যুদ্ধ। যুদ্ধের খিদে অতোষণীয়, অণিবারণীয়, অপ্রশমনীয়। সদা অতৃপ্তি তার। মানুষ চাই। মানুষ মারার মানুষ। দশাশই, ঘাড়েগর্দানে শক্তপোক্ত মানুষ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী দৈত্য ভারতকে শুষে ছিবড়ে করে দিচ্ছে তখন। অধীনস্থ পদানত প্রজাকুলের পাতের আহারে নজর পড়েছে রাজার। জাহাজ ভর্তি রসদ ইওরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে নিয়মিত। এই রসদের একটি অংশ ভারতীয় সৈন্য। সৈন্য হিসেবে ব্রিটিশদের প্রথম পছন্দ ছিল পাঞ্জাব প্রদেশের মানুষ। শিখ, জাঠ, পাঞ্জাবি মুসলিম, হিন্দু।

জোর করে, ভয় দেখিয়ে পাঞ্জাবি তরুনদের সেনাবাহিনীতে ঢুকিয়েছে ব্রিটিশরা সেসময়। অনেকেই গ্রাম ছেড়ে সেই যে গেছেন, আর ফেরেননি কোনওদিন। যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে কত মায়ের কোল যে খালি হয়েছে, কত বাগদত্তার হৃদয় পাথর হয়েছে চিরতরে তার খবর আর কে রাখে! তার সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপাতির অগ্নিমূল্য। যুদ্ধ পরবর্তী পাঞ্জাব তখন রীতিমতো ফুঁসছে।

অভিজ্ঞ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশপ্রভুরা জানত, জমতে থাকা ক্ষোভের বারুদে আগুনের ফুলকি কেউ না কেউ ছোঁয়াবে। ছোঁয়াবেই। সশস্ত্র বিপ্লবের মোড়কে রাজদ্রোহ অবশ্যম্ভাবী তারা জানত। বহুপরীক্ষিত অনিবার্য টোটকার প্রয়োগে তাই বিলম্ব করেনি তারা। চটজলদি রাওলাট আইন পাশ করিয়ে নেয় তারা ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে, সমস্ত ভারতীয় সদস্যের সর্বাত্মক বাধা উপেক্ষা করে। মদন মোহন মালব্য, এম এ জিন্নাহ্, মাজারুল হক কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন তৎক্ষনাৎ। তাতে কিই বা আসে যায়!

ঐ কালা আইনটিকে বোঝাতে দেশীয় লোকেরা তখন মজার ছলেই বোধকরি বলত, “না আপিল, না দলিল, না উকিল”। অর্থাৎ কিনা এই আইনে সরকার যাকে ইচ্ছে যখন ইচ্ছে ওয়ারান্ট ছাড়াই কয়েদ করতে পারে, যে কারও বাড়িতে তদন্তের নামে যখন খুশি খানাতল্লাশি চালাতে পারে, যাকে ইচ্ছে ধরে বিশেষ আাদালতে ‘বিচার’ চালাতে পারে, তবে বিচারাধীন ব্যক্তি এর বিরুদ্ধে কোনও আপিল অব্দি করতে পারবে না, স্বপক্ষে কোনও উকিল অব্দি দাঁড় করাতে পারবে না।

এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদে মুখর হবে জনতা, এ তো জানা কথা। সেই প্রতিবাদ যাতে হিংসাত্মক না হয়ে ওঠে তা দেখার জন্য রয়েছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গান্ধীজি দেশজুড়ে সত্যাগ্রহের ডাক দিলেন। অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। ঠিক হল সারা দেশ উপবাস করবে উনিশশো উনিশের তিরিশে মার্চ। সাথে হরতাল। পরে কি কারণে তারিখ বদলে দিলেন গান্ধীজি। ঠিক হল হরতাল হবে ছয়ই এপ্রিল।

পাঞ্জাবের ক্ষোভ বিক্ষোভের নেতৃত্বে তখন দুই তরুণতুর্কী নেতা- সৈফ-উদ্দিন কিচলু এবং ডঃ সত্যপাল। প্রথমজন জার্মানি ফেরত দুঁদে আইনজীবী, দ্বিতীয়জনের ভাইসরয় কমিশন সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে, আছে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তারি ডিগ্রি। এই পরিচয়ের বাইরে দুই জনেই তখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে পাঞ্জাবের জনপ্রিয়তম মুখ। তাঁদের ডাকে মুহূর্তে জড়ো হয়ে যান হাজার হাজার মানুষ।

তিরিশে মার্চের হরতাল প্রত্যাহারের খবর অমৃতসরে পৌঁছতে দেরি হয়। আগাম গোলমালের আশংকায় পাঞ্জাব প্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মাইকেল ও’ডায়ার আগেভাগেই সমস্ত সংবাদপত্রের মুখ বন্ধ করে দেন। ডঃ সত্যপালকে ডেকে ভালো করে কড়কে দেওয়া হয় যাতে তিনি কোনও ভাষণ না দেন প্রকাশ্য জনসভায়। যথারীতি তিরিশে মার্চ সারা পাঞ্জাব জুড়ে হরতাল সাফল্যের সাথে পালিত হয়। জালিয়ানওয়ালাবাগে জ্বালাময়ী ভাষন দেন সৈফ-উদ্দিন কিচলু।

ইতিমধ্যে গান্ধীজির হরতালের তারিখ পিছানোর খবর এল। পাঞ্জাবের নেতারা স্থির করলেন ছয় তারিখেও হরতাল পালন করা হবে পাঞ্জাব জুড়ে। অমৃতসরের ডেপুটি কমিশনার মাইলস আরভিং সকলকে ডেকে হরতাল প্রত্যাহারের আবেদন জানালেন। তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন অহিংস অসহযোগ আন্দোলন কখন না জানি সহিংস হয়ে ওঠে! বিশেষত গদর আন্দোলন যে প্রক্রিয়ায় প্রশমিত করা গেছে, তাতে ক্ষোভের আগুনে উত্তম দেশী ঘৃত যথেষ্ট পরিমাণে ঢালা গেছে যে!

আরভিং- এর আবেদনে কেউ কেউ সম্মতিতে মাথা দোলালেও সৈফ-উদ্দিন কিচলু ও ডঃ সত্যপালকে বাগে আনা যায়নি। তাঁরা হরতালের নীতিতে অবিচল রইলেন। সরকার কিচলুকেও মুখ বন্ধ রাখার আদেশ দিলেন। ছয়ই এপ্রিলের হরতাল সর্বাত্মক সাফল্য পেল আবারও।

নয়ই এপ্রিল ছিল রামনবমী। হিন্দুদের উৎসব। সরকার যদিও তাজ্জব হয়ে গেল অন্য কারণে। রামনবমীর মিছিলে কাতারে কাতারে মুসলিমরা অংশ নিল সেবার। রামনবমীর মিছিল থেকে স্লোগান উঠল, “হিন্দু মুসলিম কি জয়!” “মহাত্মা গান্ধী কি জয়!”। যে হিন্দুরা মুসলিমদের এঁটো খাওয়া দূরের কথা, ছায়া মাড়ালে গোবর গোমূত্র খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করে, তারাই কিনা মিছিলে ক্লান্ত হয়ে এক ঘটি থেকে জল খাচ্ছে! ব্রিটিশদের অন্তরের সুকঠিন অন্তরতম স্থলে শীতল কাঁপুনি ধরে গেল। তীব্র হতাশা, অবিশ্বাসের দোলাচলে পাগল হয়ে গেলেন ব্রিটিশ অফিসার, রাজপুরুষেরা। হিন্দু মুসলিম একজোট হয়ে লড়লে আর কদিনইবা এমন সুখের সাম্রাজ্য ধরে রাখা যাবে!

তড়িঘড়ি ডঃ সত্যপাল ও সৈফ-উদ্দিন কিচলুকে গ্রেফতার ও স্থানান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। সেই মোতাবেক দুজনকে এত্তেলা দিয়ে ডেকে এনে গ্রেফতার করা হল। তাঁদের গোপনে স্থানান্তরের চেষ্টা হলেও তা কোনও কারণে গোপন রইল না। আগুনের মতো খবর ছড়িয়ে পড়ল গাঁয়ে গঞ্জে শহরে প্রান্তরে। দলে দলে লোকে নেমে এল রাস্তায়। শিখ, মুসলিম, হিন্দু সকলে একযোগে। সরকারও পিছু হঠার পাত্র নয়। এটাই তো চাইছিল তারা! গুলি চলল। প্রতিবাদী মানুষের ওপর নির্বিবাদে গুলি চালাল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকার। অমৃতসরের পথে পথে মৃত্যু খুঁজে নিল তার শিকার। মৃতদেহ নিয়ে মিছিল হিংস্র হয়ে উঠল। উন্মত্ত জনতার সামনে দাবানলও থমকে দাঁড়ায়, কালবৈশাখীও স্তব্ধ হয়ে সময় গোনে। একটির পর একটি ব্যাঙ্ক লুঠ হল। পাঁচজন নিরপরাধ ব্রিটিশ কর্মচারীকে পিটিয়ে, জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা করল জনতা। নিহত হতে হতে কোনওমতে বেঁচে গেলেন ব্রিটিশ স্কুল শিক্ষয়িত্রী মার্সেলা শেরউড। উন্মত্ত জনতা সেদিন জেনানা হাসপাতালে গিয়েছিল ডঃ ইসাবেল মেরি ইসডনকে খুঁজতে। দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকটি সম্বন্ধে খবর ছিল, তিনি নাকি পুলিসের অত্যাচারে আহত দেশীয় লোকদের দেখতে গিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ হাসি ঠাট্টা করতেন আর বলতেন, “বেশ হয়েছে। যেমন কর্ম তেমন ফল।” তাঁকে হাসপাতালের কর্মচারীরা লুকিয়ে রাখে। তাঁকে না পেয়ে হতাশ জনতা পথে পেয়ে যায় মিস মার্সেলা শেরউডকে। পাঁচটি মিশনারি স্কুলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারইনটেনডেন্ট মিস শেরউড দ্রুত সাইকেলে করে যাচ্ছিলেন স্কুলেই। রায়টের খবর পেয়ে স্কুলগুলি বন্ধ করা হয়েছিল ইতিমধ্যেই। মিস শেরউড ছয়শ’র মতো ভারতীয় ছাত্রকে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ধেয়ে আসা জনতাকে দেখে তিনি দ্রুত পরিচিত গলিতে ঢুকে পড়েন। পনের বছর অমৃতসরে থাকার কারণে এই এলাকাটি তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা। মানুষজনও ভালোবাসত তাঁকে। কিন্তু তিনি পালাতে পারলেন না। জনতা ধাক্কা দিয়ে পথে ফেলে দিল তাঁকে। পরবর্তী অবশ্যম্ভাবী গণপ্রহারে কোনও সাড়া না পেয়ে জনতা বুঝল তিনি মৃত। তারা সরে পড়ল এবার। কিন্তু মিস শেরউড সেদিন মারা যাননি। স্থানীয় এক সহৃদয় দোকানি তাঁর অচেতন দেহটিকে নিজের ঘরে তুলে নিয়ে যান। বাড়ির মহিলারা প্রাথমিক সেবা শুশ্রূষা শুরু করে দেন তৎক্ষনাৎ। সেই বাড়ির ছেলের শিক্ষিকা মিস শেরউড। এদিকে জনতা খবর পায় মিস শেরউড মারা যাননি। ক্রুদ্ধ জনতা ফের ফিরে আসে তাঁর খোঁজে। দোকানির বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে তারা। বাড়ির সবচাইতে বৃদ্ধা মহিলাটি দরজা খুলে মাতৃসুলভ দৃঢ়তায় তাদের চলে যেতে বলেন। উন্মত্ত অবাধ্য জনতা বাধ্য শিশুর মতো ঘাড় গুঁজে চলে যায়। মিস শেরউডকে এরপর গোপনে একগাদা কম্বলের তলায় লুকিয়ে গরুর গাড়িতে করে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। কারণ তাঁর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা জরুরি।

এই সমস্ত ঘটনাবলীর পটভূমিকায় অমৃতসরে প্রবেশ জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের।

জলন্ধরের হেডকোয়ার্টারে থাকতেই তিনি সব খবর পেয়েছিলেন। ওপর থেকেও তাঁকে সতর্ক করা হয়েছে ইতিমধ্যে। ব্রিটিশ কর্মচারীদের হত্যা ও বিশেষত মিস শেরউডের ওপর আক্রমণে রাজশক্তি তখন প্রত্যুত্তরের অপেক্ষায় ফুঁসছে।
১১ই এপ্রিল রাত ন’টার সময় জেনারেল ডায়ার যখন অমৃতসরে ঢুকছেন, অমৃতসরের পথ হাট বাজার সরকারি অফিসগুলি তুমুল ধ্বংসলীলার সাক্ষ্য বয়ান করছে। ডায়ার দেরি করেননি। বারো তারিখ সকালেই অমৃতসরের পথে পথে টহল দিতে শুরু করে দেয় তাঁর অধীনস্থ সেনা। ডায়ার ঘোষণা করে দেন, সেনাবাহিনী যেকোনও মূল্যে অমৃতসরে আইনশৃঙ্খলা ফের প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর।
উল্টো দিকে জনতাও হার মানতে নারাজ। তাঁদের ক্ষোভের পারদ মুহূর্তে মুহূর্তে চড়ছে। সৈফ-উদ্দিন কিচলু এবং ডঃ সত্যপালকে বিনা শর্তে না ছেড়ে দেওয়া অব্দি হরতাল চালিয়ে যেতে চায় তারা। জেনারেল ডায়ার ঘোষণা করে দিলেন, “কোনও জমায়েত অথবা মিছিলে চার জনের বেশি মানুষ একত্রিত হলে, সরকার সেই জমায়েত অথবা মিছিলকে ছত্রভঙ্গ করতে সশস্ত্র বলপ্রয়োগে বাধ্য হবে।”

পরের দিন তেরই এপ্রিল ছিল বৈশাখী। পাঞ্জাবের জনপ্রিয় পরব। সকাল থাকতেই দূরের গাঁ গঞ্জ থেকে লোকে ভিড় জমালো শহরের পথে পথে। বড় পরবের দিনে স্বর্ণমন্দির দর্শন পুণ্যের কাজ। এদিকে খবর এল জালিয়ানওয়ালাবাগে ফের জমায়েত হচ্ছে লোকে।

ডায়ার চুপচাপ ডেকে নিলেন অধীনস্থ গোর্খা ও বালুচ এই দুই বাহিনীর বাছাই করা জনা পঞ্চাশেক বন্দুকবাজ আর দুটি মেশিনগানবাহী গাড়িকে। গন্তব্য জালিয়ানওয়ালাবাগের ময়দান। চারিদিকে ঘেরা এই ময়দানে ঢোকা বা বেরোনোর পথগুলি খুবই সঙ্কীর্ণ, একদিকে উঁচু জমি। জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ারের মেশিনগানবাহী গাড়ি ওপথে ঢুকতে পারল না। জেনারেল ডায়ার উঁচু জমির দিকে সেনাদের নিয়ে চললেন। তাঁর অভীষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য একেবারে আদর্শ জায়গা। লক্ষ্যবস্তু সব সামনে এবং নীচে। কোনও বাধাই আসবে না তাদের দিক থেকে।

পনের থেকে কুড়ি হাজার মানুষ জমায়েত হয়েছে ইতিমধ্যেই। দেড়খানা ফুটবল মাঠের মতো জায়গাটি। ডায়ার নির্দেশ দিলেন “ফায়ার”। তাঁর আঙুল সরাসরি জমায়েতের কেন্দ্রস্থলের দিকে। আজ্ঞাবহ দেশীয় সেনা স্বজাতীয় নারী পুরুষ শিশু কিশোরের ওপর গুলি চালাল একসাথে। জনতা আচমকা আক্রমণে দিশেহারা হয়ে সরে গেল দেওয়ালের দিক গুলিতে। ডায়ার নির্দেশ দিলেন ” ফায়ার”। এবারও তাঁর আঙুল ভয়ার্ত দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য জনতার দিকেই। বন্দুকে গুলি ভরা হতে লাগল, আর “ফায়ার”। যতক্ষণ না গুলির মজুদ শেষ হল, এই হত্যাযজ্ঞ চলতে লাগল। কোনও বাধা ছাড়াই। বাধা কে দেবে। নিরস্ত্র মানুষগুলি তো প্রতিআক্রমণের জন্য তৈরি হয়েই আসেনি! দশমিনিটের তাণ্ডবে কম করে দুই হাজার মানুষ মারা যান সেদিন। গুলিতে শুধু নয়, উদভ্রান্ত ভয়ার্ত জনতার পায়ের তলায় কত মানুষ কোতল হন সেদিন সেই হিসেব কে করেছে।

হিসেব কষেছিল ব্রিটিশরা। ঘটনার চার মাস পরে। নিকটাত্মীয়দের সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়েছিল। আজব পরিহাস! কার বুকে দম ছিল সেসময়, বুক ঠুকে স্বীকার করে যে তার বাপ, কাকা, খুড়া, জ্যাঠা, ব্যাটা, বিটি সেদিন পুলিশের নির্দেশ উপেক্ষা করে জমায়েত হয়েছিল জালিয়ানওয়ালাবাগের ময়দানে!

সেই রাতে সারা শহর জুড়ে নেমে আসে শ্মশানের স্তব্ধতা। লোকে এত ভীত হয়ে পড়ে যে নিকটাত্মীয়ের মৃতদেহ অব্দি পড়ে থাকে সারারাত খোলা আকাশের নীচে। অসংখ্য মৃতদেহের গন্ধে শেয়াল কুকুর এসে হাজির হয়। সারারাত মৃত মানুষের দেহখণ্ড নিয়ে টানাটানি মারামারি চালায় নিশাচরের দল। শহর জুড়ে কার্ফু জারি ছিল। কেউ আহতদের সামান্যতম সেবা শুশ্রূষার ব্যবস্থাও করতে পারেননি।

আজ সেই হত্যাকাণ্ডের দিন। একশো বছর হয়ে গেল। ডায়ারকে সেনাবাহিনী থেকে অবসৃত করা হয়। ব্রিটিশ সরকার কিন্তু তাঁর সপক্ষেই ছিল আগাগোড়া। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইকেল ও’ডায়ার তাঁর টেলিগ্রামে জেনারেল ডায়ারকে লিখছেন,

“Your actions are correct. Lt Governor approves.”

এরপর অবশ্য বহু কাঠখড় পুড়িয়ে একটি তদন্ত কমিশন আদায় করা গিয়েছিল। সেই হান্টার কমিশনের সামনে তিনি বলেন,

“I think it quite possible that I could have dispersed the crowd without firing but they would have come back again and laughed, and I would have made, what I consider, a fool of myself.”

তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিনি কি আহতদের চিকিৎসার কোনও ব্যবস্থা করোছিলেন? তাঁর নিস্পৃহ জবাব ছিল,

“Certainly not. It was not my job. Hospitals were open, and they could have gone there”

এই ঔদ্ধত্যের আরেক নামই ব্রিটিশ উন্নাসিকতা। ব্রিটেনে এ খবর দেরিতে পৌঁছয়। সমালোচনার চাইতে সমাদরই হয় বেশি। বহু রাজপুরুষই তাঁকে “সেভিয়ার অফ পাঞ্জাব” অভিধায় ভূষিত করেন। তাঁকে দুর্মূল্য মণিমাণিক্যখচিত একটি তরবারি উপহার দেওয়া হয়। তাঁর আইনি লড়াইয়ের জন্য লোকে ছাব্বিশ হাজার পাউন্ড অর্থ সংগ্রহ করে ফেলে। নেতৃত্ব দেয় কনজার্ভেটিভ পার্টি এবং মর্নিং হেরাল্ডের মতো সংবাদপত্র।

এদেশে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। গান্ধীজির কথা জানা যায় না, তবে রবি ঠাকুর গভর্নর জেনারেলকে জ্বালাময়ী পত্রে নাইটহুড প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। এও জানিয়ে দেন যে তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিতেও আগ্রহী।

“… The time has come when badges of honour make our shame glaring in their incongruous context of humiliation, and I for my part wish to stand shorn of all special distinctions by the side of those of my countrymen who, for their so-called insignificance, are liable to suffer degradations not fit for human beings….”

সাম্রাজ্যবাদী সরকার যা চেয়েছিল তাই করতে পেরেছিল। যে ধর্মীয় ঐক্যের চারাগাছটি সযত্নে বেড়ে উঠছিল পাঞ্জাবের গাঁয়ে, গঞ্জে, শহরে – তার মূল সমেত উপড়ে ফেলে দিতে পেরেছিলেন জেনারেল ডায়ার। এটিই ছিল এই অমানবিক নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য। বিভেদের নীতি উৎসাহের সাথে চারিয়ে গিয়েছে ব্রিটিশরাজ। যার সাফল্য ভারত ভূখণ্ডকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করে তিনটি পৃথক রাষ্ট্রে বদলে দিতে পেরেছে তারা। কিছু দালাল সাহায্য করেছে তাদের।

আজ ব্রিটিশদের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলা হচ্ছে। অনেকে বলছেন, দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেই বা কি হবে!

না, কিছুই হবে না। তবুও নিরপরাধ এতগুলি মানুষের আত্মা কিছুটা হলেও তো শান্তি পাবে! হোক না, অপরাধীরা আজ আর কেউ বেঁচে নেই। রেজিনাল্ড ডায়ার খুব কষ্টের মৃত্যু মরেছেন। তবে শেষ দিন অব্দি কৃতকর্মের জন্য তাঁর কোনও অনুশোচনা ছিল না। মাইকেল ও’ডায়ারকে গুলি করে হত্যা করেন পাঞ্জাবের গর্ব বীর উধম সিংহ। অমর শহীদ উধম সিংহ। উধম সিংহ খালসা অনাথ আশ্রমের সেই কিশোর যার চোখের সামনে পুরো হত্যাকাণ্ডটি ঘটে যায় সেদিন। বদলা নিতে কুড়ি বছর দেরি হলেও, ব্যর্থ হননি তিনি।
তবুও আজ প্রতিটি ব্রিটিশের লজ্জিত হওয়া উচিৎ। নিজেদের লুঠেরা, খুনে, ধর্ষক, বর্বর কুৎসিত ইতর পূর্বপুরুষদের জন্য লজ্জিত কেন হবে না উত্তরপুরুষ! উল্টে ভাষণবাজি চলবে, আত্মশ্লাঘায় বুক বাজিয়ে বলবে কেন, “আমরা তোদের সভ্য করেছি। আমরা তোদের সুশাসন শিখিয়েছি।” লজ্জা হয় না নিজেদের সভ্য বলে দাবি করতে? ঘেন্না হয়না পূর্বজদের কীর্তিকাহিনী জেনে?

আমরাই বা কাকে শোনাচ্ছি? উনিশশো চুরাশির শিখ গণহত্যায় জালিয়ানওয়ালাবাগের দশগুন লোককে জ্যান্ত পিটিয়ে মেরে ফেলেছি আমরাই। আজও নতুন নতুন গণকবরের হদিশ মেলে হরিয়ানায়, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লিতে। দু’হাজার এগারো অব্দি কোনও তদন্তই হয়নি সেরকম। দোষ স্বীকার, ক্ষমা! এক ভারতরত্ন বলেছিলেন, “বড় কোনও গাছ উপড়ে পড়লে এমন টুকটাক কাঁপুনি অনুভূত হয়েই থাকে!”

আজ স্মরণ করি সেই অমর শহীদদের। আজ স্মরণ করি স্বাধীনতা আন্দোলনের সকল বীর সেনানীদের। আজ শোকের দিন। আজ শপথ গ্রহণের দিন। আজ শুভ দিন। আজ পুণ্য দিন। আজ জালিয়ানওয়ালাবাগ দিবস।

 সুপ্রীতি মাইতি 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.