‘ভোটচুরি’র অভিযোগে উত্তপ্ত দিল্লি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ চেয়ে আটক রাহুল-প্রিয়ঙ্কাসহ ১০০ সাংসদ; রাষ্ট্রপতির সময় চাইল ‘ইন্ডিয়া’

‘ভোটচুরি’র অভিযোগে উত্তপ্ত দিল্লি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ চেয়ে আটক রাহুল-প্রিয়ঙ্কাসহ ১০০ সাংসদ; রাষ্ট্রপতির সময় চাইল ‘ইন্ডিয়া’

‘ভোটচুরি’ এবং ‘স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনি কার্যকলাপে’র অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের নির্বাচন সদন অভিযানকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার দিনভর চরম উত্তপ্ত রইল ভারতের রাজনীতি। নির্বাচন সদনে যাওয়ার পথে পুলিশি বাধায় আকাশবাণী ভবনের সামনে প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা অবস্থান-বিক্ষোভ জানান লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বাড্রা। রাত আটটা নাগাদ রাহুল ও প্রিয়ঙ্কাসহ প্রায় ১০০ জন বিরোধী সাংসদকে আটক করে উত্তর দিল্লির কিংসওয়ে ক্যাম্প থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরবর্তীতে রাত সোয়া ১০টা নাগাদ তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

রাজপথে আন্দোলন ও সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি এ বার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি নিয়ে সরাসরি রাষ্ট্রপতি ভবনের দ্বারস্থ হচ্ছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। রাহুল গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী নেতৃত্ব আগামী ৭ থেকে ৯ অক্টোবরের মধ্যে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে সাক্ষাতের সময় চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন।

শীর্ষ আদালতের তোপ ও চাপে নির্বাচন কমিশন একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত এককভাবে নেওয়া হয়েছিল। এই আবহে সোমবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি মামলায় কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিস জারি করে এক সপ্তাহের মধ্যে জবাব তলব করেছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘ফর্ম ৬’ পরিবর্তনের বিষয়ে শীর্ষ আদালত কোনও অনুমোদন দেয়নি। কে বা কারা এই পরিবর্তন অনুমোদন করেছিল, তা জানতে চেয়েছে আদালত, যা কমিশনের ওপর চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

রাজপথে ৩০০ বিরোধী সাংসদের মিছিল ও ব্যাপক নিরাপত্তা মঙ্গলবার সকাল ১১টা নাগাদ সংসদের মকরদ্বার থেকে নির্বাচন সদন অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন বিরোধী জোটের প্রায় ৩০০ জন সাংসদ। মিছিলে রাহুল, প্রিয়ঙ্কা ও খড়্গের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত এবং মনোজ ঝার মতো শীর্ষ নেতারা।

সংসদ ভবন ও পার্লিয়ামেন্ট স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকা এবং কমিশনের দফতরজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে দিল্লি পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চার কোম্পানি মহিলা পুলিশসহ মোট ৩১ কোম্পানি (প্রায় ৩,০০০ কর্মী) পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নীতি আয়োগ অফিসের সামনে মিছিল আটকে দেওয়া হলে সেখানেই ধর্নায় বসেন রাহুল ও অভিষেকরা। পরে আকাশবাণী ভবনের সামনে দীর্ঘ অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন, “অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদী, মোহন ভাগবত এবং জ্ঞানেশ কুমার দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করছেন। বিরোধী দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত ৩০০ জন সাংসদ মাত্র ৫০ গজ দূরের কমিশন দফতরে দেখা করতে চেয়েও বাধার মুখে পড়েছেন।”

তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তোলেন, “পশ্চিমবঙ্গে একতরফাভাবে ৯০ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।” মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের গ্রেফতারির দাবি তোলেন তিনি। সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদবও ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তোপ দাগেন। অন্যদিকে, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে বলেন, “মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সরকারের হাতের পুতুল হয়ে উঠেছেন।”

দাবি ও জবাবে ধোঁয়াশা কমিশনের কমিশনের তরফ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বিকেল ৪টে পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দল সাক্ষাতের আনুষ্ঠানিক সময় চায়নি। পরবর্তীতে পুলিশ মারফত জানানো হয় যে বিরোধীরা দেখা করতে ইচ্ছুক। কমিশন জানায়, ২০২৫ সাল থেকে চালু হওয়া প্রোটোকল অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধিদলকে নির্ধারিত নিয়মে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। বিরোধীরা সংসদ ভবনের অ্যানেক্স ভবনে ২৪০ জন সাংসদকে নিয়ে বৈঠকের প্রস্তাব দিলেও কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী এই বৈঠক কমিশন দফতরেই হওয়ার কথা। তাই কমিশন প্রস্তাবটি না মেনে সংসদ ভবনে গিয়ে স্মারকলিপি গ্রহণের জন্য একজন জ্যেষ্ঠ আধিকারিককে পাঠানোর কথা জানায়।

বুধবার ফের কর্মসূচির ডাক গত ৩০ সেপ্টেম্বর জোটের বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বুধবার ফের নির্বাচন সদন অভিমুখে বিক্ষোভ ও ঘেরাও অভিযানের ডাক দিয়েছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট। ভোটার তালিকায় অনিয়ম এবং প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি ভোটার বাদ পড়ার অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে টানা কর্মসূচির অংশ হিসেবে কলকাতা, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরুসহ বিভিন্ন জেলা সদরে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.