দুবাই থেকে ইজ়রায়েলের তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের একটি বাণিজ্যিক বিমানে মাঝআকাশে রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইজ়রায়েলি সংবাদমাধ্যম ও বিমান পরিবহণ শিল্প সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, আক্রান্ত বিমানের ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর একজন ভারতীয় নাগরিক। ককপিটে তাঁরই সহকারী পাইলটের ছুরি দিয়ে চালানো হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। ১৮০ জন যাত্রী নিয়ে বোয়িং ৭৩৭ বিমানটি পরবর্তীতে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়।
ঘটনার বিবরণ বুধবার সকালে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজ়েড১০৭৩ (FZ1073) বিমানটি দুবাই থেকে তেল আভিভের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মাঝআকাশে প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উঁচুতে উড্ডয়নকালে আচমকা ককপিটে ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের উপর হামলা চালান তাঁর সহ-পাইলট। অভিযোগ, ছুরি দিয়ে ক্যাপ্টেনের ওপর একাধিক কোপ মারা হয়, যার ফলে ককপিট রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। মারাত্মক এই হামলার জেরে বিমানটি মুহূর্তের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে প্রায় ১৭ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে।
ঘটনা টের পেয়ে বিমানে যাত্রী হিসেবে সফররত কয়েকজন পাইলট ও বিমানকর্মীরা দ্রুত ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে পরাস্ত ও নিরস্ত্র করেন। তাঁদের তৎপরতায় বিমানটি বড়সড় দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পায় এবং সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করে।
আহত পাইলটের পরিচয় আক্রান্ত পাইলট স্মিত মচ্ছর গুজরাতি বংশোদ্ভূত। ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতীয় বিমান সংস্থা স্পাইসজেটে কাজ করেছেন। দীর্ঘ ১১ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২২ সালে তিনি দুবাইয়ের ফ্লাইদুবাই সংস্থায় যোগ দেন। বোয়িং ৭৩৭ পরিচালনায় দক্ষ স্মিত পাইলটদের মেন্টরিংয়ের কাজও করতেন। তিনি ‘ওয়েলিংকর ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট’ থেকে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ডিগ্রিধারী। বর্তমানে তিনি সৌদির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ইজ়রায়েলের প্রতিক্রিয়া ও ‘সন্ত্রাসবাদী’ দাবি ইজ়রায়েল সরকার এই ঘটনাকে একটি ব্যর্থ ‘সন্ত্রাসবাদী হানা’ ও বিমান হাইজ্যাকের চেষ্টা বলে উল্লেখ করেছে। জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত সহ-পাইলট ওমানের নাগরিক।
ইজ়রায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজ়রায়েল কাট্জ়ের দাবি, বিমানে থাকা ইজ়রায়েলি যাত্রীদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে এবং জিহাদি মানসিকতা থেকেই বিমানটি ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানান, হামলাকারী বিমানটিকে ক্র্যাশ করাতে চেয়েছিল। তবে যাত্রী ও বিমানকর্মীদের সাহসিকতায় বড় বিপর্যয় এড়িয়েছে। তিনি বলেন, “সমস্ত যাত্রী এখন বিপন্মুক্ত। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আমরা সৌদির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বিক যোগাযোগ রাখছি।” সাহসিকতা দেখিয়ে বহু প্রাণ বাঁচানো ব্যক্তিদের স্যালুট জানান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিমানের যাত্রীরা জানান, ককপিটে গোলমালের পর তীব্র আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। বিমানটি দ্রুত উচ্চতা হারাতে থাকায় সবাই ধরে নিয়েছিলেন বিমানটি ভেঙে পড়বে। তবে যাত্রী আসনে থাকা অন্যান্য পাইলটদের বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সৌদি আরবে নিরাপদ অবতরণ সম্ভব হয়।
বিমান সংস্থার অবস্থান ঘটনার বেশ কয়েক ঘণ্টা পর মুখ খোলে ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ। সংস্থার মুখপাত্র জানান, ককপিটে হাতাহাতির ঘটনার জেরে এফজ়েড১০৭৩ বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, ঘটনার সঠিক কারণ জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্ত চলাকালীন সকলকে কোনো প্রকার জল্পনা বা অনুমান করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি। পরবর্তীতে ফ্লাইদুবাইয়ের বিকল্প বিমানে করে যাত্রীদের নিরাপদে তেল আভিভে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

