বিসর্জনে প্রতিমা স্পর্শের ক্ষেত্রে ‘সনাতনী’দের অগ্রাধিকার, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে রাজনৈতিক বিতর্ক

বিসর্জনে প্রতিমা স্পর্শের ক্ষেত্রে ‘সনাতনী’দের অগ্রাধিকার, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে রাজনৈতিক বিতর্ক

দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের সময় কেবল সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীরাই প্রতিমা স্পর্শ করবেন। বুধবার কলকাতার বাজে কদমতলা ঘাটে বিসর্জনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে গিয়ে এমনই নির্দেশ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সিপিএম, কংগ্রেস ও তৃণমূলের নেতারা মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।

বাজে কদমতলা ঘাটে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সনাতনী ধর্মে যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের ছাড়া কেউ প্রতিমায় হাত দেবেন না। আমি সিপি-কে (কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ) বলেছি, যাঁরা এখানে আসবেন, তাঁদের নাম লিখে রাখতে। ওটাও আইডেন্টিফাই করে দিতে হবে।’’

তাঁর এই নির্দেশের পিছনে কোনও সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নেই বলে দাবি করেছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, প্রতিমার পবিত্রতা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পরম্পরা বজায় রাখতেই এই ব্যবস্থা। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘পবিত্রতা রাখতে গেলে যা পরম্পরা, যা ঐতিহ্য, যা শাস্ত্র, যা নিয়ম, যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে এসেছে, সেটাকে মেনেই করতে হবে।’’

বিসর্জন ঘিরে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রতিমার পবিত্রতা রক্ষার যুক্তিতে ক্রেনের পরিবর্তে হাতে টানা ট্রলি ব্যবহারের কথা বলেছেন তিনি। বিসর্জনপর্বে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজ্য পুলিশ ও কলকাতা পুলিশের পাশাপাশি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)-কেও মোতায়েন করা হচ্ছে। এ ছাড়া, গঙ্গার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে বিসর্জনপর্ব শেষ হওয়ার পর ভোর থেকেই প্রতিমার কাঠামো সরানোর কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী সংবিধানবিরোধী কাজ করছেন এবং হিন্দু মৌলবাদকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। কে সনাতনী আর কে সনাতনী নন, তা নির্ধারণ করার ভিত্তি কী, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। বিকাশরঞ্জনের কথায়, ‘‘ওঁর কাছে কি তালিকা আছে, কে সনাতনী, আর কে সনাতনী নন? উনি কি বলতে পারবেন কী ভাবে সনাতনী হয়? একটা উত্তরও ওঁর কাছে নেই।’’

বিকাশরঞ্জন আরও অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) নির্দেশ মেনে কাজ করছেন। তাঁর দাবি, বিভিন্ন বুকস্টলে গিয়ে যাঁরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন, তাঁদের অধিকাংশই আরএসএসের কর্মী।

প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র সুমন রায়চৌধুরীও মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে সাংবিধানিক পদে থাকা কোনও ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য অনভিপ্রেত। ভারতের বহুত্ববাদী সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

সুমনের অভিযোগ, অহিন্দুদের সামাজিক ভাবে বয়কট করার বার্তা দেওয়ার মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী বিভাজনের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তাঁর কথায়, দিল্লির আরএসএস নেতৃত্বকে খুশি করার উদ্দেশ্যে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর এমন মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক।

অন্য দিকে, তৃণমূল নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ও শুভেন্দুর বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, হিন্দুধর্মের উদারতার দিকটি না বুঝলে এই ধর্মের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। বৈশ্বানরের প্রশ্ন, বিসর্জনের সময় অহিন্দুরা প্রতিমা স্পর্শ করতে না পারলে পেশাগত কারণে প্রতিমা বহন বা বিসর্জনের কাজে যুক্ত অহিন্দু শ্রমিকদের ভূমিকা কী হবে?

মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে ঘিরে ধর্মীয় পরম্পরা ও প্রতিমার পবিত্রতা রক্ষার যুক্তির পাশাপাশি সংবিধান, বহুত্ববাদ এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিধিনিষেধ আরোপের প্রশ্নও সামনে এসেছে। ফলে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের আগে এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতর তীব্র হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.