ইসরোর মুকুটে নতুন পালক! এমিস্যাট ও ২৮টি বিদেশি কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে মহাকাশে পাড়ি দিল শক্তিশালী পিএসএলভি-সি-৪৫

কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছিল রবিবার সকাল ৬টা ২৭ মিনিট থেকে। সোমবার সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটা থেকে দেশের অ্যাডভান্সড ইলেকট্রনিক ইনটেলিজেন্স স্যাটেলাইট বা এমিস্যাট (EMISAT) এবং ২৮টি বিদেশি কৃত্রিম উপগ্রহকে পিঠে চাপিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষপথে পৌঁছে দিতে মহাকাশে রওনা হয়ে গেল ইসরোর পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যাল (পিএসএলভি-সি-৪৫)।

অন্ধ্রপ্রদেশের সমুদ্রোপকূলের শ্রীহরিকোটায় ইসরোর সতীশ ধবন মহাকাশ কেন্দ্রে (এসডিএসসি) আজ ছিল হাজার মানুষের ভিড়। রকেটের পিঠে সওয়ার কোনও উপগ্রহের পৃথিবীর কক্ষপথ বা মহাকাশে পাড়ি জমানোর ঘটনা উপভোগ করতে এসডিএসসিতে বানানো হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার দর্শকাসনের গ্যালারি। এ দিন সেটা খুলে দেওয়া হয়েছিল সাধারণ মানুষের জন্যও। এসডিএসসি-তে রকেট উৎক্ষেপণের জন্য রয়েছে দু’টি লঞ্চপ্যাড। গ্যালারিটি এমন ভাবে বানানো হয়েছে যাতে দু’টি লঞ্চ-প্যাড থেকেই রকেটের উৎক্ষেপণ দেখা যায়। ‘মিশন শক্তি’র মহাকাশে সাফল্যের পর এমিস্যাটের সফল উৎক্ষেপণ ইসরোর মুকুটে নতুন পালক যোগ করল বলেই মনে করা হচ্ছে।

কী এই এমিস্যাট?

মূলত নজরদারি চালানোই এই উপগ্রহের কাজ। শত্রু শিবিরের খুঁটিনাটি লহমায় হাতের মুঠোয় এনে দিতে পারে এই নয়া উপগ্রহ, এমনটাই দাবি ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার (ডিআরডিও)। বিজ্ঞানী রবি গুপ্তর কথায়, এই উপগ্রহের রয়েছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। প্রথমত এটি শত্রু শিবিরের রাডারের নাগাল সহজেই পাবে, দ্বিতীয়ত এর শক্তিশালী সেন্সর বলে দেবে সীমান্ত পেরিয়ে শত্রুপক্ষ হামলার জন্য তৈরি হচ্ছে কিনা, কী কী অস্ত্র বা ইলেকট্রনিক গ্যাজেট রয়েছে তাদের ঝুলিতে। তা ছাড়াও, শত্রু ঘাঁটির নিখুঁত ও স্পষ্ট ছবি তুলেও পাঠাতে পারবে এমিস্যাট।

খুবই হাল্কা এই উপগ্রহটি পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করা যাবে সহজেই। ডিআরডিও সূত্রে খবর, এমিস্যাটের ওজন ৪৩৬ কিলোগ্রাম। পৃথিবী থেকে ৭৬৩ কিমি দূরত্বের কক্ষপথে সেটি স্থাপন করা হবে। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের দাবি সীমান্ত পারের যে কোনও জায়গায় জঙ্গি শিবিরে কড়া নজরদারি চালাবে এই নয়া উপগ্রহ। বিজ্ঞানীদের দাবি, এই ইলেকট্রনিক স্যাটেলাইট সহজেই বলে দেবে শত্রু শিবিরে কী কী গ্যাজেট সক্রিয়। বালাকোটে হামলার পর ন্যাশনাল টেকনিক্যাল রিসার্চ অর্গানাইজেশন জানিয়েছিল সীমান্ত পারে জইশ ঘাঁটিতে সক্রিয় ছিল ৩০০-রও বেশি মোবাইল। মহাকাশ বিজ্ঞানীদের কথায়, এমিস্যাটের উন্নত প্রযুক্তি শুধু মাত্র গ্যাজেটের সংখ্যাই নয়, কথোপকথনের বিস্তারিত তথ্যও পাঠাতে সক্ষম।

মাইক্রোস্যাট-আরের চেয়ে বেশি শক্তিশালী এমিস্যাট

জানুয়ারিতে ৭৪০ কিলোগ্রাম ওজনের একটা উপগ্রহকে কাঁধে চাপিয়ে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিল ‘পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল’ বা পিএসএলভি-সি-৪৪। ‘মাইক্রোস্যাট-আর’ নামে এই উপগ্রহটি মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল সেনাবাহিনীর গবেষণামূলক কাজের জন্যই। যেটি রাতের পরিষ্কার ছবি তুলে পাঠাতে সক্ষম। তবে ডিআরডিও জানিয়েছে, এমিস্যাটের ক্ষমতা মাইক্রোস্যাট-আরের চেয়েও অনেক বেশি।

ইসরোর চেয়ারম্যান কে সিভন জানিয়েছেন, হালকা, ফুরফুরে এমিস্যাট নজরদারি তো চালাবেই, এর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী। পৃথিবীর তিনটি পৃথক কক্ষপথে উপগ্রহগুলি স্থাপন করা হবে। এমন ধরনের উৎক্ষেপণ এই প্রথম করছে ইসরো।  এই মিশনের নাম তাই থ্রি-ইন-ওয়ান। তিনি জানিয়েছেন, প্রথমে ৭৬৩ কিলোমিটার কক্ষপথে স্থাপন করা হবে সেটি। পরে কক্ষপথের দূরত্ব কমিয়ে আনা হবে আরও ৫০৪ কিলোমিটার। আরও দু’টি উপগ্রহ বসার পর দূরত্ব কমবে আরও ৪৮৫ কিলোমিটার।

‘মিশন শক্তি’র সাফল্যের পর এমিস্যাটের উৎক্ষেপণের আগে আশঙ্কা

মিশন শক্তি

গত ২৭ মার্চ পৃথিবীর ৩০০ কিলোমিটার উপরের একটি কক্ষপথে থাকা নিজেদেরই ‘মাইক্রোস্যাট’ উপগ্রহকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ধ্বংস করেছেন ডিআরডিও-র বিজ্ঞানীরা। কৃত্রিম উপগ্রহ বিনাশকারী ওই ক্ষেপণাস্ত্রের নাম ASAT। ইসরোর বিজ্ঞানীদের বক্তব্য, ৩০০ কিলোমিটার উপরে বায়ুমণ্ডলের স্তর যেখানে অপেক্ষাকৃত কম গাঢ় সেখানে ‘মাইক্রোস্যাট’ উপগ্রহের ভেঙে পড়া টুকরোগুলি ছড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর অভিকর্ষ বলও সেখানে জোরালো নয়, অতএব উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষের ওই টুকরোগুলি অনন্ত কাল ধরে কক্ষপথেই ঘুরতে থাকবে উপগ্রহটির (মাইক্রোস্যাট) গতিবেগে। পিএসএলভি-সি-৪৫ রকেট বায়ুমণ্ডলের স্তর ভেদ করে যাওয়ার সময় এই টুকরোগুলি রকেটের পথে বাধা তৈরি করতে পারে। এমনকি উপগ্রহ সমেত পিএসএলভি-সি-৪৫ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন ইসরোর বিজ্ঞানীরা।

এই মুহূর্তে কী কী রয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার ঝুলিতে

ভারতীয় বায়ু সেনার হাতে থাকা অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও যুদ্ধ বিমানের নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভাবে সাহায্য করার জন্য ভারতের হাতে এই মুহূর্তে রয়েছে মোট ৪৭টি নয়া প্রযুক্তির উপগ্রহ। রাতের বেলা নজরদারির জন্য রিস্যাট-২, তা ছাড়া কারটোস্যাট-২ সিরিজের চারটি উপগ্রহের (২সি, ২ডি, ২ই, ২এফ)রয়েছে হাই-রেসোলিউশন প্যানক্রোম্যাটিক ক্যামেরা যা একবার ৯.৬ কিমি বিস্তৃত এলাকার সাদা-কালো ছবি তুলে পাঠাতে সক্ষম। যোগাযোগ রক্ষাকারী জিস্যাট-২৯ স্যাটেলাইট তো রয়েছেই।

এর আগে ভারতীয় নৌ বাহিনীকে সাহয্যের জন্য ২০১৩ সালে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল জিস্যাট-৭ স্যাটেলাইটটিকে। যাকে সেনা বাহিনীতে ‘রুক্মিনী’ নামেও ডাকা হয়ে থাকে। এই উপগ্রহটি ভারত মহাসাগরে বিভিন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে নৌ বাহিনীকে সাহায্য করেছে বলে জানা গিয়েছিল। ২০১৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার ফরাসি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে ভারতের সব থেকে শক্তিশালী কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বিগ বার্ড’। এই কৃত্রিম উপগ্রহের ওজন ৫,৮৫৪ কেজি। জি স্যাট-১১, যাকে বিজ্ঞানীরা ডাকছেন ‘বিগ বার্ড’ নামে, বানাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি  টাকা। ইসরোর বিজ্ঞানীদের দাবি, জি স্যাট -১১ হল পরবর্তী প্রজন্মের যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট। সারা ভারতে ব্রডব্যান্ড পরিষেবার উন্নতিতে এই স্যাটেলাইটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে। নতুন প্রজন্মের বিভিন্ন পরিষেবা এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাবে দেশের মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.