দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে শহর ও শহরতলির রাজপথে বামেদের বই বিক্রির স্টল দেওয়ার গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে অত্যন্ত কড়া অবস্থান নিল কলকাতা হাইকোর্ট। উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটি ও বনগাঁয় সিপিআইএমের বুকস্টলের জন্য পুলিশের অনুমতি না মেলা এবং একই স্থানে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের অস্থায়ী কাঠামো তৈরির অভিযোগ সংক্রান্ত মামলায় রাজ্য প্রশাসনকে বেনজিরভাবে ভর্ৎসনা করলেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য।
এজলাসে শুনানি চলাকালীন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় জানান, সিপিআইএম তো লটারির দোকান করছে না, তারা বইয়ের স্টল দিতে চাইছে। বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ দেখে মনে হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ভাবধারার পরিপন্থী। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার তদন্ত করে বৃহস্পতিবারের মধ্যে আদালতে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।
এজলাসে সওয়াল-জবাব: বুধবার আদালতে রাজ্যের সরকারি কৌঁসুলি দাবি করেন, সিপিআইএম যেখানে বুকস্টল করার আবেদন জানিয়েছে, সেই জমিটি পূর্ত দফতর বা পিডব্লিউডি-র অধীনস্থ এবং সেখানে স্টল করার জন্য পিডব্লিউডি-র কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। রাজ্যের যুক্তি ছিল, এটি সম্পূর্ণ জমি সংক্রান্ত বিষয়, তাই পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অজুহাতে এই বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হওয়া উচিত নয়।
তবে রাজ্যের এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট হননি বিচারপতি। উল্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, পুজোয় যে হাজার হাজার স্টল তৈরি হয়, তার সব কটিই কি পিডব্লিউডি বা কলকাতার ক্ষেত্রে পুরসভার লিখিত অনুমতি নিয়ে করা হয়? রাজ্যের নীতি সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করার নির্দেশ দিয়ে বিচারপতি বলেন, এখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়েই মূল অভিযোগ উঠেছে এবং পুলিশের কাছে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছিল, ফলে এই আদালত মামলা শুনতে পারবে না কেন?
বেলুন ফাটানোর স্টল হতে পারলে বইয়ের নয় কেন: সিপিআইএমের আইনজীবী শামিম আহমেদ আদালতে অভিযোগ করেন, নৈহাটিতে তাঁদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে যেখানে বছরের পর বছর ধরে বইয়ের স্টল হয়ে আসছে, মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থাতেই সেখানে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে বড় অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করেছে। এমনকি পুলিশের উপস্থিতিতে বাম কর্মীদের স্টল তৈরিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
এই প্রসঙ্গে তীব্র কটাক্ষ করে বিচারপতি বলেন, এত বড় স্টল কীভাবে তৈরি হলো? তাদের কি পিডব্লিউডি-র অনুমতি ছিল? দিনের শেষে দেখা যাবে রাস্তার ধারে বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানোর স্টল তৈরি হয়েছে, অথচ বইয়ের স্টল করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
আদালতের নির্দেশ: উৎসবের আবহে বিচারব্যবস্থা কোনো অপ্রীতিকর সংঘাত চায় না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে আদালত। বিচারপতি নির্দেশ দেন, রাজ্য যেন কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের স্টল তুলে না দিয়ে সিপিআইএমকেও শান্তিপূর্ণভাবে স্টল বানানোর ছাড়পত্র দেয়। পুজো শুরুর ঠিক আগে বই বিক্রির অধিকার আটকাতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরির বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত নির্দেশ দিয়েছে, বুধবারই গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখে বৃহস্পতিবারের মধ্যে পুলিশকে আদালতে লিখিত রিপোর্ট পেশ করতে হবে। সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই নৈহাটি ও বনগাঁয় বামেদের বইয়ের স্টল বসার বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

