তৃণমূলের একাংশের সমর্থনে মালদহ জেলা পরিষদ বিজেপির দখলে; ভোটাভুটির দিনই ভোলবদল বিক্ষুব্ধদের

তৃণমূলের একাংশের সমর্থনে মালদহ জেলা পরিষদ বিজেপির দখলে; ভোটাভুটির দিনই ভোলবদল বিক্ষুব্ধদের

হাইভোল্টেজ নাটক, ভিন্‌রাজ্যের রিসর্ট রাজনীতি এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয় মেরুকরণের পর মালদহ জেলা পরিষদের বোর্ড দখল করল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। কংগ্রেস ও তৃণমূলের একাংশের যৌথ ছক ভেস্তে দিয়ে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূলেরই একটি গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সমর্থনে জেলা পরিষদের মসনদে বসল পদ্ম শিবির। নতুন সভাধিপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিজেপির দীপিকা বালা এবং সহ-সভাধিপতির দায়িত্ব পেয়েছেন লিপিকা বর্মন ঘোষ।

অনাস্থা থেকে আইনি লড়াই: পটভূমির ক্রমানুযায়ী বিকাশ ঘটনার সূত্রপাত গত জুন মাসে। ৪৩ আসনবিশিষ্ট মালদহ জেলা পরিষদের তৎকালীন সভাধিপতি লিপিকা বর্মন ঘোষ এবং সহ-সভাধিপতি আবু তৈয়ব রফিকুল হোসেনের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন তৃণমূলেরই ১৯ জন বিক্ষুব্ধ সদস্য। ওই প্রস্তাবে সমর্থন জানায় কংগ্রেসের ৫ জন সদস্য (বিজেপির সদস্যসংখ্যা ছিল ৪)। অনাস্থা-পরবর্তী তলবি সভা ডাকতে প্রশাসনের গড়িমসির অভিযোগে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় কংগ্রেস ও বিক্ষুব্ধ তৃণমূল শিবির। আদালতের নির্দেশে তলবি সভার দিনক্ষণ ঠিক হলেও সভার মাত্র দু’দিন আগে সভাধিপতি ও সহ-সভাধিপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন লিপিকা ও রফিকুল।

আইনি জটিলতা কাটাতে পুনরায় আদালতের হস্তক্ষেপ চায় অনাস্থাপন্থীরা। এর প্রেক্ষিতে ডিভিশনাল কমিশনারকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়াকরণের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সমস্ত সদস্য যাতে নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

পাকুড়ের রিসর্ট রাজনীতি ও স্টেশনে পুলিশি আটক জেলা পরিষদের রাশ হাতে রাখতে তৃণমূলের ১৯ জন বিক্ষুব্ধ সদস্য ও কংগ্রেসের ৫ জন সদস্যকে নিয়ে ‘অপারেশন’ শুরু করে জেলা কংগ্রেস, যার নেতৃত্বে ছিলেন কংগ্রেসনেত্রী মৌসম বেনজির নুর। এই ২৪ জন সদস্যকে রাখা হয়েছিল ঝাড়খণ্ডের পাকুড়ের একটি রিসর্টে। গত ৩ অক্টোবর সেখানে পুলিশি অভিযানও চালানো হয়। কংগ্রেস ও বিক্ষুব্ধদের লক্ষ্য ছিল মহিলা সংরক্ষিত সভাধিপতি পদে সাগরিকা সরকারকে বসানো।

সোমবার গভীর রাতে কংগ্রেস সাংসদ ইশা খান চৌধুরীর নেতৃত্বে ওই সদস্যদের ট্রেনে করে মালদহে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু স্টেশন চত্বরে পৌঁছাতেই বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের তিন সদস্য— শামসুল হক, ফজলু হক এবং রফিউল ইসলামকে পুলিশ আটক করে। হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও পুলিশ অন্যায়ভাবে সদস্যদের আটক করেছে— এই অভিযোগে স্টেশনে বিক্ষোভ দেখায় কংগ্রেস।

ভোটাভুটির দিন ভোলবদল ও কংগ্রেসের সভা বর্জন মঙ্গলবারের ভোটাভুটিতে উপস্থিত ছিলেন ৩০ জন সদস্য। বিজেপির পক্ষ থেকে সভাধিপতি পদে দীপিকা বালার নাম প্রস্তাব করা মাত্রই তাঁকে সমর্থন জানায় প্রাক্তন সভাধিপতি লিপিকার অনুগামী শিবির। একইসময়ে বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সদস্যরাও নাটকীয়ভাবে অবস্থান বদলে বিজেপি প্রার্থীকে সমর্থন প্রদান করেন। প্রশাসনের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ধ্বংস করা এবং শাসকদলের বেআইনি প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলে সভা বর্জন করে কংগ্রেস। ভোটাভুটি শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে বিজেপি বোর্ড গঠন করে।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সমীকরণ প্রাক্তন সহ-সভাধিপতি আবু তৈয়ব রফিকুল হোসেন জানান, “গত চার-পাঁচ মাস ধরে জেলার উন্নয়ন স্তব্ধ ছিল। এলাকার উন্নয়নের স্বার্থেই আমরা জোটবদ্ধ হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে রাজ্য বা জেলা নেতৃত্বের নির্দেশ ছিল না, সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই পদক্ষেপ করেছেন।” উল্টোদিকে, কংগ্রেসের দিকে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “কংগ্রেস অনৈতিকভাবে আমাদের ভাঙার চেষ্টা করেছিল।”

বিজেপির মালদহ জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় জানান, “বিজেপি কোনও দল ভাঙায়নি। জেলার স্বার্থে আমাদের প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করা হলে তৃণমূল সদস্যরা তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন।”

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মালদহ কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে সাংগঠনিক জমি কিছুটা আলগা হয়েছিল। বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে জেলা পরিষদ দখল করতে পারলে কংগ্রেস নতুন অক্সিজেন পেত। কিন্তু শেষ মুহূর্তের এই রাজনৈতিক রদবদলে কোতোয়ালি-কেন্দ্রিক কংগ্রেসী রাজনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা বড়সড় ধাক্কা খেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.