রাজ্যসভাতেও পাশ হলো রূপান্তরকামী সুরক্ষা সংশোধনী বিল: তুঙ্গে বিতর্ক ও বিরোধীদের প্রতিবাদ

রাজ্যসভাতেও পাশ হলো রূপান্তরকামী সুরক্ষা সংশোধনী বিল: তুঙ্গে বিতর্ক ও বিরোধীদের প্রতিবাদ

লোকসভার পর এবার সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভাতেও ধ্বনিভোটের মাধ্যমে পাশ হয়ে গেল বিতর্কিত ‘রূপান্তরকামী ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল’। মঙ্গলবার নিম্নকক্ষে পাশ হওয়ার পর বুধবার রাজ্যসভাতেও বিলটি অনুমোদিত হয়। তবে এই বিলকে কেন্দ্র করে সংসদ থেকে রাজপথ— সর্বত্রই বিতর্কের ঝড় উঠেছে। বিরোধীদের পক্ষ থেকে বিলটি পর্যালোচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানানো হলেও তা খারিজ করে দেয় সরকার পক্ষ।

বিলে কী আছে?

২০১৯ সালের মূল আইনে বড়সড় পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে এই সংশোধনীতে। নতুন বিলের প্রধান দিকগুলি হলো:

  • সংজ্ঞার পরিবর্তন: ‘ট্রান্সজেন্ডার’ বা রূপান্তরকামী নাগরিকের সংজ্ঞা থেকে ‘স্ব-স্বীকৃত লিঙ্গ পরিচয়’ (Self-perceived gender identity)-এর ধারণাটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
  • লিঙ্গ নির্ধারণ পদ্ধতি: নিজের ইচ্ছায় লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারণের অধিকার আর থাকছে না। এখন থেকে একটি নির্দিষ্ট ‘ডাক্তারি বোর্ড’ নির্ধারণ করবে কে রূপান্তরকামী হিসেবে গণ্য হবেন।
  • নির্দিষ্ট গোষ্ঠী: মূলত ইন্টারসেক্স (উভলিঙ্গ) এবং প্রথাগত সামাজিক গোষ্ঠী যেমন হিজড়া, কিন্নর বা আরাবনী সম্প্রদায়ের মানুষরাই এই আইনি তকমা পাবেন।
  • কঠোর শাস্তি: জোরপূর্বক অঙ্গহানি বা লিঙ্গ রূপান্তরের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের অবস্থান

কেন্দ্রীয় সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রী বীরেন্দ্র কুমার বিলটির স্বপক্ষে যুক্তি দিয়ে জানান, মোদী সরকার রূপান্তরকামী নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ। তিনি বলেন, “শুধুমাত্র জৈবিক কারণে যাঁরা বৈষম্যের শিকার হন, তাঁদের রক্ষা করাই এই বিলের লক্ষ্য। দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ইতিমধ্যেই ‘ট্রান্সজেন্ডার কল্যাণ বোর্ড’ গঠন করা হয়েছে।” সরকারের দাবি, এই বিল সমাজের সকল অংশকে অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রয়াস।

বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ

বিলের তীব্র বিরোধিতা করে সিপিআই(এম) সাংসদ জন ব্রিট্টাস একে একটি ‘কালো দিন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই বিল ভারতকে আধুনিক বিশ্বের প্রগতিশীল চিন্তা থেকে এক শতাব্দী পিছিয়ে দেবে। তিনি অভিযোগ করেন, এই বিল রূপান্তরকামীদের জোরপূর্বক যন্ত্রণাদায়ক অস্ত্রোপচারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্যদিকে, আম আদমি পার্টির সাংসদ স্বাতী মালিওয়াল বিলের অস্পষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানান, রূপান্তরকামী হিসেবে কাউকে পরিচয় দিতে প্রলুব্ধ করাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার যে ধারা বিলে রয়েছে, তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর ফলে চিকিৎসক বা পরিবারের সদস্যরাও আইনি জটিলতায় পড়তে পারেন। ডিএমকে সাংসদ তিরুচি শিবাসহ অধিকাংশ বিরোধী সদস্যই বিলটি তাড়াহুড়ো করে পাশ করানোর প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন।

আইনি ভবিষ্যৎ

সংসদের উভয় কক্ষে পাশ হওয়ার ফলে বিলটি এখন আইনে পরিণত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। তবে লিঙ্গ পরিচয়ের স্ব-অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং ডাক্তারি বোর্ডের হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার কর্মী ও রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.