বাংলার রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব এবং নজিরবিহীন রাজনৈতিক নাটক। লোকসভার ২০ জন সাংসদ আগেই তৃণমূল ত্যাগ করে ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (আইএনসিপি)-তে যোগ দিয়েছিলেন। হাতছাড়া হয়েছিল বিধানসভার পরিষদীয় দলও। এবার খোদ তৃণমূলের মূল সংগঠনটিরও দখল নেওয়ার দাবি করল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির।
সোমবার রাজ্য বাজেট পেশের পরপরই নিউ টাউনের একটি বিলাসবহুল হোটেলে সর্বভারতীয় তৃণমূলের বিশেষ অধিবেশন ডাকেন বিক্ষুব্ধ নেতারা। সেখানেই ‘তৃণমূলের’ নতুন জাতীয় কর্মসমিতি গঠন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতৃত্ব থেকে কার্যত ‘ছেঁটে’ ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ব্যাপক রদবদল সংগঠনে: নতুন চেয়ারম্যান অরূপ রায়
নিউ টাউনের ওই বৈঠক থেকে তৃণমূলের গোটা সাংগঠনিক কাঠামোতে বড়সড় রদবদল ঘটানো হয়েছে:
- চেয়ারম্যান: সর্বভারতীয় তৃণমূলের নতুন চেয়ারম্যান করা হয়েছে মধ্য হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়-কে।
- সাধারণ সম্পাদক: এই পদে এসেছেন স্বয়ং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়াও সাধারণ সম্পাদক পদে রাখা হয়েছে জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা এবং সাবিনা ইয়াসমিনকে।
- সহ-সভাপতি: রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস-সহ দুই বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম এবং রথীন ঘোষ-কে সহ-সভাপতি করা হয়েছে।
- কোষাধ্যক্ষ: নতুন কমিটির কোষাধ্যক্ষ মনোনীত করা হয়েছে আখরুজ্জামানকে।
বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই নতুন কমিটির বিষয়ে খুব শীঘ্রই নির্বাচন কমিশনকে সরকারিভাবে জানানো হবে।
কালীঘাটে জরুরি বৈঠক: কড়া প্রতিক্রিয়া মমতাপন্থীদের
নিউ টাউনে যখন ঋতব্রতদের বৈঠক চলছিল, ঠিক তখনই কালীঘাটে নিজের বাসভবনে জরুরি বৈঠকে বসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, দোলা সেনের মতো শীর্ষ নেতৃত্ব।
বৈঠক শেষে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ স্পষ্ট জানান:
“তৃণমূল আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমার্থক। আমাদের দলের যা কাঠামো, তাতে এগুলি করার কোনও এক্তিয়ার ওঁদের (বিদ্রোহীদের) নেই।”
পাল্টা জবাবে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, “কুণাল ঘোষ কী নির্বাচন কমিশন?” উলুবেড়িয়া উত্তরের বিধায়কের দাবি, যা করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ আইন মেনে এবং নিশ্ছিদ্রভাবেই করা হয়েছে।
‘বিশ্বাসঘাতক’ থেকে ‘৪২০’: ক্ষুব্ধ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
এই বিদ্রোহের তীব্র বিরোধিতা করে তৃণমূল সাংসদ তথা বর্ষীয়ান আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “পরিষদীয় দল আর পার্টি সংগঠন এক বিষয় নয়। এটা নিয়ে যা বলার আদালত বলবে।” ঋতব্রতকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি যোগ করেন:
“ঋতব্রতদের এত দিন বিশ্বাসঘাতক বলছিলাম। আজ বলছি ফোর টোয়েন্টি (৪২০)। সিপিএমের সংস্কৃতিই ছিল খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি। ও সেই সিপিএমের প্রোডাক্ট। ফলে এর থেকে বেশি আর কী হবে।”
আইনি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তরজা
এই নতুন ‘তৃণমূলের’ ভবিষ্যৎ কী? এই প্রশ্নে আইনজীবী ও রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
- রাজনৈতিক জটিলতা: আইনজীবী অরুণাভ ঘোষের মতে, “এটা যতটা না আইনি প্রশ্ন, তার থেকেও বেশি রাজনৈতিক। মমতাকে বাদ দিয়ে তৃণমূল—এই তত্ত্ব কি নিচুতলার কর্মীদের বিশ্বাস করাতে পারবে?”
- করপোরেট নকশা: অন্যদিকে, সিপিএমের আইনজীবী নেতা সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা, “ঋতব্রতেরা যে ভাবে এগোচ্ছেন তাতে স্পষ্ট একটি নকশা রয়েছে। অনেক সময় কোনও কোম্পানি লাটে উঠে গেলে কিছু অংশ শেয়ার কিনে তার পুনরুজ্জীবন ঘটানো হয়। এটাও তেমনই। তৃণমূল নামক কোম্পানিটা উঠে গিয়েছে, এখন ঋতব্রতেরা শেয়ার কিনে নামটা বাঁচিয়ে রাখতে চাইছেন।”
কালীঘাটের প্রথম কড়া পদক্ষেপ: বিদ্রোহীদের ‘শো কজ’
নিউ টাউনের বৈঠক শেষ হতেই কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে কালীঘাট। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ, সাবিনা ইয়াসমিন, স্নেহাশিস চক্রবর্তী এবং বিপ্লব মিত্রদের তড়িঘড়ি কারণ দর্শানোর নোটিস (Show Cause Notice) পাঠানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, দল ও প্রতীকের অধিকার কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে আগামী দিনে এক দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের সাক্ষী হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ।

