বাবার স্বপ্নপূরণে ইতিহাস গড়লেন অস্মিতা দে, কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় ভারতের প্রথম সোনা

বাবার স্বপ্নপূরণে ইতিহাস গড়লেন অস্মিতা দে, কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় ভারতের প্রথম সোনা

মাত্র ছয় মাস আগে বাবার মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিল জীবন। একসময় মনে হয়েছিল, জুডো ক্যারিয়ার হয়তো আর এগোবে না। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে বাবার স্বপ্ন পূরণ করলেন ত্রিপুরার জুডোকা অস্মিতা দে। গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় ভারতের ইতিহাসে প্রথম সোনার পদক জিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেন ২৩ বছরের এই ক্রীড়াবিদ।

শুক্রবার অনুষ্ঠিত ফাইনালে কানাডার হেইদি কুয়াচকে পরাজিত করে সোনা নিশ্চিত করেন অস্মিতা। এর আগে কোয়ার্টার ফাইনালে স্কটল্যান্ডের এভা এউইং এবং সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডের সুমের শ-কে হারিয়ে ফাইনালে ওঠেন তিনি। এই জয়ের মধ্য দিয়ে কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় ভারতের দীর্ঘদিনের সোনার অপেক্ষার অবসান ঘটল। এর আগে ভারতীয় জুডোকারা পাঁচটি রুপো ও ছয়টি ব্রোঞ্জ জিতলেও সোনা অধরাই ছিল।

দক্ষিণ ত্রিপুরার বেলোনিয়ার বাসিন্দা অস্মিতার সাফল্যের পথ মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর বাবা অর্জুন কুমার দে ছিলেন একজন সাইকেল মেকানিক। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ টাকা আয়ে সংসার চালাতেন তিনি। স্ত্রী মুন্না, মেয়ে অস্মিতা এবং ছেলে দেবব্রতকে নিয়ে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন পরিবার। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মেয়ের স্বপ্নপূরণে কখনও পিছিয়ে যাননি অর্জুন। এমনকি অস্মিতার খেলার খরচ চালাতে এক লক্ষ টাকার ঋণও নিয়েছিলেন।

তবে মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখে যেতে পারেননি তিনি। কয়েক মাস আগে তাঁর মৃত্যু হয়। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে অস্মিতার মা মুন্না বলেন, “খুব কষ্ট করে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করেছি। গত কয়েক মাস খুব কঠিন ছিল। ওর বাবার সাইকেল সারাইয়ের দোকানের আয়ে সংসারই ঠিকমতো চলত না। তবু মেয়েকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখত। তার জন্য এক লক্ষ টাকা ঋণও নিয়েছিল। যদি আজ ওর বাবা মেয়ের এই সোনাজয় দেখে যেতে পারতেন।”

বাবার মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন অস্মিতা। গ্লাসগোতে সোনা জয়ের পর সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে তিনি বলেন, “বাবা মারা যাওয়ার পর ভেবেছিলাম, আমার সব শেষ। কারণ বাবাই আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। আমি যেখানে জন্মেছি, সেখানকার মেয়েরা এত বড় স্বপ্ন দেখার সাহস পায় না। কিন্তু বাবা সব সময় আমার পাশে ছিল। তাই সোনা জেতার পর বারবার বাবার কথাই মনে পড়ছে।”

এই সাফল্যের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছেন অস্মিতা। প্রতিযোগিতার আগে মানসিক চাপ এতটাই ছিল যে, রাতে ঘুমাতেও পারতেন না। তিনি বলেন, “খুব পরিশ্রম করেছি। এই প্রতিযোগিতায় নামার আগে ঘুমোতে পারতাম না। ক্লান্ত শরীরেও ঘুম আসত না। ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠে অনুশীলন শুরু করতাম। সব সময় ভাবতাম, সবাইকে হারিয়ে আমাকে জিততেই হবে।”

অস্মিতার জুডো যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে বেলোনিয়ার বিদ্যাপীঠ কোচিং সেন্টারে। সেখানে কোচ বীণা দেবনাথের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন। আর্থিক অনটনের কারণে অনেক সময় বাড়ি ফেরার বাসভাড়াও থাকত না তাঁর। সেই সময় নিজের বাড়িতেই প্রায় দু’বছর অস্মিতাকে আশ্রয় দেন বীণা দেবনাথ। তিনি বলেন, “ওরা খুব গরিব পরিবার। কিন্তু অস্মিতাকে দেখে বোঝা যেত, ও কিছু করতে চায়। যতটা পেরেছি সাহায্য করেছি। আজ ওর এই সাফল্য সম্পূর্ণ ওর কঠোর পরিশ্রমের ফল।”

২০১৫ সালে আগরতলার ত্রিপুরা স্পোর্টস স্কুলে কোচ মানিক লাল দেবের তত্ত্বাবধানে অনুশীলনের সুযোগ পান অস্মিতা। ত্রিপুরা জুডো সংস্থার সচিব প্রণব সাহার সহযোগিতায় তাঁর প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য খরচ বহন করা হয়। মানিক লাল দেব বলেন, “শুরু থেকেই ওর মধ্যে প্রতিভা ছিল। শারীরিক সক্ষমতা ও টেকনিক উন্নত করার দিকে আমরা বিশেষ নজর দিয়েছি। অনেক সময় নিজেরাই টাকা জোগাড় করে ওর খরচ মিটিয়েছি। আজ ও আমাদের সেই পরিশ্রমের সার্থকতা ফিরিয়ে দিয়েছে।”

জুনিয়র পর্যায়ের পর স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (সাই)-এর ভোপাল কেন্দ্রে যোগ দেন অস্মিতা। ২০২৩ সালে জুনিয়র এশিয়া কাপে ৪৮ কেজি বিভাগে সোনা জেতার পর এশিয়ান ওপেনে রুপো জয় করেন। ২০২৪ সালের কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপে জেতেন ব্রোঞ্জ। আর এবার কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতে নিজের ক্যারিয়ারের পাশাপাশি ভারতীয় জুডোর ইতিহাসেও নতুন মাইলফলক স্থাপন করলেন তিনি।

অস্মিতার বর্তমান কোচদের অন্যতম মানিক লাল দেবের মতে, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক উন্নতিই তাঁকে এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি বলেন, “যশপাল সোলাঙ্কির কোচিংয়ে ও অনেক কিছু শিখেছে। জুনিয়র থেকে সিনিয়র পর্যায়ে উঠে অনেকেই হারিয়ে যায়, কিন্তু অস্মিতা নিজেকে ধরে রেখেছে। কমনওয়েলথে ওর সোনা সেই পরিশ্রমেরই স্বীকৃতি। ওর বাবা নিশ্চয়ই উপর থেকে সব দেখছেন এবং মেয়েকে আশীর্বাদ করছেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.