‘স্যাঁটা গরম করে দেওয়া হবে’! মন্ত্রী জগন্নাথের হুঙ্কার নিয়ে হইচই, কোথা হইতে আসিয়াছে স্যাঁটা? খুঁজে দেখল আনন্দবাজার ডট কম

‘স্যাঁটা গরম করে দেওয়া হবে’! মন্ত্রী জগন্নাথের হুঙ্কার নিয়ে হইচই, কোথা হইতে আসিয়াছে স্যাঁটা? খুঁজে দেখল আনন্দবাজার ডট কম

শিক্ষায় দুর্নীতি রুখতে গিয়ে রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের ব্যবহৃত একটি শব্দবন্ধ এখন রাজ্য রাজনীতি ও সমাজমাধ্যমে তুমুল চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে কলেজে ভর্তি নিয়ে তোলাবাজির প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী হুঁশিয়ারি দেন, দুর্নীতি করলে ‘স্যাঁটা গরম’ করে দেওয়া হবে। মন্ত্রীর মুখে এই গ্রামীণ বা আঞ্চলিক শব্দ শোনার পর থেকেই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকদের মধ্যে কৌতুহল ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে— আসলে কী এই ‘স্যাঁটা’? এর অর্থই বা কী?

প্রেক্ষাপট: কলেজে ভর্তি ও মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি

গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যে কলেজের ভর্তিপ্রক্রিয়ায় টাকার লেনদেন এবং তোলাবাজির বিস্তর অভিযোগ উঠছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত বিকাশ ভবনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইন ভর্তিপ্রক্রিয়া চালু করা হয়। এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলার সময়ই উচ্চশিক্ষামন্ত্রী কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন:

“কোথাও যদি কলেজে ভর্তি নিয়ে কেউ টাকা তুলছে, সে যে-ই হোক, হঠাৎ বিজেপি-ও যদি হয়, শোনা যায়, স্যাঁটা গরম করে দেওয়া হবে।”

মন্ত্রীর আত্মপক্ষ সমর্থন: ‘আমি বীরভূমের ব্যাটা’

‘স্যাঁটা’ শব্দের আসল অর্থ এবং এর উৎস জানতে আনন্দবাজার ডট কম-এর পক্ষ থেকে মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি দেন। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি তাঁর নিজস্ব জেলার আঞ্চলিক ভাষা।

  • শব্দের অর্থ: মন্ত্রীর দাবি, “আমাদের বীরভূমে নানা অর্থে ব‍্যবহৃত হয়। মূলত কোমর ভেঙে দেওয়া, উচিত শিক্ষা দেওয়া, কঠোর শাস্তি দেওয়া ইত্যাদি।”
  • আঞ্চলিক ভাষার টান: নিজের ভাষা ব্যবহারের অধিকার নিয়ে সরব হয়ে তিনি বলেন, “আমি বীরভূমের ব্যাটা। আপনাদের জন্য আমি আমার নিজের ভাষা, বীরভূমের ভাষায় কথা বলব না? আমি বীরভূমের ভাষায় কথা বলব, যখন ইচ্ছে হবে বলব।”

ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকদের ভিন্ন মত: শব্দটির শালীনতা নিয়ে প্রশ্ন

মন্ত্রীর এই সাফাইয়ের পরেও ভাষা বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট সাহিত্যিকদের বড় অংশ এই শব্দপ্রয়োগ নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। অনেকের মতেই এটি কোনো ভদ্র বা মার্জিত শব্দ নয়।

  • পবিত্র সরকার (ভাষাবিদ ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য): “স্যাঁটা শব্দের মানে আমার জানা নেই। আমি স্যাটাস্যাট শুনেছি। আগে মমতা (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী) প্রায়ই বলতেন। কিন্তু স্যাঁটা শব্দটা কখনও শুনিনি।”
  • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় (প্রখ্যাত সাহিত্যিক): তিনি স্পষ্ট ভাষায় নিজের অমত জানিয়ে বলেন, “এটি ভাল শব্দ নয়। যৌনাঙ্গ অর্থে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।”
  • যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক): “স্যাঁটা খুবই কথ্য ভাষা। মূলত কোমর এবং তৎসংলগ্ন অংশ বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।”

অভিধান কী বলছে? সত্ৰাজিৎ গোস্বামী লিখিত ‘বাংলা অকথ্য শব্দের অভিধান’ অনুযায়ী, ‘স্যাঁটা’ শব্দের অর্থ হলো যৌনাঙ্গ। ধিক্কার বা ঘৃণা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়। অভিধানে এই শব্দের উৎস হিসেবে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া ও পাবনা অঞ্চলের কথা উল্লেখ রয়েছে।

রাজনীতিকদের শব্দচয়ন ও অতীত বিতর্ক

রাজনৈতিক নেতাদের মুখে এমন অপ্রচলিত বা বিতর্কিত শব্দের ব্যবহার অবশ্য এই প্রথম নয়। অতীতেও এমন বহু শব্দ নিয়ে সীমানার দুই পারেই তোলপাড় হয়েছে।

যেমন ২০১৩ সালে বাংলাদেশের সংসদে বিএনপি-র সাংসদ রেহানা আক্তার রানু ফেনী অঞ্চলের ভাষা ব্যবহার করে বলেছিলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়া কোনও চুদুরবুদুর চইলত না।” সেই সময় ‘চুদুরবুদুর’ শব্দটির অর্থ ও শালীনতা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল। যদিও তৎকালীন সময়ে ভাষাবিদ পবিত্র সরকার ও ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নির্মল দাস জানিয়েছিলেন যে, শব্দটি অশ্লীল নয়; গ্রামীণ কথ্য ভাষায় ‘বাড়াবাড়ি করা’ বা ‘গড়িমসি করা’ অর্থে এটি ব্যবহৃত হয়।

তবে অতীতের সেই ‘চুদুরবুদুর’ বিতর্কের স্মৃতি ফিরিয়ে এবার রাজ্য রাজনীতি আর সমাজমাধ্যম তপ্ত উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর ‘স্যাঁটা গরম’ মন্তব্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.