বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ভাঙনের মুখে পড়া তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়—দুই শিবিরের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের পর উপনির্বাচনের মঞ্চে তৈরি হলো নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। মঙ্গলবার নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন চলাকালীন শাসকদল বিজেপির বিরুদ্ধে ব্যাপক ‘ভোটলুট’ ও বুথ দখলের অভিযোগ তুলে একসুর জোড়ালো করেছে প্রাক্তন শাসকদলের দুই অংশ। তৃণমূলের পাশাপাশি কংগ্রেস, সিপিআই(এম) এবং হুমায়ুন কবীরের দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টিও (এজেইউপি) সার্বিক রিগিংয়ের অভিযোগে সরব হয়েছে। একাধিক কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলেছে কংগ্রেস ও মমতা-পন্থীরা। যদিও সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বিজেপি দাবি করেছে, ভোটদান প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অবাধ, উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে।
ঘটনাবহুল পটভূমি ও ভোটের পরিসংখ্যান উপনির্বাচনের শুরু থেকেই দুই কেন্দ্রেই রাজনৈতিক দৃশ্যপট ছিল চরম নাটকে ভরা। নাম ও প্রতীক নিয়ে তৃণমূলের দুই শিবিরের আইনি টানাটানি, নন্দীগ্রামে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা, পরবর্তী সময়ে মিলনের গ্রেফতারি ও হাইকোর্টে জামিন, রেজিনগরে মমতাপন্থী প্রার্থী রবিউল আলমের ক্ষণিকের ইস্তফার ‘ইউটার্ন’, প্রতীক ইস্যুতে আইএসএফ-এর আইনি পদক্ষেপ এবং বিজেপির মনোনয়ন নিয়ে আপত্তি—নানা টানাপোড়েনের পর মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, মঙ্গলবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে রেকর্ড ৭৯.৩৯ শতাংশ এবং রেজিনগরে ৭৮.৪২ শতাংশ ভোট সংগৃহীত হয়েছে। সকালে ভোট দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আত্মবিশ্বাসের সুর চড়িয়ে বলেন, ২০১৬ সালে তাঁর জেতার ৮২ হাজার ভোটের ব্যবধানকেও ছাপিয়ে রেকর্ড তৈরি করবেন বিজেপি প্রার্থী হাসিরানি রথ।
রেজিনগরে নজিরবিহীন নাটক: হুমায়ুনের গ্রেফতারি ও পুত্রের বিস্ফোরক বয়ান মঙ্গলবার সকালে ভোটদানের পরেই রাজ্য প্রশাসন ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে তীক্ষ্ণ আক্রমণে বিঁধেন এজেইউপি প্রধান তথা নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। গায়ের জোরে রেজিনগর দখলের অভিযোগ তুলে দেশের জরুরি অবস্থার সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা টানেন তিনি। পরবর্তীতে নির্বাচনী বিধিভঙ্গ, পুলিশকে হুমকি ও প্ররোচনার অভিযোগে পুলিশ হুমায়ুনকে গ্রেফতার করে, যদিও সন্ধ্যার আগেই তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ভোট পর্ব মেটার আগেই ফলাফলের আশা ত্যাগ করার কথা জানান রেজিনগরের এজেইউপি প্রার্থী, হুমায়ুন-পুত্র গোলাম নবি আজ়াদ। তিনি জানান, নির্বাচনের ফলাফল আগাম স্পষ্ট হয়ে যাওয়ায় আগামী ৯ অক্টোবর ভোটগণনার দিন গণনাকেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকবেন তিনি।
রেজিনগরে রিগিংয়ের অভিযোগে সরব বিরোধীরা রেজিনগরে বেলা গড়াতেই বুথ দখল, ছাপ্পা ভোট এবং এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে। মমতাপন্থী প্রার্থী রবিউল আলম ও ঋতব্রতপন্থী প্রার্থী শফিউজ্জামান শেখ অভিযোগ জানান, বহু বুথ থেকে তাঁদের এজেন্টদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে এককভাবে বিজেপির এজেন্ট বসিয়ে রাখা হয়েছিল। ঘটনার প্রতিবাদে অবিলম্বে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানান রবিউল।
কংগ্রেস প্রার্থী অনিয়মের প্রতিবাদে রেজিনগর থানার সামনে ধর্নায় বসেন। পরবর্তীতে জেলাশাসকের দফতরে বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী অভিযোগ করেন, “হুমায়ুনকে কৃত্রিম বিরোধী সাজিয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাইনারি তৈরির চেষ্টা চলছে। নজিরবিহীন সন্ত্রাসের আবহেই ভোট নেওয়া হয়েছে।”
তীব্র অভিযোগ উড়িয়ে বিজেপির বিজয়ী প্রত্যাশী প্রার্থী শাখারব সরকার জানান, “মানুষ দুর্গাপূজার আবহেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উৎসবে মেতে ভোট দিয়েছেন। গণনার মাধ্যমে বিজেপির জয় এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
নন্দীগ্রামে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ও কংগ্রেসের লড়াই রেজিনগরের মতো নন্দীগ্রামেও বিরোধীদের তরফে ‘মাঠ ফাঁকা করে গোল দেওয়ার’ নালিশ তোলা হয়। সকালে কংগ্রেসের এক ব্লক সভাপতি আশরাফুল তুল্লাকে অনৈতিকভাবে পুলিশ আটক করেছে বলে দাবি করে হাত শিবির। সোনাচূড়ার একাধিক বুথে এজেন্ট বসানো কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়। কালীচরণপুর ও কেন্দামারির মতো এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে অবৈধ জমায়েত হটাতে গেলে স্থানীয় মহিলারা স্লিপ কেড়ে নেওয়া ও ভোট দিতে না দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
একাংশে চরম অশান্তির মুখে পড়ে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান অভিযোগ করেন, বুথ থেকে কংগ্রেসের পোলিং এজেন্টদের জোর করে তাড়িয়ে ভোটলুট চালানো হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুপুরজুড়ে একাই বিভিন্ন বুথে ঘুরতে দেখা যায় মিলনকে। অন্যদিকে বিজেপি কটাক্ষ করে দাবি করে, কংগ্রেসের কোনও পোলিং এজেন্ট বাস্তবে ছিলই না।
বিজেপির প্রতিক্রিয়া সব ধরণের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট জানান, দুই কেন্দ্রেই বিজেপির জয় সুনিশ্চিত। তিনি বলেন, “রেজিনগরের সংখ্যালঘু সমাজ এবার ধর্মীয় মেরুকরণ নয়, বরং কারখানা ও উন্নয়ন চান।” পাশাপাশি, নন্দীগ্রামে বিগত নির্বাচনের তুলনায় অন্তত পাঁচ গুণ বেশি ভোটের ব্যবধানে দলের প্রার্থী জয়ী হবেন বলেও দাবি করেন তিনি।

