মন্ত্রোচ্চারণ ও যাগযজ্ঞের মাধ্যমে কলকাতায় বহুল চর্চিত মিড-ডে মিলের পাইলট প্রজেক্টের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো। নতুন বাজেটে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ অগস্ট থেকে কলকাতা পুর এলাকার সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিলের খাবার সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্বনামধন্য সংস্থা ‘ইসকন’-কে। শনিবার তারাতলায় ইসকনের ‘সেন্ট্রাল কিচেন’ থেকে এই প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
তবে প্রকল্পের শুরুর দিনেই কলকাতার কয়েকটি স্কুলে খাবার সময়মতো না পৌঁছানোয় চরম বিভ্রান্তি ও ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। প্রথম দিনে গোটা শহরের প্রায় ১,৮০০টি স্কুলের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে আনুমানিক ৫০০টি স্কুলের ৪৪ হাজার পড়ুয়ার কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু তালিকাভুক্ত একাধিক স্কুলে ছুটির পর দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও পড়ুয়ারা খাবার পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
মধ্য কলকাতার এমনই একটি প্রাথমিক স্কুলে খাবার আসবে জেনে শনিবার আলাদা করে রান্না করা হয়নি। প্রায় ১১০ জন পড়ুয়া ও তাঁদের অভিভাবকেরা খাবারের আশায় অপেক্ষা করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো খাবার এসে পৌঁছায়নি। পরবর্তীতে পাশের একটি স্কুলে আসা অতিরিক্ত খাবার এনে কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দেন শিক্ষকেরা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধানশিক্ষিকা আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান যে, অভিভাবকদের আগে থেকেই নতুন ব্যবস্থার কথা জানানো সত্ত্বেও পড়ুয়াদের খালি পেটে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।
খাবারের মান নিয়েও মিশেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। যে সমস্ত স্কুলে খাবার পৌঁছেছে, সেখানকার মেনুতে ছিল ভাত এবং আলু, মটর ও সামান্য পনির দিয়ে তৈরি নিরামিষ তরকারি। শিক্ষকদের একাংশের মতে, তরকারিটি সুস্বাদু হলেও ভাতের মান বেশ খারাপ ছিল। অবশ্য এই অভিযোগের জবাবে বিকাশ ভবনের তরফে জানানো হয়েছে, ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার (FCI) পরামর্শ অনুযায়ী শিশুদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে অতিরিক্ত প্রোটিনযুক্ত বিশেষ চাল ব্যবহার করা হয়েছে, তাই এটি প্রচলিত সরু চালের মতো নয়।
অন্যদিকে, বেশ কিছু স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সময়মতো খাবার পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলের প্রধানশিক্ষক রবিশঙ্কর পাল এবং হেয়ার স্কুল কর্তৃপক্ষের মতে, শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে সুস্বাদু খাবার পেয়েছে।
তবে প্রথম পর্যায়ে শহরের সব অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত না করায় দেখা দিয়েছে তথ্যের ঘাটতি। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কলকাতার ১২ নম্বর সার্কেলের স্কুলগুলিকে প্রথম পর্বের বাইরে রাখা হয়েছিল। সেখানে পুরনো নিয়মেই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হয়। সংশ্লিষ্ট এলাকার এক প্রধানশিক্ষক জানান, ১ অগস্ট থেকে নতুন পরিষেবা চালুর কথা শুনলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে আগে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি।
বিষয়টি নিয়ে বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, কেন প্রথম দিনে খাবার না পাওয়ার দায় শিক্ষকদের ওপর পড়বে? তবে বেশ কিছু স্কুলের প্রধানশিক্ষক মনে করছেন, এত বড় একটি প্রকল্পের সূচনাপর্বে কিছু ছোটখাটো সমস্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
শিক্ষাদপ্তর ও বিকাশ ভবনের আধিকারিকেরা নিশ্চিত করেছেন যে, প্রথম দিনের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে কলকাতার সমস্ত স্কুলে এই পরিষেবা সম্প্রসারিত করা হবে এবং আগামী সোমবার থেকেই নির্ধারিত ৫০০টি স্কুলে সঠিক সময়ে মানসম্মত খাবার পৌঁছে দেওয়া নিশ্চিত করা হবে।

