বিশ্বরাজনীতির ধারা বলছে উনিশের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত

দীর্ঘ ৩০ বছর পর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার গঠন বিশ্ব রাজনীতির জাতীয়তাবাদী ধারারই প্রতিফলন। বিশ্ব রাজনীতির এই ধারা বলছে, ২০১৯ -এর নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর প্রত্যাবর্তন যে ঘটছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা যুক্ত কোনও রাষ্ট্রপ্রধানকে কেউ পুরস্কৃত করে না। নির্বাচনের মুখে রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমির শাহির তরফে নরেন্দ্র মোদীকে সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান প্রদানের ঘটনা এই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণীরই প্রতিফলন।
দেশে দেশে জাতীয়তাবাদের উত্থানের ভিন্ন ভিন্ন কারণ ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই আছে। ভারতের ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদের এই উত্থানের কিছুকিছুদিক বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ডিজিটাল দুনিয়ায় হ্যাকিং একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। হ্যাকাররা মূলত কোনও সিকিউরিটি সিস্টেমের ত্রুটিগুলি বের করে দ্রুত ওই ত্রুটিকে নিজের কাজে লাগায়। বিভিন্ন ভাইরাস ছড়িয়ে ওই সিস্টেমকে নষ্ট করে দেয়। ওই সিস্টেমের অধীনে যে সকল সাব সিস্টেম রয়েছে সেগুলিতেও ঢুকে মূল ব্যবস্থাটিকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রয়াস করে। এই হ্যাকিংয়ের ধারণার উদ্ভাবক কে এটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে ডিজিটাল দুনিয়ার ভিত কম্পিউটারের জন্মের অনেক আগেই বিশ্বের সুপার পাওয়ারগুলি তাদের নজরে আসা কোনো দেশ বা সমাজকে বাগে আনার জন্য যে পদ্ধতি ও কৌশল প্রয়োগ করতো সেটি আধুনিক যুগের হ্যাকারদের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। কোনো দেশ বা সমাজকে বাগে আনার কৌশল হিসেবে প্রথমে সেই দেশ বা সমাজের দারিদ্র্য, বেকারি, ছুয়াছুতের মতো দুর্বলতাগুলিকে কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট সমাজের কিছু মানুষকে মগজ ধোলাই করে।
অর্থ, যশ, মান, প্রতিপত্তির ফাঁদে ফেলে তাদের দিয়েই বিচ্ছিন্নতাবাদী কিংবা সাম্যবাদী আন্দোলন সংগঠিত করে সেই স্থানের নিজস্ব ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এরপর আকর্ষণীয় মোড়কে কোনো একটি ‘ইজম’ চাপিয়ে দিয়ে সেই সমাজকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে এসে স্বার্থসিদ্ধি করা হয়। ডিজিটাল হ্যাকিং সাম্প্রতিক সময়ের সমস্যা হলেও ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক হ্যাকিংয়ের সমস্যা বহু পুরানো।
প্রথমে একটি ছোটো দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যেতে পারে। গত ১২ আগস্ট ২০১৮ লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে পঞ্জাবের স্বাধীনতার জন্য গণভোটের দাবিতে বিপুল জনসমাবেশ হয়েছে। ২০২০-তে ওই গণভোটের দাবি জানিয়েছে খালিস্তানি ‘শিখস ফর জাস্টিস’ সংগঠন। ওই সমাবেশে অংশ নেন বেশ কিছু কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা। বিদেশমন্ত্রক সূত্রের খবর, এই সংগঠন এবং আন্দোলনে প্রত্যক্ষ সহায়তা করছে পাক গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই। নয়াদিল্লি বারবার লিখিত এবং মৌখিক অনুরোধ করা সত্ত্বেও টেরেসা মে সরকার নিষিদ্ধ করেনি সরাসরি ভারত বিরোধী এই সমাবেশটিকে। আই এস আই খালিস্তানি নেতাদের উস্কানি দিয়ে কানাডা এবং ব্রিটেনে বসবাসকারী শিখ সম্প্রদায়কে ভারত-বিরোধিতার কাজে লাগাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রের খবর, খালিস্থানি জঙ্গিরা বিদেশে আবার একজোট হওয়ার চেষ্টা করছে। আশির দশকের মতো তারা আবার পঞ্জাবে অশান্তি তৈরি করতে পারে। গোয়েন্দাদের দাবি, আমির শাহির এক নামকরা শুটিং ক্লাবের সঙ্গে এই সমস্ত জঙ্গিদের যোগাযোগ রয়েছে। পঞ্জাবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা ও বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে। হামলার জন্য টাকা দেওয়া হচ্ছে ওই সমস্ত জঙ্গিকে। গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ-র দাবি, খালিস্তানি জঙ্গিরা পঞ্জাবে আর এস এস নেতাদের টার্গেট করেছে। গত বছর এন আই এ কয়েকজন খালিস্তানি জঙ্গি সহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। তারা লুধিয়ানার এক সঙ্ কার্যকর্তা খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল। এন। আই এ-র দাবি ওই দুজনকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল পাকিস্তান, ফ্রান্স, ইতালি, ব্রিটেন ও সংযুক্ত আরব আমিশাহি থেকে। ওই চার্জ শিটে বলা হয় অভিযুক্ত হরমিত সিংহ, গুজ সিংহ ধিলো পাকিস্তান, ইতালি, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে পারে।
পশ্চিমি মহাশক্তি ও চার্চ সংগঠনগুলি যে ভারতের মতো দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলির মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে ওই সমস্ত দেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের কৌশল নিয়ে চলছে এই দৃষ্টান্ত থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
২০০৮ সালে তহেলকা পত্রিকার সম্পাদক তরুণ তেজপালকে আমেরিকায়। অবস্থিত ইন্ডিয়ান মুসলিম কাউন্সিলের বার্ষিক সাধারণ সভায় ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এরপর একটি লেখায় তরুণ তেজপাল চার্চ সংগঠন, মাওবাদী গ্যাং ও ইসলামিক জেহাদি গোষ্ঠীগুলির ক্রিয়াকলাপের উপর আলোকপাত করেছিলেন। সে সময় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের সাত বছর অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার জেহাদি দেশগুলির সঙ্গে যুদ্ধরত আমেরিকা ইসলামের এক নম্বর বলে শত্রু চিহ্নিত। এই পরিস্থিতিতেও আমেরিকা ও ভারতে অস্থিরতা তৈরির লক্ষ্যে বামপন্থী ও জেহাদি তৈরির কর্মসূচিতে এতটুকু ঢিলেমি আসেনি। ভারত বিরোধী জেহাদি সমর্থক আমেরিকা নিবাসী এবং স্কলারশিপের নামে আমেরিকান অর্থে লালিত পালিত বামপন্থী অঙ্গনা চাটার্জিকে ইন্ডিয়ান মুসলিম কাউন্সিলের মাধ্যমে টিপু সুলতান পুরস্কার প্রদানের ঘটনা এই বক্তব্যের পক্ষে বড়ো প্রমাণ। এই অনুষ্ঠানে গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে মিথ্যাচার ও মিথ্যা মামলা দায়েরের অপরাধে সুপ্রিম কোর্টে সাজা প্রাপ্ত ও ২৬/১১ মুম্বই হামলায় পুলিশ নির্দোষ মুসলিম যুবকদের হেনস্থা করছে বলে পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদীদের পাশে দাঁড়ানোর অভিযোগে অভিযুক্ত তিস্তা শীতলাবাদ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আমেরিকার রেডিকেল মুসলমান গ্রুপ ও ভারত বিরোধী আমেরিকান কংগ্রেসের সদস্যরা। মোট কথা আমেরিকা ও ইউরোপের এমন অনেক সংস্থা আছে যারা সারা বছর কোনো না কোনো ভারত বিরোধী ক্রিয়াকলাপ চালাতেই থাকে।
ভারতকে বিশ্বের কাছে হেয় করার ঘটনা নিরন্তর ঘটছে। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে শুধু ভারতেই নয় পৃথিবীর যে। ১২৫-১৫০টি দেশে ইউরোপীয় উপনিবেশ ছিল সেই সমস্ত দেশের প্রত্যেকটিতেই এরকম ঘটনা ঘটছে। ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম ভালোভাবে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হবে যে স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবেমাউন্টব্যাটেন সরকারের সর্বোচ্চ পদে বসে থেকে অত্যন্ত নিপুণ ভাবে কাশ্মীর নামক অগ্নিবলয় তৈরি করে দিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রেও কর্মপরিকল্পনা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের হলেও কর্ম সম্পাদন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর হাত দিয়েই হয়েছে।
২০০১ সালে ডারবানে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কনফারেন্স-এর বিষয়বস্তু ছিল রেসিজম, রেসিয়াল ডিস্ক্রিমিনেশন, জোনোফোবিয়া অ্যান্ড রিলেটেড ইনটলারেন্স। এই সম্মেলনে ভারতকে অসহিষ্ণু দেশ হিসেবে তুলে ধরার ষড়যন্ত্র রচিত হয়েছিল। এই ডারবান পরিষদে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে দলিত ও দ্রাবিড় ইস্যু তুলে ধরা হয়েছিল। ভারত সরকারের আপত্তি সত্ত্বেও ভারত সম্পর্কে এই ধরনের বিষয় বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা হচ্ছে। এই ধরনের সংগঠন এখনো বিশেষ। বিশেষ দেশের গায়ে কলঙ্ক লেপনের জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই ধরনের বিষয় উত্থাপন করে থাকে। ২০০১ সালে এই ধরনের বিষয় উত্থাপনের আরেকটি প্রেক্ষাপট হলো এই সময় কেন্দ্রে অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকার ক্ষমতাসীন।তখন কংগ্রেসের লুপ্তপ্রায় অবস্থা। নতুন সরকার যাতে নতুন ভাবনা নিয়ে এগোতে না পারে সেজন্যই ভারত সম্পর্কে এই ধরনের হেট প্রোপাগান্ডার আয়োজন। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদী সরকার। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আবার সেই অসহিষ্ণুতার ইস্যুকে খুঁচিয়ে তোলা হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিষয়টি এমন ভাবে তুলে ধরা হলো যে পুরস্কার ত্যাগের হিড়িক পড়ে গেল।
ডারবান সম্মেলনকে সামনে রেখে দলিত ও দ্রাবিড় বিষয় দুটো আন্তর্জাতিক স্তরে এমন ভাবে তুলে ধরার প্রয়াস করা হয় যেন অসহিষ্ণুতা নিপিড়নের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন দেশের তরফে ভারতে নানারকম নিষেধাজ্ঞার জারি করতে শুরু করে। দ্রাবিড় ইস্যুকে তুলে ধরতে তিনটি সংগঠনকে কাজে লাগানো হয়েছিল যার মধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকার বড়ো বড়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ শামিল হয়েছিল। দলিত ইস্যু তুলে ধরার জন্য লুথেরান ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন জেনেভা, ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেজ, আমেরিকার ইভানজেলিক্যাল লুথেরান চার্চকে সমস্ত রকম প্রস্তুতি করতে বলা হয়েছিল। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে
২০০১ এর ডারবান সম্মেলনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে দলিত সলিডারিটি নেটওয়ার্ক গঠনের মধ্য দিয়ে। এই নেটওয়ার্কের প্রয়াসে ২০০০ সালে ইন্টারন্যাশনাল দলিত সলিডারিটি নেটওয়ার্ক গঠিত হয়। যার প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয়। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেন হেগেনে। ওই সময় ২০০০ সালে তামিলনাড়ুতে দ্রাবিড়ইস্যু দ্রাবিড় ধর্ম জাতিভেদ নষ্টকরতে পারে’ শীর্ষক সাধারণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
দ্রাবিড়ধর্ম হিন্দুধর্ম থেকে পৃথক এই বিষয়টি তুলে ধরাই এই ধরনের আলোচনা সভার মূল উদ্দেশ্য। পরের বছর ডারবানে ইউনাইটেড নেশনের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত ‘দেশ বিদেশে জাতি বিদ্বেষ জনিত অত্যাচার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক স্তরের আলোচনা সভায় ‘ভারতই বিশ্বে জাতিবিদ্বেষের জননী’বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস করা হয়। ২০০৪ সালে প্রকাশিত এক পুস্তিকায় দাবি করা হয় ভারত দ্রাবিড়-খ্রিস্টান দেশ এবং খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরাই সংস্কৃত ভাষার সৃষ্টিকর্তা। এর পরের বছর এক প্রস্তাব আনা হয় যাতে বলা হয় দ্রাবিড় ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা ভারতে এক স্বতন্ত্র দেশের মানুষ হিসেবে বাস করে এবং এই মানুষদের নিয়ে স্বতন্ত্র গণরাজ্য স্থাপনের জন্য সমস্ত বিশ্বজুড়ে বিদ্রোহী আন্দোলন শুরু করা প্রয়োজন। এর জন্য বিশ্বের ৫০টিরও বেশি স্থানে বিভিন্ন সংস্থা তৈরি করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনে চরম পন্থার আশ্রয় নিতে হবে। এটা প্রমাণ করার জন্য এলটিটিইর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ আক্রমণের যোজনা বানানো হয়। শুরু হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সমর্থন জুটানোর প্রয়াস। এই লড়াইয়ে কম করে এক লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০৬ সালে পোপের ভাষণেও এই বিষয়টি উঠে আসে।
ইউরোপিয়ান মহাশক্তিগুলি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমগ্র বিশ্বকে পদানত করে শাসন ও শোষণ করেছে। এখন সেই সাম্রাজ্য নেই, তবুও ঘুর পথে হলেও সেই শাসন ও শোষণের ধারা বজায় রাখতে চাইছে। প্রশ্ন হচ্ছে, মহাশক্তিগুলির এই সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতার উৎস কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখতে হবে।বিজ্ঞান যত উন্নত হোক না কেন বিশ্বের মানব সভ্যতার ইতিহাস কিন্তু এখনো সেই রক্ষণশীল ‘বংশতান্ত্রিক’ সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। এই সিদ্ধান্তের মূল কথা হলো বর্তমান বিশ্বের বিস্তার জেনেসিসের নোয়ার গল্প অনুসারে তুর্কিস্থানের অরাবত পর্বত থেকে শুর হয়েছে। বিশ্বের আশি শতাংশ বিদ্যালয়ে এই ইতিহাসই পড়ানো হচ্ছে। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও তুর্কিস্থান ইউরোপের সীমান্ত লাগোয়া এশিয়াতে অবস্থিত। তবুও ইউরোপের ইতিহাস জেনেসিস, বাইবেল, মোজেসের ইতিহাসের উপর নির্ভরশীল। বিগত দেড়শো বছর ধরে সমগ্র বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় জগৎ ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় গুলির প্রভাবে প্রভাবিত। স্বাভাবিক ভাবেই বিশ্বের ইতিহাস ইউরোপের ইতিহাসের মূলগত ধারণা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। যতক্ষণ পর্যন্ত না এই মূলগত ধারণাগুলিকে চ্যালেঞ্জ করা যাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো দেশের পক্ষেই নিজেদের প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান করা সম্ভব নয়।
বিগত চারশো-পাঁচশো বছর ধরে বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ এলাকায় ইউরোপিয়ান আক্রমণকারীরা শাসনের নামে লুটপাট চালিয়েছে। প্রথম ২০০-৩০০ বছর লুটপাট, অত্যাচার চালানোর পর এই অন্যায়কে যুক্তিসঙ্গত করার জন্য ইতিহাস পরিবর্তনের কাজে হাত দিয়েছে। বিশ্বের ইতিহাস যে পুস্তক থেকে শুর বলে দাবি করা হচ্ছে সেই জেনেসিস এর নোয়ার গল্প ইউরোপের মানুষদের বিশ্বজুড়ে লুটপাট করার নৈতিক অধিকার দিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা লিখিত এই লুটের ইতিহাস পরিবর্তনের কাজে হাত দিয়েছে। কিন্তু যে সমস্ত দেশে এখনো ইউরোপের কর্তৃত্ব বহাল রয়েছে বা যে সমস্ত দেশ এখনো ঔপনিবেশিক মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি সেই সমস্ত দেশ এখনো জেনেসিস ভিত্তিক ইতিহাস পরিবর্তন করে নিজস্ব ইতিহাস লেখার কথা ভাবতেই পারছে না। যেমন স্বাধীনতার সাত দশক পরও ভারত নিজস্ব ইতিহাস লেখার কথা ভেবে উঠতে পারছে না। আর্যরা বাইরে থেকে এসেছে, দক্ষিণ ভারতের অনার্যরা আফ্রিকা থেকে এসেছে এই ঐতিহাসিক তত্ত্বের উৎসও জেনেসিসের সেই গল্প। সমগ্র বিশ্বই আজ ইতিহাস থেকে জেনসিসের গল্প ছুঁড়ে ফেলে দিতে উদ্যোগী হয়েছে। কিন্তু সংগঠিত ভাবে
এই প্রয়াস না হলে সাফল্য আসার সম্ভাবনা কম। কারণ ভারত-সহ বিশ্বের এক হাজারেরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় বিগত ১৫০-২০০ বছর ধরে ওই ইতিহাসকে কেন্দ্রে রেখেই নানা সংশোধন সংযোজন করেছে।
আর্য সভ্যতা ভারতেই সমৃদ্ধ হয়েছে, ভারতীয় ভাষাগুলির সৃজন ভারতেই হয়েছে। এবং এতে সংস্কৃতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এটাই ভারতীয় সিদ্ধান্ত। ড. বাবাসাহেব আম্বেদকরও সংস্কৃত-সহ সমস্ত ভারতীয় ভাষার উৎপত্তি জেনেসিসের গল্পের টাওয়ার অব বাবেল থেকে হয়েছে এবং আর্যরা বাইরে থেকে এসেছে এই তত্ত্বের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের মতো ব্যক্তিত্বও তীব্র ভাবে এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু বিগত সাত দশক ধরে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে স্বামীজী ও ড. আম্বেদকরকে ব্যবহার করলেও ইতিহাস পুনর্লিখনে এই মনীষীদের ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। বাইবেল ও জেনেসিসকে ভিত্তি করে কীভাবে সমগ্র বিশ্বকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে সেটি বুঝতে হলে সংক্ষেপে নোয়ার গল্পটি দেখে দেওয়া যেতে পারে।
একবার এক ভয়ঙ্কর বন্যা হয়েছিল। ওই বন্যায় কেবলমাত্র নোয়া নামে একজন ব্যক্তিই বেঁচেছিল। যার অর্থ সমগ্র বিশ্বের মানবজাতি নোয়ার বংশধর। নোয়ার তিন পুত্র ছিল। সাম, হাম ও জেফেথ। একবার হাম ওর পিতা নোয়াকে নেশা করে উলঙ্গ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে হেসে ফেলে। কিন্তু সাম তার পিতাকে লজ্জা নিবারণের বস্ত্র দিয়ে ঢেকে দেয়। এতে নোয়া সামের ব্যবহারে খুশি হয়ে হামকে অভিশাপ দেয় যে ওর গায়ের রঙ কালো বর্ণের হবে এবং দক্ষিণ দিকে গিয়ে বসবাস করবে। হামের পুত্ররা চিরকাল সামের পুত্রদের সেবা করবে। এই গল্পের পরিণাম এটা হয়েছে যে বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশির ভাগ আজ সেমেটিক, হেমেটিক এবং জেফেথেটিক নামে তিনটি অংশে বিভক্ত। ভারতে আর্যদের সামের বংশধর হিসেবে সেমেটিক, আফ্রিকার পথ ধরে দক্ষিণ ভারতে আসা অনার্যদের হামের বংশজাত হেমেটিক বলে গণ্য করা হয়। ভারতে যাদের অনার্য, তামিল, দ্রাবিড় বলা হয় তাদের হেমেটিক বলে চিহ্নিত করা হয়। ভারতের অন্য কোথাও সেমেটিক হেমেটিক বিভাজনের হদিশ পাওয়া না গেলেও তামিলনাড়ুতে মিশনারিরা দ্রাবিড়, তামিল ইস্যুতে বিভাজন রেখা সেমেটিক হেমেটিক পর্যন্ত প্রকট করে তুলেছে।
ভারতে সেমেটিক হেমেটিক থিয়োরি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে আর্য নামক একটি কাল্পনিক দলকে বাইরে থেকে প্রবেশ করাতে হয়েছে। শুধু ভারত নয় বিশ্বের অনেক দেশেই সেমেটিক হেমেটিক থিয়োরি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে কোনো না কোনো কাল্পনিক দলকে সেই দেশে প্রবেশ করাতে হয়েছে। যেমন আফ্রিকায় হেমেটিক, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় কিছু সেমেটিক কিছু হেমেটিকের বাইরে থেকে প্রবেশ করিয়ে ইতিহাস রচিত হয়েছে। তবে আধুনিক ‘Y-ক্রমোজম সিদ্ধান্ত’আর্য-অনার্য, দক্ষিণ ভারতীয়-উত্তর ভারতীয় বিভাজনের মূলে আঘাত হেনে প্রমাণ করেছে যে এদের মধ্যে জিনগত কোনো পার্থক্যই নেই। অর্থাৎ সমস্ত ভারতীয় একই পরম্পরা থেকেই বিস্তার লাভ করেছে।
আক্রমণকারীদের আক্রমণের ধরন নিয়েও সচেতন হওয়া জরুরি। সেবার আড়ালে, শিক্ষা বিস্তারের আড়ালে মানবিকতার আড়ালে কীভাবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা যায় সেটা মাদার টেরিজার মিশনারিজ অব চ্যারিটি, লুথেরান পন্থীদের ক্রিয়াকলাপের উপর নজর রাখলে স্পষ্ট হবে। ফলে নির্বাচন এলে ভারতেরশত্রুরা নানাভাবে যে জনমতকে প্রভাবিত করার প্রয়াস করে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত। এবারের নির্বাচনে তথাকথিত উদারপন্থী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির দিকেই এই ভারতবিরোধী অপশক্তিগুলিরই সমর্থন থাকবে এটাই স্বাভাবিক। শুধু খ্রিস্টান মিশনারির নয়, জেহাদিদেরও আক্রমণের নানা কৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকার প্রয়োজন। আছে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর থেকে ভারতে কোনোদিনই এই ধরনের অপশক্তির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই হয়নি। লড়াইয়ের পথে প্রধান কাটা হয়ে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসের মতো তথাকথিত সেকুলার উদারবাদী দলগুলি। ভারতের মানুষ ভারতীয় জনতা পার্টির মতো জাতীয়তাবাদী দলের সরকারকে যে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র হিসেবে দেখছে ২০১৪-এর নির্বাচনে তা প্রমাণ হয়ে গেছে। উনিশের নির্বাচনের ফলাফলে সেই প্রমাণের পুনরাবৃত্তি হবে মাত্র।

সাধন কুমার পাল

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.