অগ্নিযুগের বীর বাঙালি বিপ্লবীর নেতৃত্বে ৭৩ জন বাঙালি হিন্দুর জালালাবাদ পাহাড়ে লড়াইয়ের ইতিহাস

মাস্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী তৎপরতা তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ৪ বছর।

আজ বীর বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেনের ১২৫তম শুভ জন্মদিন,জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে বলি ” বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক ” মাস্টার সূর্যসেন লহ প্রণাম।

১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল থেকে ১৯৩৪ সালের ১২ ই জানুয়ারি মাস্টারদার ফাঁসিতে আত্মবলিদান পর্যন্ত। এর মধ্যে প্রথম অভিযান শুরু থেকে ১৮-২২ শে এপ্রিল জালালাবাদ যুদ্ধ পর্যন্ত চার দিন চট্টগ্রাম কার্যত স্বাধীন এবং ব্রিটিশ শাসন থেকে কার্যত মুক্ত ছিল। এই সংগ্রামে মোট ৭৩ জন বিপ্লবী অংশগ্রহণ করেছিল। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ইস্টার্ন রাইফেল বাহিনী এবং পদাতিক বাহিনীর বাছাই করা ৭ শতাধিক ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে ৫২ জন তরুণ দেশপ্রেমিক trun.বিপ্লবী জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে শত্রু পক্ষকে নাকানিচুবানি খাইয়েছিল। ১২ জন সহযোদ্ধার আত্মহুতি এবং পর্যপ্ত অস্ত্র ও রসদের অভাবে অবশিষ্ট বিপ্লবীদের আত্মগোপনে চলে যেতে হয়েছিল। ২২ শে এপ্রিল জালালাবাদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাস্টারদা সর্বাধিনায়ক ছিলেন ৫২ জনের নাম দিলামনা তাঁর জন্য দুঃখিত পোস্টটা অনেক বড় হয়ে যেত । যে ১২ জন শহীদ হয়েছিল তাঁদের নাম —হরিগোপাল বল , নির্মল লালা , প্রভাস বল , অর্ধেন্দু দস্তিদার , পুলিন ঘোষ , মধুসূদন দত্ত , জিতেন দাশগুপ্ত , নরেশ রায় , বিধু ভট্টাচার্য্য , ত্রিপুরা সেন, মতিলাল কানুনগো , শশাঙ্ক দত্ত । অর্ধেন্দু দস্তিদার হাসপাতালে মারা যান আর ১১ জন সরাসরি লড়াইতে মারা যায়। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে এই ৭৩ জনের মধ্যে কোন মুসলিম ছিলনা তবে অনেকেই বলে এই যুদ্ধে ৬৩ জন এস সরকারি ভাবে বলে ৫৬ জন অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনীর প্রায় ৮০ জন এই যুদ্ধে নিহত হয় বলে জানা যায় । উল্লেখ্য জালালাবাদ যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন বিপ্লবী লোকনাথ বল ।


জালালাবাদ পাহাড়ের সেনা অভিযান এবং সেনাবাহিনীর বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি বুঝতে পেরেও বিপ্লবীরা বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণের কথা ভাবেনি । বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ের ভারতের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তৎকালীন ভারত সচিব স্যার স্যামুয়েল হোর বলেছিলেন , ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন জোয়ারের সূচনা হয়েছে ১৯৩০সালের চট্টগ্রাম বিদ্রোহের সময় থেকে। প্রায় ৪ বছর ধরে তাঁরা এক জায়গা থেকে আর এক জয়গায় সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে গেছেন। এর মধ্যে ১৯৩০ সালের ৬ ই মে চট্টগ্রামের পটিয়ার কালারপুল ,১৯৩২সালের ১৩ ই জুন ধলঘাট,৩৩ সালে ১৫ই ফেব্রুয়ারি গৈড়লা, বরমা,৩৩ সালে ১৮ই মে রাউজানের গহিরা প্রভৃতি এলকায় ব্রিটিশ সৈন্য ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে অনেক বিপ্লবী যোদ্ধা আত্মহুতি দিয়েছেন। ইতিহাসবিদ ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে ‘ চট্টগ্রামে তিনদিনব্যাপী স্বাধীনতা প্রতিষ্টায় ভারতের অনুরূপ প্রেরণা যোগাইয়াছিল।
মাস্টারদার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে যুব বিদ্রোহ সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জল বিদ্রোহ হিসাবে চিহ্নিত করা যায় । মাস্টার দা তাঁর সহযোগীদের প্রায় ৪ বছরের পরিকল্পনা , শ্রম ও ত্যাগের ফল এই বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছিল। পুলিশের অস্ত্রাগার লুঠ , জালালাবাদ পাহাড় ও কালারপুল যুদ্ধ ,ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণসহ বিভিন্ন যুদ্ধে কারাগারে নির্যাতন ফাঁসিতে মারা গিয়েছেন অনেকে।


বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরী বলেন ‘ আমরা মাস্টার দার নেতৃত্বে লুঠ করতে নয়, স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বৃটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়েছিলাম।
১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারী মধ্যরাতে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসী কার্যকর হবার কথা উল্লেখ করা হয়। সূর্য সেন কে এবং তারকেশ্বর দস্তিদারকে ব্রিটিশ সেনারা নির্মম ভাবে অত্যাচার করে। ব্রিটিশরা হাতুরী দিয়ে তাঁর দাঁত ভেঙ্গে দেয় এবং তাঁর হাড় ও ভেঙ্গে দেয়। হাতুরী দিয়ে নির্মম ভাবে পিটিয়ে অত্যাচার করা হয়। এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের লাশ আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি এবং হিন্দু সংস্কার অনুযায়ী পোড়ানো হয়নি। ফাঁসীর পর লাশদুটো জেলখানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে ব্রিটিশ ক্রুজার “The Renown” এ তুলে নিয়ে বুকে লোহার টুকরো বেঁধে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরের সংলগ্ন একটা জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।

সৌমেন ভৌমিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.