উত্তরবঙ্গের ইসলামপুর সংলগ্ন বিহার সীমান্তের ফাটিপুকুর এলাকায় সোমবার গভীর রাতে ঘটে গেল এক রোমহর্ষক ঘটনা। প্রেম ও প্রতিশোধের টানাপোড়েনে অপহৃত যুবক অলৌকিকভাবে প্রাণে বাঁচলেও, অপহরণের মূল চক্রীসহ তাঁর দুই বন্ধুর সলিল সমাধি ঘটল রাস্তার ধারের এক গভীর জলাশয়ে। সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানানো এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
ঘটনার মূলে ত্রিকোণ প্রেম
তদন্তকারী পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই ভয়াবহ পরিণতির নেপথ্যে রয়েছে একটি জটিল প্রেমঘটিত বিবাদ। নদিয়ার বাসিন্দা অতনু শীলের সঙ্গে এক যুবতীর বর্তমান সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ওই যুবতীর প্রাক্তন প্রেমিক, ইসলামপুরের মুকুন্দ দাস এই সম্পর্কটি মেনে নিতে পারেনি। পুরনো সম্পর্কের স্মৃতি আর বর্তমানের ঈর্ষা থেকে অতনুর ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে মুকুন্দ। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, অতনুকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই সোমবার রাতে দলবল নিয়ে হানা দিয়েছিল সে।
অপহরণ ও চলন্ত গাড়িতে সংঘর্ষ
সোমবার গভীর রাতে ইসলামপুর এলাকা থেকে অতনু শীলকে জোরপূর্বক একটি চারচাকা গাড়িতে তুলে নেয় মুকুন্দ ও তার সঙ্গীরা। গাড়িটি দ্রুতগতিতে বিহার সীমান্তের দিকে ছুটতে শুরু করে। অতনুর বয়ান অনুযায়ী, চলন্ত গাড়ির ভেতরেই তাঁর ওপর শুরু হয় নারকীয় অত্যাচার। বেধড়ক মারধরের পাশাপাশি তাঁকে প্রাণে মারার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। গতির উন্মাদনা আর আক্রোশে মত্ত থাকা চালক ও আরোহীরা তখন সম্পূর্ণ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য।
নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জলাশয়ে ঝাঁপ
রাত ১২টা নাগাদ ফাটিপুকুর এলাকায় প্রবেশের সময় গাড়িটির গতিবেগ ছিল অত্যন্ত বেশি। অভিযোগ, গাড়ির ভেতরে অতনুর সাথে অপহরণকারীদের ধস্তাধস্তির কারণেই চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। রাস্তার পাশের একটি গভীর জলাশয়ে গাড়িটি সজোরে আছড়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করে গাড়ির ভেতরে।
উদ্ধারকার্য ও মৃত্যু সংবাদ
গাড়ি পড়ার শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা ট্রাক্টর ও দড়ি নিয়ে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। খবর দেওয়া হয় পুলিশে। গ্রামবাসীরা জল থেকে গাড়িটিকে টেনে তুললে দেখা যায়, ভেতরে থাকা সাতজনের মধ্যে তিনজনের প্রাণহীন দেহ পড়ে রয়েছে। মৃতরা হলেন মুকুন্দ দাস (মূল অভিযুক্ত), সুরজিৎ দাস এবং বনি দাস। অন্যদিকে, অপহৃত অতনু শীলসহ আরও চারজন গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার হন। তাঁদের দ্রুত ইসলামপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের তদন্ত
ঘটনাটি বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের সন্ধিস্থলে হওয়ায় দুই রাজ্যের পুলিশই যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। বিহারের কিষাণগঞ্জে মৃতদেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। অতনু শীলের অভিযোগের ভিত্তিতে অপহরণ ও খুনের চেষ্টার মামলা রুজু করা হয়েছে।
পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, “প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, চলন্ত গাড়িতে ধস্তাধস্তির জেরেই এই দুর্ঘটনা। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে গিয়েই এই মর্মান্তিক পরিণতি।” এই ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পুলিশ খতিয়ে দেখছে এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না।

