পূর্ব অংশ

।।পঞ্চম অংশ।।

এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না,
শুধু সুখ চলে যায়।
এমনি মায়ার ছলনা।
এরা ভুলে যায়, কারে ছেড়ে কারে চায়।
তাই কেঁদে কাটে নিশি, তাই দহে প্রাণ,
তাই মান অভিমান,
তাই এত হায় হায়।

আমাকে বিদায় নিতে হবে আমাকে বিদায় নিতে হবে গুরুগৃহ হতে। আমাকে বিদায় নিতে হবে গুরুকন্যা হতে। আমাকে বিদায় নিতে হবে অসুর সমাজ হতে ।আমাকে বিদায় নিতে হবে ভালোবাসা হতে।

আমাকে আমার বিদ্যা শিক্ষা শেষ ।গুরু শুক্রাচার্যের কাছে আমি স্বর্গে ফিরে যাবার অনুমতি লাভ করেছি । আজ আমাকে বোধয় সব থেকে কঠিন কাজ করতে হবে। আমাকে নিষ্ঠুর হতে হবে। আমাকে দেখাতে হবে যে ,আমি ভালো বাসিনি। ভালোবাসার জন্য গুপ্তচর কচ নয়।

আমি চলে যাব।সেইদিন ভৈরবী প্রভাত আকাশ ছিল বিষন্ন। সারা প্রকৃতি কেমন  নিস্তব্ধ হয়ে ছিল। আমি স্নান আহ্নিক করে গুরুকে প্রনাম করলাম সাষ্টাঙ্গে।

গুরুগৃহের মহাকাল মহাদেব সেই স্থানে গিয়ে প্রনাম করলাম ” হে মহাদেব যে অন্যায় আমি করেছি ও করতে যাচ্ছি তা যেন আমার আত্মা হৃদয়কে সর্বদা দগদ্ধ করে।” 

 আশ্রম এ নির্জন প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন দেবযানী। সেই শুক্র কন্যা অসুর কুলজাত দেবযানী যাঁর রূপে ত্রিলোক আমোদিত , সেই দেবযানী যিনি আমার প্রথম প্রেম , প্রথম ভালোবাসা। এনাকে কি বলব? না কিছু বলব না। না বলে লুকিয়ে চলে যাব।

বিসৃষ্টয়ং করুনা কচম।

কিন্তু হায়। ঠিক প্রস্থানোদ্যত দেবযানী একছুটে এসে আমাকে ধরে ফেললেন। “কোথায় যাচ্ছ কুমার ?” একি তুমি এত কেন সুন্দর লাগছ দেবযানী। এককোন অজানা ফুলের সাজে সেজেছ। না তোমার দিকে দেখব না। কিছুতেই না। দেখলে নিজেকে স্থির রাখতে পারব না।

তাছাড়া আমি দেবযানীর চোখের দিকে চোখ দেব কেমন করে ? মাধবী লতায় ফুল ফুটেছে। সেই দিকে তাকিয়ে বললাম ” আমি ….আমি চলে যাচ্ছি ..আমার গুরুশিক্ষা সম্পূর্ণ। গুরু অনুমতি দিয়েছেন।”

দেহ আজ্ঞা, দেবযানী, দেবলোকে দাস
করিবে প্রয়াণ। আজি গুরুগৃহবাস
সমাপ্ত আমার। আশীর্বাদ করো মোরে
যে বিদ্যা শিখিনু তাহা চিরদিন ধরে
অন্তরে জাজ্বল্য থাকে উজ্জ্বল রতন,
সুমেরুশিখরশিরে সূর্যের মতন,
অক্ষয়কিরণ।

“তুমি চলে যাচ্ছ ! মানে স্বর্গে? আমি যাব তোমার সাথে । আমাকেও নিয়ে চল।”

“না…তা হয় না…”

“কেন হয়না কচ? আমার বংশ গৌরব কিছু কম নহে তোমা হতে।মহর্ষি অঙ্গিরার পুত্র তুমি। তোমার ব্যবহার , তোমার বিদ্যা, তোমার তপস্যা সবই তোমার অলংকার । – ভ্ৰাজসে বিদ্যয়া চৈব তপসা চ দমেন চ। “

দেবকুল বা অসুরকুল বা মানবলোক পন্ডিতগনের নিকট বিদ্যাবংশ অসীম গুরুত্বপূর্ন। ঔরসজাত পুত্র পরম্পরা থেকে বিদ্যা সম্বন্ধে প্রাপ্ত শিষ্যগনের মূল্য কিছু কম ছিল না।

দেবযানী বললেন , ” পিতা শুক্রাচার্য মহর্ষি অঙ্গিরার শিষ্য ছিলেন আর দেবগুরু বৃহস্পতি অঙ্গিরার পুত্র।  বললেন দেবজানি বললেন। মহর্ষি অঙ্গিরার যেমন আমার পিতার মাননীয় তেমনি বৃহস্পতি ও তেমনি আমার মাননীয় । – যথা মান্যশ্চ , পূজ্যশচ মম ভূয়ো বৃহস্পতি”…

আমি জানি দেবযানী কি বোঝাতে চাইলেন। “কিন্তু দেবযানী , আমি তোমার বংশ , কুল গৌরব নিয়ে কোনো কথা বলছি না। তোমার বংশ গৌরব বহু উচ্চ। কিন্তু এমুহূর্তে আর সম্ভব নয় তোমাকে গ্রহণ করা। “

দেবযানী বড় অবাক হলেন , ” তোমার মনে সঞ্জীবনীর বাসনা ছিল আমি উপলব্ধি করেছিলাম কচ কিন্তু আর কি কিছুই চাও না ?

মনোরথ পুরিয়াছে,

              পেয়েছ দুর্লভবিদ্যা আচার্যের কাছে,
সহস্রবর্ষের তব দুঃসাধ্যসাধনা
  সিদ্ধ আজি; আর কিছু নাহি কি কামনা
ভেবে দেখো মনে মনে। ”

আমি জানি দেবযানী , মৃত সঞ্জীবনীর থেকেও এখন তোমাকে চাই। কিন্তু মৃত সঞ্জীবনী লাভ যদিও দুর্লভ থেকে সুলভ করেছি, তবুও তুমি মৃত সঞ্জীবনীর থেকেও দুর্লভ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম “নাঃ আর কোনো কামনা, কোনো বাসনা নেই..”

” আজ তোমার বিদ্যালাভ শেষ । – স সমাবৃতবিদ্যঃ…

কিন্তু যেসব দিনে ব্রত নিয়মের কঠিন শৃংখলে নিজেকে তুমি বেঁধে রেখেছিলে, সেসব কঠোর সময় আমি তোমার সঙ্গ দিয়েছি । সে পরিচর্যার মধ্যে শুধুই কর্তব্যের অনুশাসন ছিল না, ছিল অনুরক্তি ভালোবাসা। তোমার বিদ্যা শিক্ষা মন্ত্র লাভ আজ শেষ হয়েছে বটে কিন্তু আমার ভালোবাসা একই রয়ে গেছে। আর আমি যখন তোমাকে ভালবাসি তখন তোমার উচিত আমাকে গ্রহণ করা। তুমি এখনো ভেবে বল কিছুই কি নেই তোমার চাওয়ার মত ?

 তবু আরবার দেখো চাহি
অবগাহি হৃদয়ের সীমান্ত অবধি
করহ সন্ধান— অন্তরের প্রান্তে যদি
কোনো বাঞ্ছা থাকে, কুশের অঙ্কুর-সম
ক্ষুদ্র দৃষ্টি-অগোচর, তবু তীক্ষ্ণতম।

” না সমুদ্রের গভীরে অতি মূল্যবান রত্ন বা শুক্তির মধ্যের মুক্ত যখন কেহ প্রাপ্ত করেন তখন তাঁর কি আর কিছুই চাওয়ার থাকে? আমি তাই পেয়েছি হে গুরুকন্যা। আজি পূর্ণ কৃতার্থ জীবন। কোনো ঠাঁই মোর মাঝে কোনো দৈন্য কোনো শূন্য নাই সুলক্ষণে।”

যাই যাই, ছেড়ে দাও—  স্রোতের মুখে ভেসে যাই।
যা হবার তা হবে আমার,  ভেসেছি তো ভেসে যাই॥
  ছিল যত সহিবার   সহেছি তো অনিবার—
এখন কিসের আশা আর।   ভেসেছি তো ভেসে যাই

আমি ক্ষত বিক্ষত। কি করে তোমাকে বোঝাব হে কন্যা? তোমাকে কেন প্রত্যাখ্যান করছি সে কেবল আমি জানি।

আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন কন্যা সেই মাধবী মল্লিকা কুঞ্জে । তাঁর অশ্রুসিক্ত নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ” তুমি কি সব  বিস্মৃত হলে কচ? সব …এই মাধবী মল্লিকা কুঞ্জ, এই অরন্য ভূমি , আর সেই গোধূলি সন্ধ্যা ? কচ আমি জানি স্বর্গে তোমার জন্য অসম্ভব সুখ , অতুল ঐশ্বর্য, অপরূপ সুন্দরী, যক্ষ , গ্ন্ধ্ধর্ব অপেক্ষা করছে । কিন্তু এই ঋষি কুটিরে যতটুকু ছিল তাই দিয়ে আমি তোমাকে আপ্যায়ন করেছি। তোমাকে সুখী করেছি। আজ আমার কি অপরাধ যে তুমি এই কাজ করছ?”

কি বলব আমি তোমাকে দেবযানী ? আমার নিকট ‘ আর যাহা আছে তাহা প্রকাশের  নয় ,সখী। ”  নিজেকে কঠিন করে স্মিত হাঁসলাম ,” এবার বিদায় দাও। আমি আসি। বৃথা মায়াতে আটকিও না।প্রসন্ন বিদায় আজি দিতে হবে দাসে।”

” হাসছ? কুমার , তুমি কেমনে ভুলবে এই সুন্দরী অরন্য ভূমি। যে তোমাকে আগলে রেখেছিল এত বর্ষ ধরে।

তরুরাজি ম্লান হয়ে আছে যেন, হেরো আজিকার
বনচ্ছায়া গাঢ়তর শোকে অন্ধকার,
কেঁদে ওঠে বায়ু, শুষ্ক পত্র ঝ’রে পড়ে,
তুমি শুধু চলে যাবে সহাস্য অধরে
নিশান্তের সুখস্বপ্নসম?

 কেমনে ভুলবে এই হোমধেনু কে যার অমৃত সমান দুগ্ধ পান করেছ ? কেমন করে ভুলবে সেই বেনুমতী নদীর তীর যেখানে আমরা শিব গড়ে বুনো ফুলে পুজো করতাম। বল না কেমন করে ভুলবে? দেবকুলজাত বলে কি তোমার হৃদয়ও নেই ?”

” কি বলছ দেবযানী ? এ অরন্য আমার মাতৃ সমান । এই অরন্য,  এই আরণ্যক প্রকৃতি এসব এই এত বৎসরের তপস্যার ফলে আমার শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। এই অরণ্যে আমি নব জন্ম লাভ করেছি। নিজের আরণ্যক মাতা কেমন করে ভুলব ?এর ‘পরে

নাহি মোর অনাদর, চিরপ্রীতিভরে

চিরদিন করিব স্মরণ ।

আর হোমধেনু টির কথা বলছ ?  তাঁর শান্ত , মাতৃসম রূপটি দেখলে পাপক্ষয় হয় । তার দুগ্ধ সুধার থেকেও সুধা ময়। গোচারনে যেতাম যখন তখন স্তব্ধ বেলায় বৃক্ষতলে সে যখন বসে বড় বড় চক্ষু মেলে দেখত তখন মনে হত সেই শান্ত বৃহৎ চক্ষু দিয়ে সেই সারা বিশ্ব পর্যবেক্ষন করে মনে রাখছে। কত বেলা এরম কেটে তার গায়ের উপর মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে গেছি। কেমন করে ভুলব ? আর কেমন করে ভুলব বেনুমতী নদী? বেণুমতী, কত কুসুমিত কুঞ্জ দিয়ে

মধুকণ্ঠে আনন্দিত কলগান নিয়ে
আসিছে শুশ্রূষা বহি গ্রাম্যবধূসম
সদা ক্ষিপ্রগতি, প্রবাসসঙ্গিনী মম
নিত্যশুভব্রতা।”

” তাহলে কি তার কারণ যে চলে যেতে চাও হে কুমার ? এই সেই বট বৃক্ষতল যেখানে তুমি গোচারনে এসে তপ ক্লিষ্ট ক্লান্ত দেহে , মধ্যাহ্নের খরতাপে  নিদ্রা যেতে । তখন এই সুপ্রাচীন তরু তার দীর্ঘ ছায়াখানি বিছিয়ে তোমাকে সুখ নিদ্রা দিত,   ঝর্ঝরপল্লবদলের বীজন করত মৃদুস্বরে। তুমি তো চলে যাবে ,যেয়ো সখা। কিছু কাল , কিছু মুহূর্ত , আরো কিছুক্ষণ সখা এই বৃক্ষছায়ায় বোস শেষবারের জন্য ।,

নিয়ে যাও সম্ভাষণ এ স্নেহছায়ার,
দুই দণ্ড থেকে যাও–সে বিলম্বে তব
স্বর্গের হবে না কোনো ক্ষতি।”

” বেশ বসলাম। ” আমি জানি কেন এমন করছ তুমি কন্যা…পলাতক প্রিয়তমকে বিদায় কালে এসকল বলে মায়ার বাঁধনে বাঁধতে চাইছ… নতুন নতুন বন্ধন জাল। মহামায়ার এই সংসারে তাঁর হাত হতে মুক্তি নাই। গুরুদেব পারেন নি। কিন্তু আমাকে আজ পারতেই হব। এ অন্তিম মিনতি , এ অপূর্ব সৌন্দর্য রাশি আজ যদি আমার চিত্ত বিগলিত করে তবে দেব সমাজে সঞ্জীবনী অধরা থেকে যাবে। বৃক্ষতলে তৃনাসনে বসে বললাম, ” দেবযানী, এই সব বনস্পতি ও অরন্যের প্রতি প্রাণী কে আমি আমার প্রনাম জানাই। এনারা কেবল আমার নয় , সকল আশ্রিত জনের বন্ধু। কিন্তু দেবযানী , আমি শেষ নয়। এরপরেও কত ক্লান্ত পথিক এই তরুবিথীছায়ায় বসবেন,  গুরু শুক্রের আশ্রমে কত নব নব ছোট ছোট ঋষি বালক , কত ছাত্র এই আরণ্যক ছায়ায় পক্ষীর গুঞ্জনে, বীজন মর্মর ধ্বনি মাঝে, ঝিল্লির রবে অধ্যয়ন করবেন, গোচারন করবেন, গান গাইবেন, বাঁশি বাজাবেন। কত দুরন্ত ঋষি বালক স্নানের পর এই বৃক্ষগুলির ডালে নিজেদের ব্ল্ক শুকাবেন, ফল কুড়বেন, ফুল তুলবেন, খেলা করবেন। তারিমাঝে তোমার এই পুরাতন সখার স্মৃতি মনে রেখ।”

দেবযানী আকুল কন্ঠে বললেন, ” এই একাকী প্রবাসে আমি তোমার এক মাত্র সঙ্গী ছিলাম। তোমার সুখে দুঃখে আমি তোমার পাশে ছিলাম। অসুর কুল বার বার তোমার নবীন দেহে আঘাত হেনেছে, ইর্ষা কাতর হয়ে তোমার প্রাণ কেড়েছে …আমি তখন অনুরোধ করছি পিতাকে। আমার অনুরোধের ফল আজ তোমার এই সঞ্জীবনী প্রাপ্তি। “

 ” হে গুরু কন্যা –

চিরজীবনের সনে

তাঁর নাম গাঁথা হয়ে গেছে।……ঈর্ষাভরে তিনবার দৈত্যগণ মোরে

করিয়াছে বধ, তুমি দেবী দয়া করে
ফিরায়ে দিয়েছ মোর প্রাণ, সেই কথা
হৃদয়ে জাগায়ে রবে চিরকৃতজ্ঞতা।”
হৃদয় মোর কোমল অতি,   সহিতে নারি রবির জ্যোতি,
লাগিলে আলো শরমে ভয়ে   মরিয়া যাই মরমে॥
ভ্রমর মোর বসিলে পাশে    তরাসে আঁখি মুদিয়া আসে,
ভূতলে ঝ’রে পড়িতে চাহি    আকুল হয়ে শরমে॥
কোমল দেহে লাগিলে বায়    পাপড়ি মোর খসিয়া যায়,
পাতার মাঝে ঢাকিয়া দেহ   রয়েছি তাই লুকায়ে।
আঁধার বনে রূপের হাসি    ঢালিব সদা সুরভিরাশি,
আঁধার এই বনের কোলে  মরিব শেষে শুকায়ে॥

যন্ত্রনা মিশ্রিত কন্ঠে দেবযানী বললেন , ” আমি তোমার কাছে সে সব কর্মের নিমিত্ত কৃতজ্ঞতা চাই নি কুমার। তুমি তোর আপনার …নিজের প্রিয়জনের নিকট কেউ কি এসব চায়? আমাকে ভুলে যেও না হয়। কিন্তু হে বৃহস্পতি পুত্র তুমি সেই সব সুখ স্মৃতি ভুলে যাবে কেমন করে?”

আমি জানি দেবযানী তোমার কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমি অপারক। ” কোন স্মৃতি দেবযানী?”

” সেই যে ভৈরবী অরুণ আলোয় প্রভাত পূজার পরে চন্দন চর্চিত তুমি আমাকে দেখেছিলে?”

“কেমনে ভুলব দেবযানী? সেদিন সদ্য স্নাতা তুমি গঙ্গার মত পবিত্র লাগছিলে। আমাকে অবাক করে স্বর্গের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলে। দুজেন ফুল কুড়িয়েছিলাম বকুলের তলায়..”

” সেই যে তুমি নৃত্য করেছিলে কুমার। আমি বাজিয়েছিলাম রুদ্র বীণা। সেই  আনন্দ গীতি কি একবারের জন্যও তোমার অন্তরে বাজে নি? প্রতি সন্ধ্যায় অধ্যয়নের পরে গোচরনের সময় তুমি যে পুষ্প আলাদা করে আমার নিমিত্ত সংগ্রহ করতে তাই দিয়ে আমার শৃঙ্গার করতে..ভুলে গেলে সেই সুখ সন্ধ্যা? “

” কেমন করে ভুলব কন্যা? সেই গোধূলি বেলা বড় মায়াময়…”

” সেই যে প্রবল নীলঘন শ্যামল বর্ষায় তুমি ,আমি আর সুগন্ধিত বেনুমতীর তীর…অবিরল বৃষ্টিজলধারে

কর্মহীন দিনে সঘনকল্পনাভারে

পীড়িত হৃদয়–এসেছিল কতদিন….এটুকু মনে রাখবে কুমার?”

নিরুত্তর আমার চোখে চোখ রাখে দেবযানী। ” মনে রেখ সে বসন্ত সন্ধ্যা। সেই অপূর্ব পুলকরাশি, ফুলের সৌরভের ন্যায় হৃদয় উচ্ছ্বাস। সেই কত জ্যোৎস্না রাত্রি , সেই মল্লিকা মাধবীর কুঞ্জ , ব্যাপ্ত সায়াহ্ন আকাশ, অমানিশা রাত্রি , সেই  পুষ্পের সৌরভের ন্যায় দুইটিতে মিশে যাওয়া মনে রেখ কচ …এত নিষ্ঠুর হয়েও না।

হেন মুগ্ধরাত্রি, হেন হৃদয়ের খেলা,
হেন সুখ, হেন মুখ দেয় নাই দেখা
যাহা মনে আঁকা রবে চিরচিত্ররেখা
চিররাত্রি চিরদিন? শুধু উপকার!
শোভা নহে, প্রীতি নহে, কিছু নহে আর?”

” হে দেবযানী , হে সুচিস্মিতা, আমার হৃদয়ে গোপন গহীন দ্বারে যে রক্তক্ষরণ হয় , তা তোমাকে কেমন করে দেখাই?”

” তোমার হৃদয় , তোমার যন্ত্রনা আমি ছাড়া আর কোনো দেবী , কোনো যক্ষী,  কোনো অপ্সরা বা গান্ধর্বির বোঝার ক্ষমতা নেই। কেন চলে যাচ্ছ তবে? হেথায় থেকে যাও। বেনুমতীর তীরে গৃহ সৃজন করে বনের ফল , ঝর্ণার জল খেয়ে দুইজনে কাটিয়ে দেব জীবন। সেখানেই হবে মোদের দুটির মিলিত স্বর্গ। যেও না সখা। “

” না কন্যা। তোমাকে কত বার বলেছি তা হয় না…এত বর্ষ কেবল আমি ত্যাগ করেছি সঞ্জীবনীর নিমিত্ত।”

” তবে তুমি আমাকে মিথ্যা প্রবঞ্চনা করলে কচ? আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে তা করনি। বিশ্বাস ভাঙতে পারনা তুমি সখা। প্রেম যে করে সে অন্তর্যামী হয়। তোমার নৃত্যে, তোমার বাদ্যে , তোমার আহ্বানে, তোমার স্পর্শে আমি প্রতি মুহূর্তে কম্পিত হয়েছি কচ। তেমনি তুমিও সমভাবে কম্পিত ছিলে। আমি জানি কচ। তুমি আমার হৃদয়ের বন্দী। এই বন্ধন কাটে এমন সাধ্য ইন্দ্রেরও নেই। আমার পানিগ্রহন কর। পিতার কাছে আমাকে বর চাও সখা । – গৃহান পানিং বিধিবন্মম মন্ত্রপুরস্কৃতম।”

 ” না ।তোমাকে বিবাহ করা যায় না। গুরুদেবের নিকট আমি বিদ্যা লাভের নিমিত্ত এসেছিলাম। এটা হতে পারে না। এই দৈত্যপুরে আমি বিদ্যার জন্য করেছি এত জপ।”

” কেন কচ নারীর নিমিত্ত কেউ তপস্যা করেনি?
পত্নীবর মাগি
করেন নি সম্বরণ তপতীর আশে
প্রখর সূর্যের পানে তাকায়ে আকাশে
অনাহারে কঠোর সাধনা কত? হায়,
বিদ্যাই দুর্লভ শুধু, প্রেম কি হেথায়
এতই সুলভ? ”

” তোমার পিতা যেমন আমার পূজনীয় ব্যক্তি । তেমন তুমিও তাই মহাত্মা শুক্রাচার্য নিজের প্রাণের চেয়েও প্রিয় । সেকথা ভুল না কন্যা।  তুমি গুরু কন্যা , আর সেই ঘটনার পর তোমাকে বিবাহ আমার সম্ভব নয়।  – দেবযানী তথৈব  ত্বয়ং নৈবং মাং বকতুমর্হসি।”

 “কচ । তবে শোনো অসুরা যখন বারবার তোমায় মেরে ফেলেছে ,তখন আমি পিতার কাছে যে প্রাণ ভিক্ষা করে তোমাকে বাঁচিয়ে তুলেছিলাম তার অন্যতম কারণ ছিল তোমাকে আমি ভালোবেসে ছিলাম ।আজ সেই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ অন্তত সেই কথাগুলো স্মরণ করো। – তদা প্রভৃতি যা প্রীতিস্তায়ং ত্বমদ্য স্মরস্ব মে… গুরু- গুরুকন্যামহর্ষি অঙ্গিরার বিদ্যাবংশ সম্বন্ধ – এসব কূট তর্কের এখন আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই ।অনুরাগ যদি থাকে তবে বিবাহে পরিণতির জন্য সেই যথেষ্ট ।ভালোবাসা কাঙালকে তুমি এভাবে ছেড়ে চলে যেতে পারো না কচ।”

“কিন্তু দেবযানী যে কাজ আমার করা উচিত নয় , তুমি সেই কাজ আমাকে দিয়ে জোর করে করাতে চাইছ কেন? আমি বললাম না, তুমি আমার গুরুর মত । আর যদি আমি শুক্রাচার্যের সঙ্গে শিষ্য সম্বন্ধ টাই বড় করে দেখি তাহলে তো অন্য কিছু হয়ে যায়। “

আমি বড় কঠিন হয়ে গেছি। এমনও ব্যবহার করা তার সাথে উচিত নয়। বললাম , “শোন ,দেবযানী আমি এখানে খুব ভালো ছিলাম। কোন দৈন্য, কোন কষ্ট আমাকে স্পর্শ করেনি ।তোমার কাছ থেকে আজ আমি যাবার অনুমতি চাই  । যাবার পথ নির্বিঘ্ন হয় , সে মঙ্গলটুকু তুমি কামনা করো আজ। গুরু শুক্রাচার্য বা আর কারো সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যদি আমার কথা আসে তাহলে স্মরণ করো আমাকে স্মর্তব্যো’স্মি কথান্তরে।গুরু শুক্রাচার্য তোমার পিতা। তার পরিচর্যা করো যথাসম্ভব ।”

আমি জানি আমার এই কথার মধ্যে প্রেমের পরিপাটি যতটুকু আছে ,তার চেয়ে বেশি আছে সান্তনা। প্রত্যাখ্যানের পরবর্তী মধুর বাক্য। 

“কিন্তু কেন ? আমার পাণি গ্রহণ করা সম্ভব নয় ? তাহলে তুমি এতদিন কেন বলনি ? “

“দেবযানী তুমি জানো যে  আমাকে তৃতীয়বারও যখন অসুরগণ হত্যা করে , পুড়িয়ে সেই ছাই সোমরসের সঙ্গে মিশিয়ে গুরুকে পান করাল,  তখন আমি গুরুর উদরে প্রবেশ করেছিলাম এবং এরপরে তিনি আমাকে সঞ্জীবনী মন্ত্র দ্বারা উজ্জীবিত করে তুলেছিলেন । কিন্তু উদর থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায় ছিল গুরুদেবের মৃত্যু। তোমার পিতা তার সঞ্জীবনী মন্ত্র আমাকে দান করে নিজের দেহ ত্যাগ করেছিলেন। আর আমি তোমার পিতার উদর হতে বেরিয়ে এসে তোমার পিতা কে প্রাণ দান করেছিলাম । আমি কথা দিয়েছিলাম তোমার পিতাকে যে আমার দ্বারা তার কোন ক্ষতি হবে না বা আমি তার সঙ্গে কোনো অন্যায় আচরণ করব না ।সে দিক থেকে দেখতে গেলে ওই ঘটনার পর তুমি আমার ভগিনী হলে। কাজেই তোমাকে কিভাবে আমি বিবাহ করবো ?”

ক্রোধে জ্বলে উঠলেন দেবযানী …”তুমি যখন আমার প্রেম আমার বিবাহের প্রস্তাব এভাবে প্রত্যাখ্যান করলে তখন আমি অভিশাপ দিলাম তোমার নবলব্ধ সঞ্জীবনী বিদ্যা কোন দিন সফল হবে না।

সে মালা নিলে না গলে, পরম হেলায়
সেই সূক্ষ্ম সূত্রখানি দুই ভাগ করে
ছিঁড়ে দিয়ে গেলে। লুটাইল ধূলি-’পরে
এ প্রাণের সমস্ত মহিমা। তোমা-’পরে
এই মোর অভিশাপ— যে বিদ্যার তরে
মোরে কর অবহেলা, সে বিদ্যা তোমার
সম্পূর্ণ হবে না বশ— তুমি শুধু তার
ভারবাহী হয়ে রবে, করিবে না ভোগ;
শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়োগ।

“আমি জানি তুমি খুব ক্রুদ্ধ হয়ে আমাকে এমন অভিশাপ দিলে। আমি তোমাকে ধর্মের কথা বলেছিলাম। কেন তোমায় বিবাহ করতে পারব না তার কারণ ও আমি তোমায় বলেছিলাম।  তুমি ধর্মের কথা না শুনলেনা কেবল মত্ত হয়ে আমায় অভিশাপ দিলে। বেশ আমি তোমায় তাহলে অভিশাপ দেব না দেবী। আমি তোমায় বর দিচ্ছি- ‘তুমি সুখী হবে ।সব গ্লানি ভুলে যাবে বিপুল গৌরবে’… কিন্তু তুমি যা চেয়েছিলে, তা কখনও হবেনা। তুমি সুখী হবে কিন্তু কোনো ঋষি পুত্রের সঙ্গে তোমার কোন দিন বিবাহ হবে না । ঋষির সঙ্গে বিবাহ হলে তোমাকে ত্যাগ করতে হবে। তুমি তো ত্যাগ করতে পারো না ।  তুমি বিপুল গৌরবে রাজত্ব করবে । “

ভাঙা পথের রাঙা ধুলোর দিকে এই বলে আমি মুখ ফিরিয়ে গমনে উদ্যত হলাম । তারপর অকসাৎ ক্ষনিকের তরে দাঁড়িয়ে বললাম , ” দেবযানী ,আমার বিদ্যা ফলবে না তাতে আমার কিছু যায় আসে না ।আমি কোন মৃত দেহে প্রাণ সঞ্চার করতে চাই না বা পারবো না। কিন্তু তাতে আমার বিদ্যা নষ্ট হয়নি ।আমি যাকে বিদ্যা শেখাবো সে আমার হয়ে হাজারটা মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করবে। তার বিদ্যা ফলবে । – অধ্যাপয়িস্যামি তু যয়ং তস্য বিদ্যা ফলিষ্যতি।”

আমি অভিশাপ লাভ করে, শাপেবর দিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বর্গে গিয়ে পৌঁছলাম।  স্বাগত জানানোর জন্য স্বর্গের বিশাল আয়োজন । ইন্দ্র অন্য দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আমাকে অভ্যর্থনা জন্য স্বর্গ সভায় উপস্থিত। আর এদিকে আমি সত্যিই দেবযানীকে ভালোবেসেছিলাম ।  কিন্তু সত্যিই বিশেষ কিছু কারণে তাকে গ্রহণ করা আর আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

প্রত্যাখ্যানের পর, লজ্জিতা দেবযানী একাকিনী শুক্রাচার্যের আশ্রমে পড়ে রইলেন। তার জন্য আর কেউ ফুল তুলে আনে না । কেউ তার অবসর সময় পূর্ণ করে তোলে না নৃত্য গীত বাদ্যে। দেবযানী অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন। তিনি অসুর গুরু শুক্রাচার্য কন্যা ছিলেন ।সর্বোপরি তিনি সব থেকে আলাদা ছিলেন । এসব উগ্র অনুভূতি দেবযানীর মনকে ব্যাপ্ত করে রাখত।  তা আমি উপলব্ধি করেছি । দেবযানি হয়তো উপলব্ধি করেন নি প্রেমের রাজ্যে মনের সরসতার বড় প্রয়জনীয় । দেবযানি শুক্রাচার্য আশ্রমে পুনরায় একাকীত্ব অবসরের জীবন কাটাতে লাগলেন বটে, কিন্তু সাময়িক ভাবে আমার কাছে প্রেম নিবেদনের দীনতা ছাড়া তার একাকিত্বের সঙ্গী হলো তাঁর অহংকার। একান্ত স্ব আরোপিত এক মর্যাদাবোধ ।যা নিজের মনের মধ্যে যতই কাউকে বড় করে তুলুক , তা শান্তি দেয় না সরতা দেয় না। সেই কারণে দেবযানী  যখন নহুস পুত্র মহারাজ যযাতিকে বিবাহ করতে চেয়েছিলেন , তখন তাঁকে তিনি ঋষি বলে উল্লেখ করেছিলেন পিতার সামনে।  অবশ্যই মহারাজ সমস্ত শিক্ষা বেদ শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন।  কিন্তু যেহেতু আমি অভিশাপ দিয়ে ছিলাম , যে দেবযানী কোন দিন কোন ঋষির পাণি গ্রহণ করতে পারবেন না ,হয়তো সেই আমার অভিশাপকে পরোক্ষভাবে ভুল প্রমাণ করার জন্য মহারাজকে ঋষি বলে অভিহিত করেছিলেন….

সেই যদি সেই যদি      ভাঙিল এ পোড়া হৃদি,

            সেই যদি ছাড়াছাড়ি হল দুজনায়,

        একবার এসো কাছে—   কী তাহাতে দোষ আছে।

            জন্মশোধ দেখে নিয়ে লইব বিদায়।

            সেই গান একবার গাও সখী, শুনি—

        যেই গান একসনে           গাইতাম দুইজনে,

            গাইতে গাইতে শেষে পোহাত যামিনী।

        চলিনু চলিনু তবে—      এ জন্মে কি দেখা হবে।

            এ জন্মের সুখ তবে হল অবসান॥

        তবে, সখী, এসো কাছে।  কী তাহাতে দোষ আছে।

            আরবার গাও, সখী, পুরানো সে গান॥

।।সমাপ্ত।।

দুর্গেশনন্দিনী 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.