প্রাথমিকে নিয়োগ দুর্নীতি মামলা এবং বিধানসভায় সই জাল কাণ্ডকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করল কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তদন্তকারী সংস্থা। সোমবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর আধিকারিকরা প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে।
তদন্ত প্রক্রিয়া এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সিজিও কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
১১ ঘণ্টার ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ ও অভিষেকের প্রতিক্রিয়া
সোমবার বেলা ১১টা নাগাদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইডি দফতরে হাজির হতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের কিছু আগেই তিনি সিজিও কমপ্লেক্সে পৌঁছে যান। এরপর রাত ১০টা নাগাদ ইডি দফতর থেকে বেরোন তিনি।
তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন:
“গতকাল (রবিবার) সিআইডি আমাকে তলব করেছিল। আমি গিয়েছিলাম। প্রায় সাড়ে ৮-৯ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আজ সকাল ১১টার আগে এসেছি। ১১ ঘণ্টা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এই ঘটনায় আমাকে শেষ বার ডাকা হয়েছিল ২০২৩ সালে। আমি তখনও এসেছিলাম। সব মিলিয়ে ১০-১২ বার আমি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সামনে উপস্থিত হয়েছি। আমার সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করেছি।”
রাজনৈতিক আক্রমণ ও ‘ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ
ইডি দফতর থেকে বেরিয়েই কেন্দ্রীয় শাসকদল বিজেপি-র বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ শানান তৃণমূল সাংসদ। দল ভাঙানোর রাজনীতি এবং বিরোধীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। ভোটগণনায় কারচুপি এবং এসআইআর (SIR) প্রসঙ্গ তুলে তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিরোধীদের শূন্য করার একটা পরিকল্পিত চেষ্টা গত এক মাস ধরে চালানো হচ্ছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আরও অভিযোগ করেন, “বিরোধীরা যাতে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি না-পায় সেই কারণে ষড়যন্ত্র হয়েছে। দল ভাঙানো, বিধায়ক-সাংসদ ভাঙানো হয়েছে। এ সব করে কোনও লাভ নেই। গলা কেটে দিলেও আমরা আত্মসমর্পণ করার লোক নই।”
সিজিও কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা চিত্রে বদল
বিগত সময়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দিতে গেলে যে ধরনের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা তৎপরতা চোখে পড়ত, সোমবার তার ব্যতিক্রম দেখা গেছে। এদিন সিজিও কমপ্লেক্স চত্বরে অতিরিক্ত কোনও পুলিশ বা কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়নি। যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ কিংবা সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মতো বাড়তি সতর্কতামূলক কোনও পদক্ষেপও এবার চোখে পড়েনি।
রবি, সোম ও মঙ্গলের ঠাসা কর্মসূচি: সিআইডি ও ইডির সাঁড়াশি চাপ
তদন্তকারী সংস্থাগুলির সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকদিনে অভিষেকের ওপর জিজ্ঞাসাবাদের চাপ বহুগুণ বেড়েছে:
- রবিবার (সিআইডি): বিধানসভায় সই জাল করার মামলায় ভবানী ভবনে সিআইডি দফতরে সাড়ে আট ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় অভিষেককে। একই মামলায় বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষকেও তলব করা হয়েছিল। সূত্রের খবর, দু’জনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করেন গোয়েন্দারা। ভবানী ভবন থেকে বেরিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে যান অভিষেক।
- সোমবার (ইডি): প্রাথমিকে নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইডি দফতরে ১১ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা।
- মঙ্গলবার ও বুধবার (সিআইডি): মঙ্গলবারও অভিষেককে তলব করেছে সিআইডি। পাশাপাশি, সল্টলেকে দায়ের হওয়া একটি নির্দিষ্ট মন্তব্যের প্রেক্ষিতে বুধবারও তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হবে।
আইনি রক্ষাকবচ ও বর্তমান পরিস্থিতি
| মামলা | আইনি স্থিতি / রক্ষাকবচ |
| বিধানসভা সই জাল মামলা | কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, অভিষেককে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে। তবে আদালত জানিয়েছে, আগামী দু’সপ্তাহ তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ (যেমন গ্রেফতারি) করা যাবে না। |
| প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলা | এই মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও আইনি রক্ষাকবচ নেই। |
| সল্টলেক মন্তব্য মামলা | এই মামলাতেও সাংসদের কোনও আইনি রক্ষাকবচ নেই। |
জিজ্ঞাসাবাদের মূল কারণ ও ইডির নজর
প্রাথমিকে নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে ইডি মূলত দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছে:
- সিবিআই চার্জশিটের অডিও ক্লিপ: পূর্বে সিবিআই তদন্তে একটি অডিও ক্লিপ সামনে এসেছিল, যেখানে জনৈক ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়’-এর নাম উল্লেখ করে চাকরি বিক্রির টাকা পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। এই অডিওর সত্যতা যাচাইয়ে ‘কালীঘাটের কাকু’ ওরফে সুজয়কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠস্বরের নমুনাও পরীক্ষা করা হয়। ইডি এখন সেই অডিও সূত্রটিকে নিজেদের তদন্তের পরিধিতে এনে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
- লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ড্স: অভিষেকের সংস্থা ‘লিপ্স অ্যান্ড বাউন্ড্স’-এর আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত নথিপত্র এবং সন্দেহজনক খতিয়ান নিয়ে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর আগেও এই বিষয়ে তাঁকে একাধিকবার প্রশ্ন করা হয়েছিল।

