চোরবাগান কাণ্ডে মণ্ডপশিল্পীকে তলব লালবাজারের, তদন্তে একাধিক প্রশ্নের মুখে সিট

চোরবাগান কাণ্ডে মণ্ডপশিল্পীকে তলব লালবাজারের, তদন্তে একাধিক প্রশ্নের মুখে সিট

চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় এ বার মণ্ডপশিল্পী সুশান্ত শিবানী পালকে তলব করল লালবাজার। বুধবারের মধ্যে তাঁকে হাজিরা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মণ্ডপ নির্মাণের পরিকল্পনা, দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রে খবর, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর বয়ানও নথিভুক্ত করা হবে।

চোরবাগান কাণ্ডে ঠিক কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছিল, কোথায় গাফিলতি ছিল এবং ১৯ জনের মৃত্যুর জন্য কারা দায়ী, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পাশাপাশি, রাজ্য সরকারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট-ও তদন্তের প্রস্তুতি শুরু করেছে। সোমবার মহাকরণে সিটের প্রথম বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে কমিটির প্রধান তথা কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী জানান, আগামী ৩১ অক্টোবর, শনিবার থেকে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু হবে।

মণ্ডপশিল্পীর কাছে একাধিক প্রশ্ন

চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপটি তৈরি হয়েছিল শিল্পী সুশান্ত শিবানী পালের পরিকল্পনায়। মণ্ডপ নির্মাণের সময় দর্শনার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা কেমন ছিল, প্রবেশপথ কতটা প্রশস্ত ছিল এবং ভিড় সামলানোর জন্য কী ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সেই সমস্ত বিষয় তদন্তকারীদের প্রশ্নের তালিকায় রয়েছে।

দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে সুশান্ত জানিয়েছিলেন, ঘটনার আগের রাত পর্যন্ত তিনি মণ্ডপেই ছিলেন। কী ভাবে এমন দুর্ঘটনা ঘটল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না বলেও জানিয়েছিলেন শিল্পী। মণ্ডপে আলো কম রাখা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। শিল্পীর দাবি ছিল, কলকাতা পুলিশের পদস্থ কর্তাদের নির্দেশ মেনেই মণ্ডপে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, বৃষ্টির কারণেই পরিস্থিতি এমন হয়েছিল।

তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বৃষ্টি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে, কিন্তু এর পিছনে মানবিক ভুল বা ‘হিউম্যান এরর’ ছিল। সেই দায় কেউ এড়াতে পারবেন না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

৩২টি সিসি ক্যামেরার মধ্যে ১৬টির ফুটেজ অধরা

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে প্রত্যক্ষদর্শী এবং আহতদের অভিজ্ঞতা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তাঁদের বাড়িতে গিয়ে বয়ান নথিভুক্ত করা হচ্ছে। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে দুর্ঘটনার সময়কার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। কিন্তু খবর, মণ্ডপ ও তার আশপাশে মোট ৩২টি ক্যামেরা থাকলেও ১৬টির ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

কোন পরিস্থিতিতে প্রথম ভিড়ের চাপ তৈরি হয়েছিল, কী ভাবে আতঙ্ক ছড়াল এবং পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা কী ভাবে ঘটল, তা জানতে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় ন’জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন দুই ঘোষক সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু এবং কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়া। অভিযোগ, ভিড়ের মধ্যে ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে ঘোষণা করার পরেই হুড়োহুড়ি শুরু হয়। কুশলের দাবি, সপ্তমীর সন্ধ্যায় পুলিশের এক ব্যক্তির কথাতেই তিনি ওই ঘোষণা করেছিলেন। তবে ওই ব্যক্তির নাম জানাতে পারেননি তিনি। কী পরিস্থিতিতে এমন ঘোষণা করেছিলেন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন কুশল। এ বার তাঁর বক্তব্যের সত্যতা খতিয়ে দেখবে সিট।

চোরবাগান কাণ্ডে সিটের তদন্ত শুরু

সোমবার মহাকরণে সিটের প্রথম বৈঠকে চোরবাগান পুজো কমিটির কয়েক জন কর্মকর্তাকে ডাকা হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন কলকাতা পুলিশের একাধিক শীর্ষস্থানীয় আধিকারিকও। বৈঠকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ, মণ্ডপে প্রবেশের পথের প্রশস্ততা এবং দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।

প্রাথমিক ভাবে রাজ্য সরকার এই ঘটনার অনুসন্ধানে একটি বিশেষ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী চেয়েছিলেন, কলকাতা হাই কোর্টের কোনও বর্তমান বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠিত হোক। সেই মর্মে রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ অগ্রবাল প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ভি ঘুগের কাছে চিঠি পাঠান। তবে প্রধান বিচারপতি জানান, বর্তমান বিচারপতির পরিবর্তে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বেই তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। তার পরেই নবান্নের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করে সিট গঠনের কথা জানানো হয়।

সিটের মূল দায়িত্ব হল দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করা। কোন সময়ে, কোথায় এবং কী ভাবে ভিড়ের চাপ তৈরি হয়েছিল, তা নির্ধারণ করতে হবে কমিটিকে। মণ্ডপের ধারণক্ষমতার তুলনায় দর্শনার্থীর সংখ্যা বেশি ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি, ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে’ বলে ঘোষণা থেকে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল কি না, বৃষ্টির ভূমিকা কতটা ছিল এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনও গাফিলতি ছিল কি না, সেই বিষয়গুলিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সে সম্পর্কেও সুপারিশ করবে সিট। তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা। তবে সোমবারের বৈঠকের পর তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি কমিটির প্রধান অনিন্দিতা রায় সরস্বতী।

দায়ীদের আড়াল করা হবে না, জানালেন মুখ্যমন্ত্রী

সোমবার সল্টলেকের মিলনমেলা প্রাঙ্গণে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত বিজয়া সম্মেলনীতে চোরবাগান দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওই মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে গিয়ে আহত হওয়া ২৫ জন। তাঁদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী।

তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দুর্ঘটনার জন্য যাঁরা প্রকৃত অর্থে দায়ী, তাঁদের কাউকে আড়াল করবে না রাজ্য সরকার। তাঁর কথায়, শোক থেকে শিক্ষা নিয়ে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ করতে হবে। আগামী দিনে সমস্ত পুজো কমিটি এবং সরকারকে আরও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়।

মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, চোরবাগানের পুজো সরকার অনুমোদিত ছিল। তাই এই ঘটনায় সরকারের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনও প্রশ্ন নেই। কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির পরামর্শ মেনেই অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী বছরের পুজোর নিরাপত্তা ও আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।

তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে তিন মাস পরে পুজো কমিটিগুলিকে ডেকে তদন্তের সুপারিশগুলি প্রকাশ্যে পুস্তিকা আকারে তুলে দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে উৎসবের আয়োজন আরও নিরাপদ করা যায়।

আহতদের চিকিৎসা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাখ্যা

চোরবাগান দুর্ঘটনায় আহতদের সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আহতদের দ্রুত সুস্থ করে তোলাই ছিল সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সেই কারণেই তাঁদের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি হাসপাতালে সব ধরনের পরিষেবা পাওয়া যায় না। যেখানে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে, সেখানে আহতদের পাঠানোর ক্ষেত্রে অহঙ্কার বা ব্যক্তিগত ইগোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। তাঁর দাবি, আহত ২৫ জনই চিকিৎসার পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

দুর্ঘটনায় মৃত ১৯ জনের মধ্যে ১৭ জন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের প্রত্যেকের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতেও ওই পরিবারগুলিকে সহায়তা করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। বাকি দুই মৃত ব্যক্তি বিহারের বাসিন্দা। তাঁদের পরিবারের কাছে রাজ্যের প্রতিমন্ত্রী উমেশ রাই যাবেন বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

চোরবাগানের দুর্ঘটনাকে ছোট ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ মমতা। তাঁর বক্তব্য, এই ঘটনার দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে উৎসবের আয়োজন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন প্রয়োজন, তা-ও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। সিটের তদন্ত এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সুপারিশের দিকেই এখন নজর রয়েছে প্রশাসনের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.