মাত্র ২০ বছর বয়সে ফাঁসি হয়েছিল এই অসীম সাহসী যুবকের
তিনি শুধু বলেছিলেনঃ “ভবিতব্য ছিলো আশু আমার হাতে নিহত হবে, আমি ফাঁসিতে মরবো, আশু দেশের শত্রু তাই হত্যা করেছি”। বিচারে তাঁর ফাঁসির হুকুম হয় এবং ১৯ মার্চ, ১৯০৯ তারিখে মাত্র ২০ বছর বয়সে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারগারে ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

দেশমাতৃকার মুক্তির লক্ষ্যে যিনি হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন, তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে ফাঁসিতে আত্মহুতি দেওয়া চতুর্থ বাঙালি এবং খুলনার প্রথম শহীদ চারুচন্দ্র বসু।

বিপ্লবী চারু বসু জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। তাঁর ডান হাতটি ছিল হাঁসের পায়ের পাতার মতো মোড়ানো। খর্বকায়, অসুস্থ, ছিপছিপে পাতলা দেহগড়নের এই তরুণ স্বভাবে ছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত, ক্ষুরধার ও প্রতিবাদী। ১৮৯০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চারুচন্দ্র বসু জন্মগ্রহণ করেন খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার শোভনা গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কেশবচন্দ্র বসু। চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। চারু বসুর বিয়ের দিন ঠিক হয়েছিল ১৯০৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু হবু স্ত্রীকে স্বাধীনতা সংগ্রামের কঠিন পথে চলার কথা বলে বিয়ের নির্ধারিত দিনের আগেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। ১০ ফেব্রুয়ারি জানা গেল সরকারি উকিল আশু বিশ্বাসকে হত্যা করেছেন সেই ঘর পালানো তরুণ চারু বসু।

আলীপুর ও মুরারীপুকুর বোমা হামলাসহ অন্যান্য মামলার ইংরেজ সরকার পক্ষের উকিল ছিলেন আশুতোষ বিশ্বাস। তিনি সক্রিয়ভাবে বিভিন্ন বিপ্লবীর শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের সহায়তা করতেন। বৃটিশ সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক এই আইনজীবী নিজেই আগ্রহী হয়ে তার দাপ্তরিক কর্মের বাইরে গিয়েও স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে বৃটিশ পুলিশকে বিভিন্ন রকম সহায়তা দিয়ে যেতো স্বদেশী আন্দোলনকারীদের ধরার জন্য। আশু উকিলের এই জঘন্য কর্মকাণ্ড স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকা হিসেবে পরিগণিত হয়। তাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন কুখ্যাত বৃটিশ-দালাল আশু উকিলকে হত্যা করা হবে।
স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুবক চারু বসু সানন্দে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।চারু বসু তাঁর পঙ্গু ডান হাতে খুব শক্ত করে রিভলবার বেঁধে নিয়ে গায়ে চাদর জড়িয়ে আলিপুর আদালত প্রাঙ্গণে যান। দিনটি ছিল ১৯০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। উপযুক্ত সময়ের জন্য তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর আদালতের পশ্চিম পাশে তিনি তাঁর লক্ষ্যবস্তু আশু উকিলকে পেয়ে যান এবং সঙ্গে সঙ্গে বাম হাত দিয়ে ট্রিগার চাপেন। আক্রান্ত ব্যক্তি চিত্কার করতে করতে দ্রুত দৌড়াতে থাকেন। চারু বসু আবার গুলি করেন এবং ঘটনাস্থলেই মারা যান আশু উকিল। ততক্ষণে সুরক্ষিত আদালত প্রাঙ্গণে চারু বসু পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।
চারু বসুকে গ্রেফতার করে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তাঁকে গ্রেফতার করা গেলেও তাঁর মুখ থেকে অস্ফুট হাসির রেখাটিকে কখনও দমন করা যায়নি। বিপ্লবীদের সম্পর্কে তথ্য বের করার জন্য জেলখানায় তাঁর উপর ভয়ানক রকম অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধী চারু বসু সেই নির্মম শারীরিক নির্যাতন মুখ বুঁজে সহ্য করেছেন। কিন্তু তাঁর সহকর্মী এবং সংগঠন সম্পর্কে একবিন্দু তথ্য তিনি মুখ থেকে বের করেননি। বহু জেরা করেও জানা যায়নি আলিপুর বোমা মামলায় সরকারি কৌঁসুলি আশুতোষ বিশ্বাসকে কার নির্দেশে তিনি খুন করেছেন ।

শারীরিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি কোন রকম অনুকম্পা প্রার্থনা না করে বরং সর্বদা নিজের আদর্শের প্রতি সুগভীর আস্থা রেখেছিলেন।চারুচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯০৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। ২৪ পরগণা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ বাম্পসকে লক্ষ্য করে চারু বসু বলেছিলেন, ‘না কিছুই আমি চাইনে সেশন-টেশনের প্রয়োজন নেই। বিচার করে কালই আমাকে ফাঁসি দাও। এটা ভবিতব্য যে, আশু বাবু আমার গুলিতে নিহত হবেন এবং আমি ফাঁসি কাঠে প্রাণ দেব।’ আদালতের কার্যবিবরণী শেষ হয় ১৯০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। মামলার বিচারে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুর সাজা দেয়া হয় এবং ঠিক তার পরদিনই তাঁর মৃত্যুদণ্ডের কথা শোনানো হয়। তিনি তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বলেন। ২রা মার্চ তাঁর বিচার হাইকোর্টে তোলা হয়। ১৯০৯ সালের ১৯ মার্চ আলিপুর কেন্দ্রীয় জেলখানায় এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী শতভাগ দেশপ্রেমিক মৃত্যুঞ্জয়ী বিপ্লবীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

ভারতমাতার এই বীর সন্তানেরা সকলেই চেয়েছিলেন স্বাধীন অখণ্ড ভারত।অকালে অস্তাচলে চলে যাওয়া এই সব বীর তরুণ অরুণদের আত্মবলিদান কি ব্যর্থ হয়ে যাবে ?
আগামী প্রজন্মের তরুণরা কি এদের দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হবে না ?

১৪ এপ্রিল ২০১৯ রহড়া-খড়দহ জাতীয়তাবাদী যুব মঞ্চের পক্ষ থেকে আমরা প্রকাশ করতে চলেছি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে ” অগ্নিযুগে ” ফাঁসির মঞ্চে হাসতে হাসতে প্রাণ সঁপে দেওয়া বাংলার ৪১ জন বীর বিপ্লবীদের( কত বছর বয়সে,কোন সালে,কাকে হত্যা করবার জন্য কোন জেলে ফাঁসি হয়েছিল)চিত্র সমেত এক তালিকা।
এর আগে এই রাজ্যের কোন সরকার কোন প্রতিষ্ঠান এই রকম ভাবে বাংলার বিপ্লবীদের চিত্র সমেত তালিকা প্রকাশ করেনি। রহড়া-খড়দা জাতীয়তাবাদী যুব মঞ্চ সর্বপ্রথম অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের শ্রদ্ধা জানিয়ে তা প্রকাশ করতে চলেছে।
আসুন অগ্নিযুগের এই বিপ্লবীদের সম্পর্কে জানুন এবং সংগ্রহ করুন এই তথ্য সমৃদ্ধ চিত্র তালিকাটি।

বন্দেমাতরম,জয়হিন্দ।

সৌমেন ভৌমিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.