উত্তর-পশ্চিম থেকে শুরু করে উত্তর ও পূর্ব ভারত— দেশের এক বিস্তীর্ণ অংশ এখন তীব্র দাবদাহে জ্বলছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, গত মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটের সময় এক নজিরবিহীন রেকর্ডের সাক্ষী হয়েছে দেশ। ‘একিউআই ডট ইন’-এর লাইভ তাপমাত্রা র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ ১০০টি শহরের সব ক’টিই ছিল ভারতের। এই তালিকায় নয়াদিল্লি, ফরীদাবাদ, চণ্ডীগড়, আগরা, গোয়ালিয়র, কোটার মতো চেনা গরমের শহরের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে জম্মু এবং উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ের পাদদেশের শহর হরিদ্বারও। আগামী এক সপ্তাহ এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই মেলার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (আইএমডি)।
উত্তরপ্রদেশে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি, দিল্লিতে তীব্র অস্বস্তি
গত দু’দিন আগেই উত্তরপ্রদেশের বন্দীতে পারদ ছুঁয়েছিল সর্বোচ্চ ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী দিল্লিতেও তাপমাত্রা ৪৪ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। দিল্লি বা উত্তরপ্রদেশই নয়, পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, তেলঙ্গানা এবং রাজস্থানসহ দেশের এক বড় অংশ তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে।
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের কোনো কোনো শহরে তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৪৭ ডিগ্রির আশেপাশে ঘুরছে, আর পূর্ব ভারতে তা রয়েছে ৪০ থেকে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের মতে, আগামী কয়েক দিন এই অঞ্চলের দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যেই থাকবে।
রাতেও মিলছে না রেহাই: রঙের সংকেতে সতর্কবার্তা
দিনের বেলার পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আবহবিদেরা। দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশসহ উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪-৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকছে। দিল্লিতে রাতের তাপমাত্রা ৩১ ডিগ্রির কাছাকাছি পৌঁছানোয় রাতেও চরম হাঁসফাঁস পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে আবহাওয়া দফতর বিভিন্ন রাজ্যে রঙের সংকেতে সতর্কতা জারি করেছে:
- লাল সতর্কতা (উত্তরপ্রদেশ): দুই দিনেরও বেশি সময় ধরে তীব্র তাপপ্রবাহ স্থায়ী হবে।
- কমলা সতর্কতা (দিল্লি): দুই দিন তীব্র তাপপ্রবাহের পর আরও চার দিন বা তার বেশি সময় ধরে তাপপ্রবাহ চলবে।
- হলুদ সতর্কতা: টানা দুই দিন ধরে তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি বজায় থাকবে।
রাজ্যভিত্তিক তাপপ্রবাহের স্থায়িত্বকাল
মৌসম ভবনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আগামী ২৭ মে পর্যন্ত তাপপ্রবাহ ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বজায় থাকবে। রাজ্যভিত্তিক সময়সীমা নিচে দেওয়া হলো:
| রাজ্য / অঞ্চল | তাপপ্রবাহের স্থায়িত্বকাল |
| হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, দিল্লি, ঝাড়খণ্ড | ২৭ মে পর্যন্ত |
| পশ্চিম রাজস্থান | ২৫ থেকে ২৭ মে |
| পূর্ব রাজস্থান | ২৭ মে পর্যন্ত |
| পূর্ব মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা, উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশ | ২৫ মে পর্যন্ত |
| বিহার, তেলঙ্গানা | ২৪ মে পর্যন্ত |
উত্তর ও উত্তর-পূর্বে বিপরীত ছবি: ধেয়ে আসছে পশ্চিমি ঝঞ্ঝা
তীব্র দাবদাহের মধ্যেই উত্তর ভারত এবং হিমালয় অঞ্চলে একটি সুবিশাল পশ্চিমি ঝঞ্ঝা সৃষ্টি হচ্ছে। গত ২১ মে-র উপগ্রহ চিত্রে দেখা গিয়েছে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং সংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম ভারত জুড়ে একটি বিশাল মেঘবলয় অবস্থান করছে, যা ধীরে ধীরে হিমালয় অঞ্চল ও উত্তর ভারতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
অন্য দিকে, সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি দেখা যাবে উত্তর-পূর্ব ভারতে। অসম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, ত্রিপুরা এবং মিজ়োরামে আগামী কয়েক দিন ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টির সতর্কতাও জারি করেছে মৌসম ভবন।
জ্যৈষ্ঠের উত্তাপে পুড়ছে কলকাতা, আপাতত ভারী বৃষ্টির আশা নেই
কলকাতায় জ্যৈষ্ঠের চড়া রোদে সাধারণ মানুষের অবস্থা নাজেহাল। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, কলকাতায় আপাতত বড় কোনো ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। স্থানীয়ভাবে দু’-এক জায়গায় সামান্য দু-এক পশলা বৃষ্টি হলেও তাতে গরম কমবে না। তবে কলকাতার ভাগ্যে শিকে না ছিঁড়লেও দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলা ভিজতে পারে এবং উত্তরবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ জারি থাকবে।
শুক্রবার সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ২৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ২.৯ ডিগ্রি বেশি। এর আগে বৃহস্পতিবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ০.৬ ডিগ্রি বেশি। বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বাসিন্দাদের বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।

