ভারতসেরা ইস্টবেঙ্গল! ২২ বছর পর, কিশোর ভারতীতে অবশেষে স্বপ্নপূরণ, যুবভারতীতে জিতেও গোলপার্থক্যে দুইয়ে মোহনবাগান

ভারতসেরা ইস্টবেঙ্গল! ২২ বছর পর, কিশোর ভারতীতে অবশেষে স্বপ্নপূরণ, যুবভারতীতে জিতেও গোলপার্থক্যে দুইয়ে মোহনবাগান

যোগ্য দল হিসেবেই অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ‘ভারতসেরা’র মুকুট মাথায় তুলল ইস্টবেঙ্গল এফসি। কিশোরভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আয়োজিত ইন্ডিয়ান সুপার লিগের (ISL) হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও ইন্টার কাশীকে ২-১ গোলে পরাজিত করল লাল-হলুদ ব্রিগেড। আর এই জয়ের সাথে সাথেই প্রথমবার আইএসএল ট্রফি জয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ ২২ বছর পর জাতীয় স্তরের লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল ক্লাবটি।

ম্যাচের ২৪ ঘণ্টা আগে ইস্টবেঙ্গলের প্রধান কোচ অস্কার ব্রুজো দলের ছেলেদের কাছ থেকে শেষ ৯০ মিনিটে নিজেদের সেরাটা উজার করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কোচের সেই ডাকে সাড়া দিয়ে মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের সেরাটা দিলেন মিগুয়েল ফিগুয়েরা, রশিদ ও ইউসেফ এজ়েজারিরা।

টানটান উত্তেজনা ও গোলপার্থক্যের রোমাঞ্চকর লড়াই

লিগের শেষ দিনে ইস্টবেঙ্গলের পাশাপাশি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগান সুপার জায়ান্টেরও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ ছিল। তবে তার জন্য সবুজ-মেরুনকে নিজেদের ম্যাচে জেতার পাশাপাশি তাকিয়ে থাকতে হতো ইস্টবেঙ্গলের পয়েন্ট নষ্টের দিকে।

যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আয়োজিত অপর ম্যাচে এসসি দিল্লির বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে জয় ছিনিয়ে নেয় মোহনবাগান। দলের হয়ে গোল দুটি করেন মনবীর সিংহ ও জেমি ম্যাকলারেন।

দলম্যাচপয়েন্টগোলপার্থক্য ও অবস্থান
ইস্টবেঙ্গল এফসি১৩২৬চ্যাম্পিয়ন (গোলপার্থক্যে এগিয়ে)
মোহনবাগান এসজি১৩২৬রানার্স-আপ
মুম্বই সিটি এফসি১৩তৃতীয় স্থান (পঞ্জাবকে ২-০ গোলে হারিয়ে)

লিগের শেষে দুই প্রধানই ১৩ ম্যাচে ২৬ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ছিল। তবে লিগের একটি ম্যাচে মহমেডান স্পোর্টিংকে ৭-০ গোলে হারানোর বড় সুবিধা পায় ইস্টবেঙ্গল। ফলে গোলপার্থক্যে এগিয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ন হয় লাল-হলুদ। অন্যদিকে সমান পয়েন্ট নিয়েও রানার্স-আপ হয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয় গত দু’বারের চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগানকে।

প্রথমার্ধে ধাক্কা এবং এজ়েজারির সমতা ও ‘সোনার বুট’

কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৮,১১২ জন লাল-হলুদ সমর্থককে স্তব্ধ করে দিয়ে ম্যাচের ১৪ মিনিটের মাথায় এগিয়ে যায় ইন্টার কাশী। সুমিত পাসির একটি লম্বা পাস ধরে চমৎকার টোকায় ইস্টবেঙ্গল গোলরক্ষক প্রভসুখন সিংহ গিলকে পরাস্ত করে গোল করেন আলফ্রেড প্লানাস।

পিছিয়ে পড়লেও আক্রমণাত্মক ফুটবল বজায় রাখে ইস্টবেঙ্গল। বিশেষ করে বাঁ প্রান্ত ধরে বিপিন সিংহের একের পর এক ক্রস ইন্টার কাশীর বক্সে ভাসতে থাকে। ম্যাচের প্রথমার্ধে ইউসেফ এজ়েজারি গোলের একটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। পয়েন্ট তালিকায় ইন্টার কাশী অনেক পিছিয়ে থাকলেও প্রথমার্ধে তারা ইস্টবেঙ্গল রক্ষণকে বেশ কয়েকবার কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল, তবে প্রভসুখন দলকে আর কোনো গোল খেতে দেননি। ফলে ০-১ গোলে পিছিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় লাল-হলুদ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে অস্কারের ছেলেরা। ফল মেলে দ্রুত। ৪৯ মিনিটের মাথায় ইন্টার কাশীর গোলরক্ষক শুভম ধাসের একটি মারাত্মক ভুলের সুযোগ নিয়ে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান ইউসেফ এজ়েজারি। এই গোলের পাশাপাশি চলতি মরসুমে লিগের সর্বাধিক গোলদাতা হয়ে ‘সোনার বুট’ (Golden Boot) নিজের নামে নিশ্চিত করলেন ইস্টবেঙ্গলের এই ফরোয়ার্ড।

রশিদের জয়সূচক গোল ও ঐতিহাসিক শিরোপা লাভ

ম্যাচে সমতা ফিরলেও ড্র করতে রাজি ছিলেন না লাল-হলুদ কোচ অস্কার ব্রুজো। জয় নিশ্চিত করতে তিনি আক্রমণভাগে একের পর এক বদল এনে শক্তি বাড়ান। ম্যাচের ৭২ মিনিটের মাথায় কাঙ্ক্ষিত গোলটি পায় ইস্টবেঙ্গল। উইঙ্গার বিপিন সিংহের নিখুঁত ক্রস থেকে বক্সে পা ছুঁইয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন মহম্মদ রশিদ। চলতি মরসুমে এটিই রশিদের প্রথম গোল এবং এই গোলটিই ইস্টবেঙ্গলকে চ্যাম্পিয়নের ট্রফি এনে দেয়।

গোলের পরেই আনন্দের আতিশয্যে মাঠের ফেন্সিংয়ের ওপর উঠে সমর্থকদের সঙ্গে উল্লাসে মাতেন রশিদ। ডাগআউটে কোচ অস্কারের চোখে-মুখেও তখন স্বস্তির ছাপ। ম্যাচের বাকি সময়ে আর কোনো ভুল করেনি ইস্টবেঙ্গল। কারণ অপর ম্যাচে ততক্ষণে মুম্বই এগিয়ে থাকায় এই ম্যাচ ড্র হলে ট্রফি হাতছাড়া হতো লাল-হলুদের। ফলে অস্কারের ডিফেন্ডাররা ইন্টার কাশীর সমস্ত আক্রমণ সামলে দলের ২-১ ব্যবধানের লিড ধরে রাখে।

রেফারি ম্যাচ শেষের শেষ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই স্টেডিয়াম জুড়ে শুরু হয় বাঁধনভাঙা উল্লাস। কোচ, ফুটবলার ও গ্যালারির হাজার হাজার লাল-হলুদ জনতা ২২ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা শেষের আনন্দে মেতে ওঠেন। মাঠের লড়াইয়ে ইস্টবেঙ্গল ভারতসেরা হলেও, যুবভারতীতে জিতেও ট্রফি হাতছাড়া হওয়ায় শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়েই মাঠ ছাড়তে হয় সবুজ-মেরুন সমর্থকদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.