৭৬তম বর্ষে বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পুজো: ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনে থিম ‘যোজন’

৭৬তম বর্ষে বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের পুজো: ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনে থিম ‘যোজন’

৭৬তম বর্ষে পদার্পণ করল দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পুজো বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের দুর্গাপূজা। ১৯৫১ সাল থেকে এই পুজোর মূল শক্তি এখানকার মানুষ এবং স্থানীয় পাড়ার মেলবন্ধন। এ বছরের তাদের পুজোর মূল ভাবনা বা থিম— ‘যোজন’, যার সহজ অর্থ সংযোগ বা কানেকশন। প্রখ্যাত শিল্পী সুশান্ত শিবানী পালের ভাবনায় সাজানো এই থিমের মূল বিষয়বস্তু হলো ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতা, পাড়ার সঙ্গে প্রকৃতি, শিল্পের সঙ্গে স্থায়িত্ব বা সাসটেইনেবিলিটি এবং সর্বোপরি মানুষের সঙ্গে মা দুর্গার সংযোগ।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন: পুজোর চিরাচরিত ঐতিহ্যকে বজায় রেখেই এবার তা এক সমসাময়িক বা কনটেম্পোরারি রূপের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। মণ্ডপে র‍্যাম্প দিয়ে প্রবেশ করার সময় প্রজেকশন এবং ভিজ্যুয়াল ইলিউশনের সাহায্যে মা দুর্গার প্রতিমা নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়াটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দর্শনার্থীদের চলার পথ সম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধীরে ধীরে আসল প্রতিমা তাঁদের সামনে উন্মোচিত হয়।

পাড়া ও প্রকৃতির সংযোগ: মণ্ডপসজ্জার মধ্যে একটি জ্যান্ত গাছকে সচেতনভাবে ডিজাইনের অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে এবং সেই অংশটি খোলা আকাশ বা ‘ওপেন টু স্কাই’ রাখা হয়েছে। একটি পরিচিত গাছ যেভাবে ধীরে ধীরে কোনো পাড়ার পরিচয়, স্মৃতি ও মানুষের মিলনস্থল হয়ে ওঠে, তা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। মণ্ডপের মায়াবী পরিবেশ দর্শনার্থীদের অন্য এক জগতে নিয়ে গেলেও এই গাছটি তাঁদের নিজেদের পাড়ার সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। একই সঙ্গে এটি মণ্ডপের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো ও প্রাকৃতিক বাতাসের যাতায়াত নিশ্চিত করে।

ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও স্থায়িত্ব: প্রতিমার সনাতন রূপ ও চরিত্র বজায় রেখেই এর সাজসজ্জায় আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বা টেকসই চিন্তাভাবনাকে যুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত যে শোলা ফেলে দেওয়া হয় বা পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়, সেই শোলার বাইরের অংশকে পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল করে এবারের মূল মণ্ডপ ও প্রতিমার সজ্জা তৈরি করা হয়েছে।

সর্বত্র বিরাজমান দেবী: মণ্ডপের বিভিন্ন স্থানে আয়না, প্রতিবিম্ব বা রিফ্লেকশন এবং ইলিউশনের অভিনব ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে দর্শনার্থীরা মণ্ডপের যেকোনো প্রান্ত থেকেই মা দুর্গাকে অনুভব করতে পারেন। এর মাধ্যমে এই বার্তাই তুলে ধরা হয়েছে যে ঈশ্বর কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নন, তিনি সর্বত্র বিরাজমান।

দর্শনার্থীদের সুবিধা ও নিরাপত্তা: সকলের যাতায়াতের সুবিধার কথা মাথায় রেখে মণ্ডপে দু’দিক থেকেই র‍্যাম্পের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিচারক বা জুরিদের যাতায়াতের জন্য আলাদা প্রবেশ ও প্রস্থান পথ পরিকল্পিত হয়েছে, যাতে সাধারণ দর্শনার্থীদের চলাচলে কোনো অসুবিধা না হয়। নিরাপত্তা ও জরুরি পরিষেবার জন্য মোট ২৮টি অগ্নিিনির্বাপক যন্ত্র বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার, চিকিৎসাগত সহায়তা বা মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স, বায়ো-টয়লেট এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় নানা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিবেশের কথা মাথায় রেখে প্লাস্টিক ফ্লেক্সের ব্যবহার যতটা সম্ভব এড়িয়ে তার বদলে রং করা তল, ক্যানভাস প্রিন্ট, এলইডি ডিসপ্লে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য মাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.