চেন্নাইয়িন এফসি-র বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে নামার আগে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের প্রধান চিন্তা ছিল গোল করার লোকের অভাব। ম্যাচ শেষে সেই আশঙ্কাই সত্যি বলে মনে হল। লিগ তালিকায় নীচের দিকে থাকা চেন্নাইয়িনের বিরুদ্ধে গোলের জন্য ৮৫ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল সবুজ-মেরুনকে। শেষ পর্যন্ত মনবীর সিংহের গোলে কোনও মতে তিন পয়েন্ট এল মোহনবাগানের ঘরে। কিন্তু জয় পেলেও দলের আক্রমণভাগের দুর্বলতা এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।
যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে নতুন জার্সি পরে খেলতে নেমেছিল মোহনবাগান। কিন্তু নতুন জার্সিতে খেলার ধরনে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। বরং একের পর এক গোলের সুযোগ নষ্ট করে সমর্থকদের হতাশ করল দল। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ছন্দ হারালেন ফুটবলারেরা। অন্য দিকে, গোলকিপার বিশাল কাইথ কয়েকটি নিশ্চিত গোল না বাঁচালে মোহনবাগানের তিন পয়েন্ট পাওয়া কঠিন হত। ম্যাচের শেষ দিকে নিকোলা স্টোজানোভিচের শট বারে লেগে ফিরে আসে। সেটি গোলে ঢুকলে চেন্নাইয়িনই ম্যাচের ফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে যেতে পারত।
একের পর এক সুযোগ নষ্ট মোহনবাগানের
ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামার আগেই একাধিক সমস্যায় ছিলেন মোহনবাগানের কোচ পানাজিয়োটিস দিমপেরিস। চোট ও অসুস্থতার কারণে দলে ছিলেন না মিগুয়েল ফিগুয়েরা এবং আপুইয়া। জেমি ম্যাকলারেনও খেলতে পারেননি। ফলে আক্রমণভাগে কে গোল করবেন, তা নিয়ে সংশয় ছিলই। ম্যাচে সেই সমস্যাই প্রকট হয়ে উঠল।
শুরু থেকেই গোলের সুযোগ পেয়েছিল মোহনবাগান। ১০ মিনিটে আলবের্তো রদ্রিগেজ়ের সামনে গোল করার সুযোগ এলেও তিনি তা কাজে লাগাতে পারেননি। এর পর সুযোগ নষ্ট করেন দেজান দ্রাজিচ। লি আরউইনের শট বাঁচিয়ে দেন চেন্নাইয়িনের গোলকিপার মহম্মদ নওয়াজ। ফিরতি বল থেকেও গোল করতে পারেননি মনবীর।
অন্য দিকে, চেন্নাইয়িনের আক্রমণ ছিল যথেষ্ট ধারালো। প্রথমার্ধে একাধিক বার মোহনবাগানের রক্ষণকে চাপে ফেলে তারা। গোলকিপার বিশালের দক্ষতায় বার বার রক্ষা পায় সবুজ-মেরুন। ক্লিফোর্ড মিরান্ডার দলের ফুটবলারেরাও একের পর এক সুযোগ নষ্ট করেন। প্রথমার্ধে গোল না পাওয়াটা চেন্নাইয়িনের কাছে দুর্ভাগ্যেরই বলা যায়।
বদলেই ছন্দে ফিরল সবুজ-মেরুন
দ্বিতীয়ার্ধেও মাঝমাঠে দাপট বজায় রাখে চেন্নাইয়িন। মাদিহ তালাল এবং স্টোজানোভিচের জুটি মোহনবাগানকে যথেষ্ট চাপে রেখেছিল। তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরি হচ্ছিল বার বার।
এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনেন মোহনবাগানের কোচ দিমপেরিস। প্রথমার্ধে কার্যত নিজেদের অর্ধেই সীমাবদ্ধ থাকা লালিয়ানজুয়ালা ছাংতের পরিবর্তে নামানো হয় সাহাল সামাদকে। সামির জেলকোভিচের জায়গায় মাঠে নামেন অনিরুদ্ধ থাপা। এই দুই পরিবর্তনের পর মাঝমাঠে কিছুটা সংগঠিত দেখায় মোহনবাগানকে। আক্রমণেও গতি বাড়ে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, সাহাল ও থাপাকে শুরু থেকেই খেলানো হল না কেন? তাঁদের মাঠে নামার পর দলের খেলায় যে পরিবর্তন দেখা গেল, তা প্রথম থেকেই প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন সমর্থকদের একাংশ।
গ্যালারিতে বসে ম্যাচ দেখছিলেন মোহনবাগানের প্রাক্তন তারকা জোসে রামিরেজ ব্যারেটো। আরউইন, জেলকোভিচদের একের পর এক গোলের সুযোগ নষ্ট করতে দেখে হতাশ হয়ে পড়েন তিনিও। সম্প্রচারের ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাঁর হতাশ মুখ। গোলের সামনে মোহনবাগানের এই ব্যর্থতা দেখে মনে হচ্ছিল, মাঠে নামলে হয়তো ব্যারেটো নিজেই সুযোগগুলি কাজে লাগাতে পারতেন।
৮৫ মিনিটে মনবীরের গোলে স্বস্তি
শেষ পর্যন্ত ৮৫ মিনিটে আসে বহু প্রতীক্ষিত গোল। বাঁ প্রান্ত ধরে আক্রমণে উঠেছিলেন লিস্টন কোলাসো। তাঁর গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে পৌঁছে যান মনবীর সিংহ। চেন্নাইয়িনের গোলকিপার নওয়াজের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন পঞ্জাবি স্ট্রাইকার।
গোল পাওয়ার পরেও চেন্নাইয়িনের আক্রমণের ঝাঁঝ কমেনি। শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায় তারা। স্টোজানোভিচের শট বারে লেগে ফিরে আসায় অল্পের জন্য সমতা ফেরানো হয়নি চেন্নাইয়িনের। শেষ পর্যন্ত ওই এক গোলের ব্যবধানেই জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে মোহনবাগান।
তারকাখচিত দলেও বোঝাপড়ার অভাব
মোহনবাগানের দলে দেশের একাধিক সেরা ফুটবলার রয়েছেন। তা সত্ত্বেও রাহুল ভেকে, মেহতাব সিংহ এবং ছাংতেদের মধ্যে এখনও প্রয়োজনীয় বোঝাপড়া তৈরি হয়নি বলে মনে হচ্ছে। মাঠে কে কোন ভূমিকা পালন করবেন, কোন পরিস্থিতিতে কী ভাবে আক্রমণ গড়ে তুলবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
কোচ দিমপেরিসের কৌশল এবং ফুটবলারদের প্রতি তাঁর নির্দেশ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই মোহনবাগানের দুর্বলতাগুলি সামনে চলে আসছে। চেন্নাইয়িনের মতো দলের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে জয় এলেও পারফরম্যান্সে সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ কম।
মনবীরের শেষ মুহূর্তের গোলে তিন পয়েন্ট পেল মোহনবাগান। কিন্তু গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে না পারা, মাঝমাঠের দুর্বলতা এবং রক্ষণে বোঝাপড়ার অভাব দূর করতে না পারলে আগামী দিনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে দল। বড় লিগের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত মোহনবাগান কতটা ধারাবাহিক থাকতে পারবে, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

