কানাডার ক্রিকেটে বিতর্ক বাড়ছে, এ বার বোর্ডের নতুন সভাপতির বাড়ি লক্ষ্য করে চলল গুলি

কানাডার ক্রিকেটে বিতর্ক বাড়ছে, এ বার বোর্ডের নতুন সভাপতির বাড়ি লক্ষ্য করে চলল গুলি

তীব্র প্রশাসনিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ অপরাধের জালে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে কানাডা ক্রিকেট বোর্ড (Cricket Canada)। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচ গড়াপেটার (Match-fixing) গুরুতর অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটল। কানাডা ক্রিকেট বোর্ডের নবনিযুক্ত সভাপতি অরবিন্দ খোসার বাড়ি লক্ষ্য করে প্রকাশ্যেই গুলি চালাল অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা।

বুধবার ভোর ৪টে ৪০ মিনিট নাগাদ সারে (Surrey) এলাকায় অরবিন্দ খোসার বাসভবনে এই হামলা চালানো হয়। গুলি চলার সময় ক্রিকেট কর্তা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরেই উপস্থিত ছিলেন। তবে সৌভাগ্যবশত এই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। পুলিশ ঘটনার তদন্তে নেমে জানিয়েছে, অরবিন্দের বাড়ির মূল প্রবেশদ্বারে পাঁচটি বুলেটের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। এলাকার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখে স্থানীয় কোনো অপরাধী গোষ্ঠী এর নেপথ্যে রয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

কানাডিয়ান ক্রিকেটে কুখ্যাত ‘বিষ্ণোই’ গ্যাংয়ের ছায়া

কানাডা ক্রিকেটের এই নগ্ন রূপটি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এনেছে কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনের (CBC) বিখ্যাত তথ্যচিত্র ভিত্তিক অনুষ্ঠান ‘দ্য ফিফথ এস্টেট’। তাদের ‘কোরাপশন, ক্রাইম অ্যান্ড ক্রিকেট’ (Corruption, Crime and Cricket) শীর্ষক পর্বে দাবি করা হয়েছে, কানাডার ক্রিকেট পরিকাঠামো এখন ভারতের কুখ্যাত অপরাধী লরেন্স বিষ্ণোই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে।

তথ্যচিত্রের বিস্ফোরক দাবি অনুযায়ী, কানাডা ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় দলের খেলোয়াড় নির্বাচন— সব ক্ষেত্রেই বিষ্ণোই গ্যাং সরাসরি প্রভাব খাটায়। দলের রাশ কার হাতে থাকবে এবং কোন কোন ক্রিকেটার খেলবেন, তা এই গ্যাংই নির্ধারণ করে দেয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কানাডা ক্রিকেটের এক সূত্র সেই তথ্যচিত্রে দাবি করেছেন:

“ইংল্যান্ডের সারের একটি রেস্তোরাঁয় গোপন বৈঠক হয়েছিল। সেখানে এক ক্রিকেট কর্তাকে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয় কোন কোন ক্রিকেটারকে দলে রাখতে হবে এবং কাদের কোনোভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না। নির্দেশ অমান্য করলে ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দেওয়া হয়। পরিস্থিতি এতটাই আতঙ্কের ছিল যে, ওই কর্মকর্তা এরপর জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের সাথে কথা বলতেও ভয় পেতেন।”

হুমকি, ইস্তফা ও টি-২০ বিশ্বকাপে গড়াপেটার অভিযোগ

তথ্যচিত্রে আরও বলা হয়েছে, বিষ্ণোই গোষ্ঠীর কথামতো কয়েকজন নির্দিষ্ট ক্রিকেটারের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করায় জাতীয় দলের এক সদস্যকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। নিরাপত্তার অভাবে ক্রিকেটাররা কানাডা পুলিশের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন। এর আগেও বিষ্ণোই গ্যাংয়ের নির্দেশ না মানায় এক শীর্ষ ক্রিকেট কর্তার বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাঁকে জোরপূর্বক ইস্তফা দিতে বাধ্য করা হয়। এই ভয়ার্ত পরিবেশের কারণে ক্রিকেটার বা কর্মকর্তারা হতাশা ও অবসাদে ভুগলেও, প্রকাশ্যে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না কেউ।

এই অপরাধমূলক হস্তক্ষেপের সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা গিয়েছে গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপের মাত্র এক মাস আগে আচমকাই কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সফল অধিনায়ক নিকোলাস কর্টনকে সরিয়ে দিলপ্রীত বাজওয়াকে অধিনায়ক করা হয়। বোর্ডের এই সিদ্ধান্তে খোদ কোচ ও কর্টন বিস্মিত হয়েছিলেন।

আইসিসি (ICC)-র রাডারে নিউ জিল্যান্ড ম্যাচ

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউ জিল্যান্ডের বিরুদ্ধে কানাডার গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচ নিয়ে বর্তমানে তদন্তে নেমেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (ICC) দুর্নীতি দমন শাখা (ACU)। ম্যাচটিতে মূল সন্দেহের তির অধিনায়ক দিলপ্রীত বাজওয়ার দিকেই।

বিতর্কিত ওভারের খতিয়ান:

নিউ জিল্যান্ড ইনিংসের পঞ্চম ওভারে বল করতে আসেন বাজওয়া। সেই ওভারে তিনি একটি ‘নো বল’ এবং লেগ স্টাম্পের অনেক বাইরে দুটি ‘ওয়াইড’ বল করেন। তাঁর করা ওই ওভার থেকে কিউইরা সহজেই ১৫ রান তুলে নেয়। বাজওয়ার আগে বল করতে আসা জসকরণ সিং এবং ডিলন হেলিগারও ২ ওভারে ৩৫ রান বিলিয়েছিলেন। অথচ, ওই একই পিচে সাদ বিন জাফর মেডেন ওভারসহ ১টি উইকেট নেন এবং হেলিগার তাঁর দ্বিতীয় ওভারে মাত্র ৫ রান দিয়ে ১ উইকেট পেয়েছিলেন। এই অস্বাভাবিক বোলিংয়ের কারণেই গড়াপেটার তত্ত্ব জোরালো হয়েছে।

ক্রমাগত অপরাধমূলক সংশ্লেষ ও গড়াপেটার অভিযোগে বিশ্ব ক্রিকেটে এখন একঘরে হয়ে পড়েছে কানাডা ক্রিকেট বোর্ড। তবে ক্রিকেট কর্তাদের একাংশ আইসিসির তদন্তের ওপর আস্থা রাখছেন। তাঁরা ‘দ্য ফিফথ এস্টেট’-কে জানিয়েছেন, আইসিসির পরামর্শ মেনে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে কানাডার ক্রিকেটকে এই কলঙ্কমুক্ত করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। কিন্তু তার মাঝেই নতুন সভাপতির বাড়িতে এই হামলা প্রমাণ করছে, ক্রিকেট বোর্ডের অন্দরে অপরাধ জগতের শিকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.