কৃষিবিল, কৃষক আন্দোলন: বাস্তবতা বনাম ষড়যন্ত্র

কল্যাণ গৌতম

গত সেপ্টেম্বর মাসে কৃষি বিষয়ক তিনটি বিল লোকসভা ও রাজ্যসভায় পেশ ও উত্তীর্ণ হয়ে, মহামহিম রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়ে আইনরূপে বলবৎ হয়েছে। ১. কৃষি পণ্য ব্যবসা-বাণিজ্য (উৎসাহ ও প্রতিশ্রুতি) আইন; ২. কৃষক (ক্ষমতায়ন ও রক্ষা) মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি পরিষেবা আইন; এবং ৩. অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (সংশোধনী) আইন।

কৃষিপণ্য ব্যবসা-বাণিজ্য আইনের ফলে এমন একটি ইকোসিস্টেম বা তন্ত্র রচনার বন্দোবস্ত হয়েছে যেখানে কৃষক ও ব্যবসায়ী কৃষিপণ্যের ক্রয়বিক্রয় সংক্রান্ত স্বাধীনতা ভোগ করবেন। মাণ্ডিতে ফসল বিক্রি করতে গিয়ে যদি কৃষক মনে করেন তিনি প্রতারিত হচ্ছেন, যথাযথ দাম পাচ্ছেন না, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা তার জন্য খুলে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার এক নতুন ও অন্যতর মার্কেটিং চ্যানেল তৈরি হচ্ছে। দক্ষ, স্বচ্ছ ও বাঁধাহীন এই প্রণালী। কৃষিপণ্যের অন্তর্রাজ্য ও আন্তর্রাজ্য বাণিজ্য সম্ভব হবে। দৃশ্যমান বাজারের বাইরেও বাজার-সদৃশ্যস্থল রচনা হবে। সম্ভব হবে বৈদ্যুতিন বাণিজ্য। আইনের মূল লক্ষ্যটি হল, সারা দেশের জন্য সুসংহত ও অভিন্ন একটি বাজার গড়ে তোলা — ‘এক দেশ এক হাট’। কেন্দ্র সরকার চাইছেন না, কৃষক ও আমজনতার মধ্যে কাটমানি-খোর মধ্যসত্ত্বভোগীরা এঁটুলি পোকার মতো লাভের গুড় খেয়ে যাক। নতুন আইনে কৃষক ফসল থেকে বেশি দাম পাবেন, লাভবান হবেন। তেমনই সাধারণ মানুষ তুলনায় কমদামে ফসল কিনতে পেরে লাভবান হবেন। অর্থাৎ এটি যেমন কৃষক-বান্ধব আইন, তেমনই আম-জনতার সহায়ক আইন। তবে দালালদের সন্তুষ্টির আইন এটি নয়। কৃষিতে লাভ হয় না বলে, যে কৃষক চাষ ছেড়ে দিচ্ছেন; তার বিপ্রতীপে এই আইন কৃষককে জমি-জিরেতের অভিমুখী করে তুলবে। মাণ্ডিতে বিক্রি করার জন্য যে শুল্ক লাগতো, এখন থেকে তা আর লাগবে না। কেউ যদি মনে করেন, তিনি লেভি দিয়ে মাণ্ডিতেই ফসল বিক্রি করবেন, তার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ যারা বলছেন, মাণ্ডি উঠে যাচ্ছে, তা কিন্তু নয়।

দ্বিতীয়ত, কৃষি সুরক্ষা আইন হল চাষের চুক্তি সংক্রান্ত একটি জাতীয় ফ্রেমওয়ার্ক। কৃষককে ক্ষমতাশালী করাই তার লক্ষ্য। কৃষি এক শিল্পের পর্যায়ে যাচ্ছে, একটি ভৌমশিল্প যেন। এখন থেকে ব্যবসায় জড়িত হবেন কৃষক। জড়িত হবেন ব্যবসায়ী ফার্মের সঙ্গে, প্রক্রিয়াকরণ কোম্পানির সঙ্গে, পাইকারি বিক্রেতার সঙ্গে, কিংবা খুচরো ব্যবসায়ীর সঙ্গে। বীজ বোনার আগেই চুক্তি হতে পারে, কিন্তু চুক্তির এক্তিয়ারটি আসছে ফসল পাকার পর, কেবলমাত্র উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য। এটি আদৌ জমির বন্ধক সংক্রান্ত কোনো চুক্তি নয়। কখনই জমি হাতছাড়া হবার সম্ভাবনা নেই। একেবারে ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন একটি পদ্ধতির কথা আছে। কৃষকের লাভজনক দাম পাবার কথা আছে। চাষের শুরুতেই কৃষক লাভের ব্যাপারে স্থিরচিত্ত হতে পারবেন এই আইনে।

তৃতীয়, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (সংশোধনী) আইনে বলা হয়েছে যে কেন্দ্র সরকার কেবলমাত্র যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সহসা ও মাত্রাতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হলে তবেই খাদ্যশস্য, ডালশস্য, আলু, তৈলবীজ ও পেঁয়াজের মতো কৃষিপণ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করবে। পচনশীল ও অ-পচনশীল কৃষি-উদ্যান ফসলের দাম কত শতাংশ বৃদ্ধি পেলে সরকার মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কীভাবে তা করবে, তা সুস্পষ্ট বলা আছে এই আইনে। কোনোভাবেই অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বেলাগাম আইন এটি নয়। সিমেন্ট, ইস্পাতও পূর্বে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের আওতার বাইরে চলে এসেছে, তাতে মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে কিন্তু ইস্পাত ও সিমেন্ট যায় নি। ১৯৫৫ সালে যখন এই আইন লাগু হয় তখন আজকের মতো কৃষি উন্নয়নের পরিস্থিতি ছিল না। আজ দেশে কৃষি উৎপাদন ও তার হার অনেক বেড়েছে। দেশ আজ কৃষিতে সাবলম্বী। তাই ৬৫ বছর আগেকার কৃষি নীতি আজকের নীতি হতে পারে না। নতুন আইনের ফলে রপ্তানি বাণিজ্য থেকে আয়ের সম্ভাবনা যেমন বাড়বে, তেমনই দেশে সংরক্ষণ ও শস্যাগার নির্মাণ-শিল্পের সুযোগ ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। ফসলের অপচয় রোধ করাও সম্ভব হবে।

কিন্তু বিল পেশের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু করে দিল মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত বিরোধী দলগুলি। বিরোধিতা গণতন্ত্রের পক্ষে সুলক্ষণ। তবে এই বিরোধিতার যুক্তি ও ধরণ কিন্তু আলাদা। আন্দোলনে কাদের মুখ দেখা যাচ্ছে, তাদের রণকৌশল কী, শ্লোগান কী, ব্যানার-পোস্টারে কী লেখা হচ্ছে — সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, ভারতবিরোধী নানান বিচ্ছিন্নতাবাদী, শক্তি অন্তরালে থেকে কিছু কৃষককে সামনে এগিয়ে দিয়েছে। এরা মোটেই সামগ্রিক কৃষকের যথার্থ প্রতিভূ নয়।

যারা এতদিন বাজার-দালালী করে কৃষকের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফসলে নিজেদের পরিপুষ্টি ঘটাতো, কাটমানিতে ফুলেফেঁপে উঠতো, তাদেরই একটি সঙ্গবদ্ধ প্রয়াস হচ্ছে এই আন্দোলন। তা দেশের কৃষকের নামে চালানো অন্যায়। আন্দোলনের নামে অসত্য ও অর্ধসত্য বিবৃতি দেওয়াও অপরাধ।

বিরোধীদের জবাবে কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন এই বিল চাষীকে বীজ বোনার সময়েই ফসলের দামের গ্যারান্টি দেবে৷ বিক্রয় চুক্তি কেবলমাত্র উৎপাদনের উপর, তার সঙ্গে কৃষিজমির কোনো উল্লেখ নেই। কৃষক চুক্তি থেকে সরে আসতে পারে, ব্যবসায়ী পারবে না। কৃষক ও তার কৃষিজমি পুরোপুরি সুরক্ষিত। তিনি বিরোধীদের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, কোনোদিনই কি ফসলের ন্যুনতম সহায়ক মূল্য আইনের অঙ্গ ছিল? কংগ্রেস তো ৫০ বছর শাসন করেছে। তারা কেন এতদিন তা আইনের অঙ্গীভূত করল না? বিরোধীরা কৃষিবিলকে রাজনৈতিক ইস্যু করেছে, যেহেতু এই বিলের বিরুদ্ধে সমালোচনার আর কোনো জায়গা নেই। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য সবসময় ভারত সরকারের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই ছিল এবং আগামী দিনে থাকবে। নতুন আইনে কৃষক দেশ জুড়ে যেকোনো কৃষিজ পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এই আইন কৃষককে পণ্য বিক্রির সুযোগ বাড়াতে সহায়তা দেবে। মান্ডি বা কৃষি-বাজারে যেভাবে কৃষকেরা আর্থিকভাবে শোষিত হয়, মানসিকভাবে প্রতারিত হয়, তা থেকে মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি করবে এই আইন৷

আন্দোলনকারীরা নাছোড়। সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বারে বারে কথা বললেও, তারা আসলে সমাধান চাইছেন না। দেশে আন্দোলনের নামে অস্থিরতা তৈরি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। প্রশ্ন উঠেছে, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আন্দোলনকে হাইজ্যাক করেছে কিনা। যে দাবীমঞ্চে খালিস্তানপন্থী, নকশালবাদী, উগ্র কাশ্মীরি, শাহীনবাগ, ও ভারতবিরোধী মুসলিম নেতাদের দেখা যায়, সেই আন্দোলন আসলে কী! যে আন্দোলন চলাকালীন স্লোগান ওঠে — “মোদী তেরি কবর খুদেগী, আজ নেহি তো কাল!” “ইন্দিরাকো ঠোক দিয়া, মোদী কেয়া হে!” “পাকিস্তান হামারা দুশমন নেহি হে, দিল্লি হামারা দুশমন হে!” “কৃষি বিল ইজ অ্যান্টি শিখ!” সেখানে যাবতীয় আশঙ্কার বাতাবরণ তৈরি হয় বৈকি! কৃষিবিল নিয়ে এই কট্টর বিরোধিতা কেনই বা কেবলমাত্র পঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তর প্রদেশের মতো স্থানে জন্ম নিল! কেনই বা অবশিষ্ট ভারতে তার প্রভাব নেই? যে অঞ্চলের মানুষ আন্দোলন করলেন, সেই রাজ্যের কৃষকের গড় পারিবারিক আয় অন্য রাজ্য গুলি থেকে অনেক বেশি।

বোঝা যাচ্ছে কিছু মানুষকে ভাড়া করে সামনে এগিয়ে দিয়েছেন আর একদল মানুষ! দামী গাড়ি ও এলাহি আয়োজন নিয়ে উপস্থিত হওয়া মানুষ আসলে কারা? তারা কতশত বিঘা জমির মালিকানা ভোগ করেন? তারা কোন মাণ্ডির আড়তদার? তারা কোন বাজার কমিটিতে জাঁকিয়ে বসে থাকা রাজনৈতিক দলের প্রতিভূ? এসব চালচিত্র খুঁটিয়ে দেখতে হবে। খুঁজতে হবে বৈদেশিক যোগাযোগের তথ্যতালাশ। তখনই আবিষ্কার হবে এক অভূতপূর্ব ষড়যন্ত্রের আখ্যান, দেশবাসী নিশ্চিত।

এই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিষয় কিন্তু এ রাজ্যে নজরের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধির মতো ১০০ শতাংশ কেন্দ্রীয় সহায়তা প্রকল্প কেন চালু করেনি পশ্চিমবঙ্গ? তাতে কেন এ রাজ্যের চাষীরা বঞ্ছিত হচ্ছেন? যারা কৃষককে সম্মান দিতে জানেন না, তাদের কী হবে? দেশবাসীর নজরে নেই, এ রাজ্যের সত্তর লক্ষ কৃষকের বছরে ছয় হাজার টাকা পাবার কেন্দ্রীয় সুবিধা অধরাই থেকে যাচ্ছে। সারা দেশের কৃষক যেখানে বারো হাজার টাকা সরাসরি ব্যাঙ্ক একাউন্টে পেয়ে গেছেন, এ রাজ্যের চাষীরা তা আজও পেলেন না। কারণ রাজ্য সরকার এই প্রকল্পে সামিল হয় নি। “উড়ো খই গোবিন্দায় নমঃ” বললে, আর যে পুজোই হোক, ভোটপুজো চলে না। ব্যাঙ্কে টাকা সরাসরি গেলে কাটমানির সুযোগ মেলে না, মানুষের অভিজ্ঞতা এমনতরো। তাই কী রাজ্য সরকার চাইছে, রাজ্যের মাধ্যমে কৃষককে টাকাটা দিতে হবে? এতবড় বঞ্চনার বিচার কবে হবে? কে কবে এর বিচার করবে? একটি প্রবাদপ্রতিম বাক্য হল, “সে কহে অধিক মিছে যে কহে বিস্তর।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.