রাহুল গান্ধীর সংসদীয় জীবনের তথা পেশার ভূতাপেক্ষ বিশ্লেষণ : তিনি এক প্রতিশ্রুতিবান রাজনৈতিক বিকল্প নাকি রাজনীতির উত্তরাধিকারের ফল।

কোনো জ্ঞানী ব্যাক্তি বলেছেন ভারতের নির্বাচনের রাজনীতি এক বিচিত্র রঙ্গভূমি যেখানে আশা আকাঙ্ক্ষা ও ভাবনার নানা রঙ্গময়তা দেখা যায় তাই এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনও ব্যাতিক্রম নয় ।এখনও পর্যন্ত ভারতে নির্বাচন হয়েছে বংশবাদের সমীকরণ , জাতপাতগোষ্ঠী ভিত্তিক অথবা ক্ষেত্রীয় আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে।

ভারতের রাজনীতি স্বাধীনতার পর থেকেই ছিল বংশগত সমীকরণ ভিত্তিক এবং সেই সমীকরণে একমাত্র নাম ছিল গান্ধী নেহেরু পরিবার । বংশগত ভাবে নেহেরু গান্ধী পরিবার ভারতীয় রাজনীতিতে প্রচুর প্রভাব প্রতিপত্তিশালী স্বাধীনতার কিছু প্রাক্কাল থেকেই ।রাহুল গান্ধীর পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য প্রচুর কারণ তারই পরিবারের বহু ব্যাক্তিত্ব স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতীয় রাজনীতির শীর্ষে ছিল।

রাহুল গান্ধীর ব্যাপারে সবচেয়ে আশ্চর্য হল যে সে তার স্নাতোকত্তর জীবনে এক ম্যানেজমেন্ট কোম্পানীতে কাজ শুরু করেন এবং আজ তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে সেই পরিবারের প্রধান মুখ । কেউই তাকে তৃণমূল স্হরের নেতা মনে করেন না এবং তিনি একভাবে তার পরিবারের নামের প্রভাবে হঠাৎ করেই কংগ্রেস পার্টির শীর্ষ স্হান দখল করেন।

জহরলাল নেহেরু যিনি রাহুল গান্ধীর প্রমাতামহ তিনি ১৭ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী তথা স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী থেকেছেন। তার ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ও তার বাবা ভারতের যুবতম প্রধানমন্ত্রী। তার মা সোনিয়া গান্ধীও বকলমে National Advisory Council এর মাধ্যমে ১০ বছর সরকার চালিয়ে এসেছেন। কিন্তু রাহুল গান্ধীর ক্ষেত্রে তার রাজনীতিতে উত্তরণ অতি স্বল্প সময়ে। তার পদ বলতে কিছুসময়ের জন্যে যুব কংগ্রেসের নেতা ও ছাত্রসংসদের প্রধান এবং সেখান থেকে স্বল্পমেয়াদী অভিজ্ঞতা ও পরিবারের জোড়ে সিধা কংগ্রেস পার্টির সর্বোচ্চ পদাসীন।

সংসদে তার হাজিরার শতকরা হার মাত্র ৫২% যা জাতীয় গড় হাজিরার মান ৮০% এবং রাজ্যের বিধানসভায় গড় হাজিরার মান ৮৬% এর থেকে বহু দূরে।

তার সংসদীয় ক্ষেত্রে নাত্র ১৪ টি বিতর্কে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন যার জাতীয় গড় ৬৭ এবং রাজ্যের গড় ১১০ ।সংসদে তার জিজ্ঞাসা করা প্রশ্নের সংখ্যা ০ যার জাতীয় গড় ২৯৩ এবং রাজ্যের গড় ১৯৮।তার আনা ব্যাক্তিগত সদস্যতা বিলের সংখ্যা ০, যার জাতীয় গড় মান ২.৩ এবং রাজ্যের গড় মান ১.৮।

অথচ তার জমা করা স্বয়ং প্রদত্ত Affidavit এ নিম্নলিখিত বিবরণ পাওয়া যায়-

২০০৯ এ রাহুল গান্ধীর ব্যাক্তিগত সম্পত্তির পরিমান ২ কোটি এবং তার দেনার পরিমান ২৩ লাখ এবং ২০১৪ তে ৯ কোটি ও দেনার পরিমান ১৮ লাখ । রাহুল গান্ধী ২০১৪ থেকে ২০১৯ নাকি সমস্ত বাজেট অধিবেশনে সংসদে হাজির ছিলেন এবং তিনি শীতকালীন অধিবেশন ও মনসুন অধিবেশনেও হাজির ছিলেন সংসদে । তার সংসদে হাজিরার মান ৩৮% থেকে ৮১%।

রাহুল গান্ধী নাকি ১৪ টি সংসদীয় বিতর্কসভায় অংশগ্রহণ করেন । তিনি নাকি নারী শিশু রক্ষা থেকে Rafale সামরিক চুক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন করেছেন।

তার অংশগ্রহণ করা বিতর্কের বিষয়গুলি হল

  1. প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলের আক্রমণের ফলে সেখানকার শিশু ও মহিলার অবস্হার স্বপক্ষে সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া এবং কাদের কে ভারত সরকার সমর্থন করছেন তা স্পষ্ট করা ।
  2. কৃষির সমস্যা
  3. NET Nuetrality নিয়ে সরকারের TRAI এর উপরে সীমিত পদক্ষেপ নেওয়া এবং জনতার বিক্ষোভ সামলাতে কি কি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া ।
  4. কিষাণ মন্ডিতে ফসলের রক্ষণাবেক্ষণ এবং আসাদনের অব্যবস্হা ।
  5. RAFALE চুক্তি নিয়ে লোকসভাতে বিতর্ক
  6. দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে সরকারের সমালোচনা

এরমধ্যে Net Neutrality ও ইজরায়েলের আর প্যালেস্তাইনের যুদ্ধ জনিত কারণে শিশু ও মহিলাদের অবস্হা এই দুটি বিতর্কই সবচেয়ে বড় ছিল । রাহুল গান্ধীর কাছে বহু সুযোগ ছিল নিজেকে সাংসদ হিসাবে তথা রাজনৈতিক ভাবে নিজেকে প্রমাণ করা কিন্তু তার অসংসদীয় আচার ব্যবহার ও বিবেচনার মূলভূত অভাব তা হতে দেয়নি । অনাস্হা প্রস্তাব সংসদে চলাকালীন রাহুল গান্ধী কিছু অদ্ভুত ও অকল্পনীয় ভাবে তার বক্তব্য রাখেন যা হাসির উদ্রেক করে । তার সংসদে প্রধানমন্ত্রী মোদী কে জড়িয়ে ধরা এবং তারপর নিজ স্হানে ফিরে এসে চোখ মারার মত ঘটনা তার অভব্য অসংসদীয় আচরণের অন্যতম নিদর্শন । এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে তার অস্বাভাবিক শিশুসুলভ ও অসংলগ্ন আচরণ তাকে সোশ্যাল মিডিয়াতে এক হাসির পাত্রে রূপান্তরিত করে ।

রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক ও পারিবারিক ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং তিনি ভারতের বহুদিন ধরে চলে আসা গতানুগতিক রাজনীতির প্রতীক ।যদিও স্বল্প সংখ্যক কিছু উজ্জ্বল মূহুর্ত তার রাজনৈতিক জীবনে বিদ্যমান তবে তার রাজনৈতিক জীবন ও ব্যাক্তিত্ব কেবল তার পারিবারিক কারণে রাজনীতির শীর্ষ স্হান লাভকে প্রতিফলিত করে নাকি তার
ব্যাক্তিগত যোগ্যতার ভিত্তিতে অধিকার করা কোনো পদকে।

২০১৯ এর নির্বাচনের রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের প্রধান মুখ এবং তাদের নির্বচনী ইস্তাহারে বহু অর্বাচীনের মত অবিশ্বাস যোগ্য প্রতিশ্রুতিতে ভরা যা তারা দীর্ঘ কাল ক্ষমতায় থাকা কালীন বহুবার বলে এসেছেন কিন্তু কোনোদিনও তা বাস্তবায়িতে করতে পারেনি । কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরের মতে আজকের বৈদ্যুতিন যুগে দাড়িয়ে MNREGA এবং কিছু মান্ধাতা আমলের চিরাচরিত পরিকল্পনা ভবিষ্যতের ভারতের স্বপ্নপূরণ করতে সম্পূর্ণ অবান্তর ও বাস্তবযোগ্য নয়।

যদিও ভবিষ্যত প্রজন্মের নেতা হিসাবে রাহুল গান্ধী কে বংশবাদের বদান্যতায় এগিয়ে আনা হচ্ছে তাই প্রথম বারের ভোটদাতা ও যুবা ভোট দাতাদের ভালো করে বুঝে সঠিক নেতৃত্বের নির্বাচন করা দরকার ভারতকে জগতসভায় শ্রেষ্ঠতম আসন লাভ করানোর জন্য । যদিও বিরোধী জোটে প্রধানমন্ত্রী কে হবে এ নিয়ে এখনও সংশয় বিরাজমান তাই দেশের হাত শক্ত করতে দেশবাসীর সাবধানে ও বিবেচনার সাথে ভোট দেওয়া দরকার।

অভিজিৎ সেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.