তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন থেকে চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের মধ্যে এই পাঁচ বছর একেবারে ঘটনাবহুল অধ্যায়৷ অনেক কিছু ঘটে গিয়েছিল তখন এই দেশে৷ ওই সময় যেমন একদিকে বিদেশি আক্রমণ সামলাতে হয়েছে তেমনই আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারতকে প্রতিকূলতা সন্মুখীন হতে হয়েছে ৷

এই ১৯৬২-৬৭ সময় কালেই চিন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দুটি যুদ্ধের ভার বইতে হয়েছিল ভারতবর্ষকে ৷ তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনের কিছুদিনের মধ্যেই চিন ভারত আক্রমণ করলে তা মোকাবিলা করতে সরকার এক প্রকার ব্যর্থ হয়৷ আর এই ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কংগ্রেস দলে ভাঙনের সূচনা হয়েছিল ৷ তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে৷ অন্যদিকে এই চিনের সঙ্গে যুদ্ধ ঘিরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে ( সিপিআই) ভাঙন দেখা দেয়৷ দলের জাতীয়তাবাদীরা সিপিআই-তে থাকলেও চিনপন্থীরা সিপিআইএম নামে নতুন দল গঠন করে৷

দেখা যায়, ঠিক চতুর্থ নির্বাচনের আগে ১৯৬৭তে ভারতের অর্থনৈতিক বিকাশরের হার অনেকটাই নেমে যায়।যেখানে তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৬১-৬৬) বার্ষিক বিকাশর লক্ষ্য রাখা হয়েছিল ৫.৬%, সেখানে প্রকৃত বিকাশর হার ছিল মাত্র ২.৪%। ১৯৬২র ভারত-চিন যুদ্ধে অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

বিশেষত চিনের সঙ্গে যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে হয়েছিল ফলে তখন অর্থমন্ত্রী মোরারজী দেশাইকে স্বর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিধি, ভারতরক্ষা আইন ইত্যাদি চালু করতে হয়েছিল৷ স্বর্ণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৪ ক্যারাটের বেশি কোনও সোনার গহনা করা নিষিদ্ধি করা হয়৷ অন্যদিকে বিনা মজুরিতে শ্রমিক কর্মচারিদের অরিরিক্ত কাজ করানো তাদের উপর করের বোঝা চাপান হয়৷ আবার ওই সময় কালোবাজারির মাধ্যমে একদল অতিরিক্ত মুনাফা করতে থাকে৷ ফলে সেই সময় নানা কারণে সরকারের প্রতি একটা ক্ষোভ বাড়ছিল৷

যদিও আবার ১৯৬৫র ভারত-পাক যুদ্ধের ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এই সময়কালেই দুই প্রধানমন্ত্রী নেহরু ও শাস্ত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। শাস্ত্রীর মৃত্যুর পরে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের নেতৃত্ব ভার পেলেও এক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোরারজী দেশাইর সঙ্গে মনোমানিল্য শুরু হয়ে গিয়েছে৷

তবে এই পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে চতুর্থ সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৬৭ সালের ১৭ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ৷ সেবার ৫২০টি আসনের জন্য ভারতের ২৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চল থেকে প্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়েছিল। নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ৫৪% আসন লাভ করে চতুর্থবারের জন্য ক্ষমতায় এসে তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ঠিকই৷ কিন্তু আসন সংখ্যা অনেকটাই কমে গিয়েছিল ৷ এই নির্বাচনে কংগ্রেস পায় ২৮৩টি আসন যা গত নির্বাচনে পাওয়া আসনের থেকে ৭৮টি কম৷

জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে আগের তিনটি লোকসভার নির্বাচনে কংগ্রেসের ফলের তুলনায় এই নির্বাচনের ফল লক্ষণীয়ভাবে খারাপ হয়েছিল। তখন কংগ্রেসের ক্রমহ্রাসমান জনপ্রিয়তা লোকসভার পাশাপাশি সেই সময় হওয়া বিধানসভা নির্বাচনেও প্রতিফলিত হয়েছিল৷ কারণ ১৯৬৭ সালে হওয়া বিধানসভায় কংগ্রেস ৬টি রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ হারায়৷ বিভিন্ন রাজ্য আঞ্চলিক দলগুলির উত্থান এই সময় হতে দেখা যায়৷

ওই নির্বাচনে কমিউনিস্টরা দুই গোষ্ঠী সিপিআই এবং সিপিআইএম ভাগ হওয়ায় দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের স্থানটি ধরে রাখতে পারেনি৷ বরং রাজাগোপালাচারির নেতৃত্বাধীন স্বতন্ত্র পার্টির বড় রকম উত্থান লক্ষ্য করা যায়৷ ১৯৬৭ সালের লোকসভা ভোটে স্বতন্ত্র পার্টি দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হয় ৪৪টি আসন পেয়ে যেখানে আগের নির্বাচনে ঝুলিতে ছিল ১৮টি আসন৷ সেবার জনসংঘও আগের তুলনায় ভাল ফল করে পায় ৩৫টি আসন৷ অন্যদিকে সিপিআই ২৩টি এবং সিপিএম ১৯টি আসন পেয়েছিল৷

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

তথ্য ঋণ
১ভারতের নির্বাচন ও রাজনীতি ( নেহরু থেকে নরসিমা)
২.Wikipedia

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.