রামমোহন, বিদ্যাসাগরের আঁকা নারী প্রগতির বৃত্তটি সম্পূর্ণ করতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদীজি।

রামমোহন, বিদ্যাসাগরের আঁকা নারী প্রগতির বৃত্তটি সম্পূর্ণ করতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদীজি।

রাজা রামমোহন রায় সর্বপ্রথম এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে নারী শক্তির প্রসার নিয়ে সোচ্চার হন। তথাকথিত সমাজের বিভিন্ন নিয়ম নীতির বিরুদ্ধে তিনি সমালোচনা করেন এবং ভারতবর্ষে নারী শিক্ষার (Women’s Education in India) প্রভূত বিস্তার সাধন করেন।
বিদ্যাসাগর (১৮৫৫) গভীর ক্ষোভে বলেছিলেন, ‘যে দেশের পুরুষজাতির দয়া নাই, ধর্ম নাই, ন্যায-অন্যায় বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদসদ্বিবেচনা নাই, আর যেন সে দেশে হতভাগা অবলাজাতি জন্মগ্রহণ না করে’; তিনি আর্তনাদ করেছিলেন, “হা অবলাগাণ! তোমরা কি পাপে, ভারতবর্ষে আসিয়া, জন্মগ্রহণ কর, বলিতে পারি ন!’ নারীর জন্যে নিষ্ঠুরতম ভূভাগের নাম ভারতবর্ষ, নিষ্ঠুরতম ব্যবস্থার নাম হিন্দু পিতৃতন্ত্র।

নারী সবচেয়ে পীড়িত ছিলো ভারতে, তাই এখানেই প্রথম দেখা দেন নারীত্ৰাতারা; রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর। রামমোহন নারীকে বঁচিয়ে রাখার জন্যে সহমরণ বিষয় প্রবর্তক ও নিবাৰ্ত্তকের প্রথম প্রস্তাব প্রকাশ করেন ১৮১৭ তে, দ্বিতীয় প্রস্তাব ১৮১৯-এ; এ-বিষযে তার শেষ লেখা “সহমরণ” বেরোয় ১৮২৯-এ। বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ প্ৰচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক- প্ৰথম প্রস্তাব প্রকাশ করেন। ১৮৫৫তে, এবং একই বছর প্রকাশ করেন দ্বিতীয় প্রস্তাব। পৃথিবীর আর কোথাও তাদের, অন্তত রামমোহনের, আগে নারীর পক্ষে কোনো পুরুষ কিছু লেখে নি, লড়াইয়ে নামে নি। বিলেতে নারীর পক্ষে প্রথম যে-পুরুষ বই লেখেন, তিনি দার্শনিক উইলিয়াম টমসন। তাঁর বই আর তিনি হন উপহাসের পাত্র। পশ্চিমে নারীর পক্ষে পুরুষের লেখা প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বই জন স্টুয়ার্ট মিলের নারী-অধীনতা বেরোয় ১৮৬৯-এ। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর পৃথিবীর দুই আদি নারীবাদী পুরুষ, মহাপুরুষ। তাঁরা কর্মবীর হিশেবেও অসামান্য; তারা বই লিখেই থেমে যান নি, যাওয়ার উপায় ছিলো না; তারা আইন প্রণয়ন করিয়ে বাস্তবায়িত করেছিলেন নিজেদের স্বপ্ন। পৃথিবীর নারীবাদের ইতিহাসে রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের নাম স্বর্ণলিপিতে লেখা থাকার কথা।
১৮৭৮ সালে প্রথম বিদেশ যাত্রায় বিলিতি সমাজ ব্যবস্থায় স্ত্রী-স্বাধীনতা দেখে রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর নারীমুক্তি আন্দোলন নিয়ে পরে অনেক রচনা নাড়া দিয়েছিলো সমাজটাকে ।‘স্ত্রীর পত্র’, ‘বোষ্টমী’ কিংবা ‘হৈমন্তী’ গল্পগুলি তখনকার বাংলার গতানুগতিক সমাজচেতনার মূলে এক ধরনের কুঠারাঘাত ছিল। অন্য দিকে ‘চতুরঙ্গ’, ‘ঘরে-বাইরে’উপন্যাসগুলির মধ্যে আমরা প্রচলিত সমাজজীবনের জীর্ণ পুরনো সংস্কারকে উপেক্ষা করার একটা পথনির্দেশ পাই। কবির কথায় নারীর স্বভাবের মধ্যে রয়েছে সংসারকে শান্তি ও আনন্দ দেবার এক সহজাত প্রবৃত্তি। তাঁদের স্বভাবের এই রূপটিকে শিক্ষার দ্বারা উদ্ভাসিত করা, সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। তিনি চেয়েছিলেন, ‘… তাঁদের রক্ষণশীল মন থেকে তাঁরা যেন মুক্ত করেন হৃদয়কে, উজ্জ্বল করেন বুদ্ধিকে, নিষ্ঠা প্রয়োগ করেন জ্ঞানের তপস্যায়।’

ভারতে মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মহিলা। দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থেকে শিল্পোদ্যোগ, খেলাধুলো থেকে সশস্ত্র বাহিনী, কিংবা সঙ্গীত ও শিল্পকলা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই মহিলারা সামনের সারিতে রয়েছেন। তাই শিক্ষায় সুযোগ বাড়িয়ে, স্বাস্থ্যের মানোন্নয়ন করে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি এবং মৌলিক সুযোগ-সুবিধাগুলি আরও বেশি করে তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
কিন্তু, বিশ্ব রাজনীতি অথবা বিভিন্ন সংসদীয় প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের উপস্থিতি যথাযথ নয়। প্রশাসনিক কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভাবনা-চিন্তাকে কাজে লাগাতে পারেন না। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। অথচ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের যথাযথ ভূমিকা নিশ্চিত করতে আগের সরকারগুলি একাধিক কমিটি তৈরি করে বিলের খসড়া উপস্থাপিত করলেও কোনওটাই বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে সংসদে “নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম” পাশ করা হয়। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মহিলাদের সংরক্ষণের এই সুযোগটি সংবিধানের মূল ভাবনার সঙ্গে একসূত্রে গ্রথিত। সংবিধান প্রণেতারা এমন এক সমাজের কথা ভেবেছিলেন, যেখানে সাম্য সুনিশ্চিত হয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে মহিলাদের অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করা, তাঁদের এই স্বপ্ন পূরণের দিকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই উদ্যোগকে আর বিলম্বিত করে মহিলাদের অংশগ্রহণকে কার্যকর করতে দেরি করলে আমাদের গণতন্ত্রর সমান অধিকারের চিন্তাকে পিছিয়ে দেবে। ইতিমধ্যেই সংসদীয় প্রতিষ্ঠান গুলিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়টিতে আলোচনার মাধ্যমে সকলেই একমত হয়েছেন। মনে রাখতে হবে, আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের চাহিদাও এখানে রয়েছে। তাঁদের এই দীর্ঘদিনের চাহিদাকে স্বীকৃতি দিলে দেশের উন্নয়নের গতি সুস্থায়ী হবে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ডাক দিয়েছেন – “আসুন, আমরা নারীশক্তির ক্ষমতায়ন করি।”

আগামী 16 এপ্রিল সংসদে বিশেষ অধিবেশনে ‘নারী সংরক্ষণ বিল’ উত্থাপিত হবে ৷ এই বিষয়ের গুরুত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লিখছেন যে নারী সংরক্ষণ বিলের ইতিহাস দীর্ঘ এবং জটিল। প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁর নিবন্ধে স্বীকার করেছেন, দশকের পর দশক ধরে আগের সরকারগুলো বারবার এই বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে — কমিটি গঠন করা হয়েছে, বিলের খসড়া তৈরি হয়েছে — কিন্তু কার্যকর পরিণতি কখনো আসেনি। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে “নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম” (Constitution’s 106th Amendment Act) পাস হয় — যা লোকসভা ও রাজ্যের বিধানসভাগুলোতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিধান করে।

আগামী ১৬ এপ্রিল থেকে একটি বিশেষ তিন দিনের সংসদ অধিবেশন ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি — এবং সেই অধিবেশনের একমাত্র আইনি লক্ষ্য হলো নারী সংরক্ষণ বিল সংশোধন করে ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগেই তা কার্যকর করা। মোদি বলেন, আইনসভায় মহিলাদের সংরক্ষণ এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি এবং এতে কোনো দেরি হলে তা হবে “অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক”।
মোদিজি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে যেন নারী সংরক্ষণ কার্যকর অবস্থায় থাকে, সেটি নিশ্চিত করা এখন সরকারের অগ্রাধিকার। নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম: আইন পাস হয়েছে, কিন্তু কার্যকর হয়নি।
১৬ থেকে ১৮ এপ্রিলের বিশেষ তিন দিনের সংসদ অধিবেশনে এই বিল পাস করানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই সংশোধনীতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব আছে।

প্রথমত, লোকসভার আসন সংখ্যা বর্তমান ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ করা হবে, যার মধ্যে ২৭৩টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে — মোট আসনের প্রায় ৩৩ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, ২০২৭ সালের জনগণনার পরিবর্তে ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকার পুনর্বিভাজন করা হবে, যাতে ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগেই এই সংরক্ষণ কার্যকর করা সম্ভব হয়। New Indian Express-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্যের বিধানসভাগুলোতেও একই অনুপাতে মহিলা আসন সংরক্ষণ করা হবে। এই সংশোধিত আইন ২০২৯ সালের ৩১ মার্চ থেকে কার্যকর হবে বলে জানা গেছে।
মোদির নিবন্ধে বার্তা: “সমাজ তখনই এগোয় যখন নারী এগোয়”
৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী মোদিজী বলেছেন, “ভারতের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মহিলা এবং জাতির উন্নয়নে তাঁদের অবদান অপরিসীম ও অমূল্য।”তিনি আরও বলেন,” আইনসভায় মহিলাদের সংরক্ষণ কোটি কোটি ভারতীয় নারীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং এই মূলনীতিরই স্বীকৃতি যে সমাজ তখনই এগিয়ে যায়, যখন নারী এগিয়ে যায়।” বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, উদ্যোগ, ক্রীড়া, সশস্ত্র বাহিনী, সংগীত ও শিল্পকলা — সব ক্ষেত্রেই নারীদের অগ্রণী ভূমিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যখন মহিলারা প্রশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তখন তাঁরা এমন অভিজ্ঞতা ও অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে আসেন যা সরকারি আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে এবং শাসনের মান উন্নত করে।”
এই বিল এমন এক নীতির স্বীকৃতি, যা দীর্ঘকাল ধরে আমাদের সভ্যতার আদর্শকে পথ দেখিয়ে এসেছে— সেই আদর্শ- নারীর অগ্রগতিতেই সমাজের অগ্রগতি সাধিত হয় ৷

আসুন, আমরা ভারতের আপামর জনসাধারণ গ্রামে গঞ্জে, শহর থেকে শহরতলীতে নারী মুক্তির সোপান হিসেবে এই মহিলা সংরক্ষণ বিলের সমর্থনে একে অন্যকে জাগরিত করি।

লেখক : সৌমিত্র সেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.