সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় হাসপাতালের চার দেওয়ালে শয্যাশায়ী থাকার পর, অবশেষে কলকাতা হাই কোর্টের মানবিক ও কড়া হস্তক্ষেপে নিজের ঘরে ফিরলেন পুনম গুপ্ত। সাড়ে চার বছর আগে দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর থেকে এক প্রকার ‘পরিত্যক্ত’ অবস্থাতেই বেসরকারি হাসপাতালে দিন কাটছিল তাঁর। অবশেষে আদালতের নির্দেশে বৃহস্পতিবার বিকেলে আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে তাঁকে। একই সাথে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনো স্বামীই তাঁর অসুস্থ স্ত্রীর প্রতি নৈতিক, মানবিক এবং আইনি দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে পারেন না।
দুর্ঘটনার সূত্রপাত ও দীর্ঘ হাসপাতালের জীবন
২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আমহার্স্ট স্ট্রিট এলাকাতেই এক পথ দুর্ঘটনার শিকার হন পুনম গুপ্ত। স্বামী জয়প্রকাশ গুপ্ত স্কুটি চালাচ্ছিলেন এবং পুনম পিছনে বসেছিলেন। স্কুটি থেকে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। প্রথমে তাঁকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে ইএম বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেই থেকে গত সাড়ে চার বছর ধরে ওই বেসরকারি হাসপাতালই ছিল পুনমের ঠিকানা।
বর্তমানে তিনি কথা বলতে বা চলাফেরা করতে পারেন না। তবে আদালত নিযুক্ত বিশেষ চিকিৎসক কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, পুনম সম্পূর্ণ অবচেতন নন, বরং ইশারায় সাড়া দেন এবং নিজে খাওয়াদাওয়া করতে পারেন। ফলে বাড়িতে রেখেই তাঁর যত্ন ও চিকিৎসা করা সম্ভব।
১ কোটি টাকারও বেশি বিল, দায় এড়ানোর অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে
পেশায় ছাঁট লোহার ব্যবসায়ী জয়প্রকাশ গুপ্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তিনি স্ত্রীকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাননি। উল্টে হাসপাতালের বিল মেটানোও বন্ধ করে দেন।
- বিলের খতিয়ান: ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুনমের চিকিৎসার মোট বিল দাঁড়ায় ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে রোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা এবং বিমা সংস্থা দিয়েছে ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। বাকি বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া থেকে যায়।
- আইনি জটিলতা: ২০২২ সালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করে। সেখানে সুরাহা না মেলায় ২০২৪ সালের মে মাসে তাঁরা ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিক্যাল এসটাব্লিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশন’-এর দ্বারস্থ হন। কমিশন নোটিস পাঠালেও রোগীর পরিবার হাজিরা না দেওয়ায়, হাসপাতালকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
‘ভেজিটেটিভ স্টেট’-এর যুক্তি ও হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ
হাই কোর্টে মামলা গড়াতে জয়প্রকাশের আইনজীবীদের তরফে সওয়াল করা হয় যে, পুনম স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম (ভেজিটেটিভ স্টেট)। তাই বাড়িতে রেখে তাঁর চিকিৎসা ও দেখাশোনা করা স্বামীর পক্ষে অসম্ভব। স্ত্রীকে কোনো সরকারি হোম বা হাসপাতালে রেখে সরকারি পুনর্বাসন প্রকল্পের অধীনে চিকিৎসা করানোর আবেদন জানান তিনি।
রোগীর প্রকৃত অবস্থা খতিয়ে দেখতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের সিঙ্গল বেঞ্চ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির ইতিবাচক রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ৮ তারিখ সিঙ্গল বেঞ্চ জয়প্রকাশের দাবি খারিজ করে এক সপ্তাহের মধ্যে স্ত্রীকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে মানবিক কারণে বেসরকারি হাসপাতালের বকেয়া বিল মকুব করে দেন বিচারপতি।
এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যান জয়প্রকাশ। বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি অজয়কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চে জয়প্রকাশের আইনজীবী নবকুমার দাস ও সুমঙ্গল শীল দাবি করেন, সরকার রোগীকে হোমে পাঠিয়ে চিকিৎসার দায়িত্ব নিক। এই অবস্থানে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে ডিভিশন বেঞ্চ জানায়:
“আইনত বৈধ স্ত্রীর দায়িত্ব এড়াতে এবং শারীরিক অক্ষমতার কারণে তাঁকে পরিত্যাগ করার চেষ্টা করছেন স্বামী, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তা ছাড়া, এই দম্পতির ১৭ বছরের একটি সন্তান রয়েছে। মাকে হোমে পাঠালে সন্তান তাঁর সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবে।”
আদালত আরও সতর্ক করে বলে, এই রায়কে দৃষ্টান্ত করে ভবিষ্যতে যদি সবাই সুস্থ-অসুস্থতার দোহাই দিয়ে আত্মীয়দের হোমে পাঠাতে শুরু করে, তবে সামাজিক অবক্ষয় বাড়বে এবং সরকারের ওপরও অনাবশ্যক চাপ তৈরি হবে। তবে এই ধরনের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন বলেও মনে করে আদালত।
ডিভিশন বেঞ্চের চূড়ান্ত নির্দেশ ও স্বস্তির প্রত্যাবর্তন
গত মঙ্গলবার ডিভিশন বেঞ্চ পুনম গুপ্তকে সসম্মানে বাড়ি ফেরাতে একগুচ্ছ কড়া ও মানবিক নির্দেশিকা জারি করে:
- নিরাপদ প্রত্যাবর্তন: ফুলবাগান থানার ওসির তত্ত্বাবধানে, চিকিৎসক ও নার্সসহ অ্যাম্বুলেন্সে করে পুনমকে আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। বাড়িতে প্রবেশে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কেউ যাতে বাধা দিতে না পারেন, তা পুলিশকে নিশ্চিত করতে হবে।
- চিকিৎসা ও নজরদারি: কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সপ্তাহে দু’বার করে নার্স গিয়ে বাড়িতে পুনমকে দেখে আসবেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তৎক্ষণাৎ সরকারি হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করা হবে।
- আইনি সহায়তা: জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ (DLSA) নিয়মিত পুনমের বাড়িতে গিয়ে তাঁর কোনো আইনি সহযোগিতার প্রয়োজন আছে কি না, তার খোঁজ রাখবে।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া: ডিভিশন বেঞ্চের এই রায়কে শেষ পর্যন্ত স্বাগত জানিয়েছে পুনমের পরিবার। জয়প্রকাশের আইনজীবীদের দাবি, তাঁরা স্ত্রীকে অবহেলা করতে চাননি, কেবল চিকিৎসার খরচ ও পরিকাঠামো নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। আদালত সপ্তাহে দু’দিন সরকারি নার্স পাঠানো ও চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ায় পরিবার স্বস্তি পেয়েছে এবং রায় মেনে বৃহস্পতিবার পুনমকে ঘরে তুলে নিয়েছে। এর সাথেই অবসান ঘটল এক নারীর সাড়ে চার বছরের দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক হাসপাতাল-বন্দী জীবনের।

