৃণমূল কংগ্রেসের সাগরিকা ঘোষ, আরজেডি-র তেজস্বী যাদব, এনসিপি-র সুপ্রিয়া সুলে, শিবসেনার (ইউবিটি) সঞ্জয় রাউত সহ ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি ও বাম দলগুলির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। যৌথভাবে এই বিলের বিরোধিতা করার কৌশল স্থির করেছে বিরোধী শিবির।
২০২৩ সালের মূল বিলে বলা হয়েছিল, নতুন জনগণনার পরই সংরক্ষণ কার্যকর হবে। কিন্তু সেই শর্ত এড়িয়ে তড়িঘড়ি আসন বাড়ানোর এই সরকারি উদ্যোগ সংসদীয় রাজনীতিতে এক নয়া সংঘাতের জন্ম দিয়েছে।

