বারুইপুর এনকাউন্টার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: তাৎক্ষণিক বিচারের জনপ্রিয়তায় উদ্বিগ্ন আইনজ্ঞরা

বারুইপুর এনকাউন্টার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: তাৎক্ষণিক বিচারের জনপ্রিয়তায় উদ্বিগ্ন আইনজ্ঞরা

বারুইপুরে ১১ বছরের কিশোরীকে গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি ‘এনকাউন্টারে’ মৃত্যু রাজ্যজুড়ে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় ধৃত প্রভাস পুলিশের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান; আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালালে তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যে সন্তোষ ও উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও, বিচারবহির্ভূত এই ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ এবং বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের আইনজ্ঞ, সাবেক বিচারক ও মানবাধিকার কর্মীরা।

জনমানসে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’-এর উল্লাস ও বিরোধিতা

জনগণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাংশ এই এনকাউন্টারকে ‘উপযুক্ত ও দ্রুত বিচার’ বলে স্বাগত জানালেও, নিহত প্রভাসের পরিবার ও রাজনৈতিক বিরোধীরা পুলিশি বয়ানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঘটনার পেছনে কোনো ‘সাজানো নাটক’ বা বৃহত্তর ষড়যন্ত্র আড়ালের চেষ্টা রয়েছে কি না, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।

এমনকি নির্যাতিতার পরিবারও এই ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। নির্যাতিতার কাকিমার অভিযোগ, “ও তো অন্য অভিযুক্তদের নাম বলছিল! আসামিদের নাম ফাঁস করছিল বলেই হয়তো ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমরা এই ঘটনায় খুশি নই।”

বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ও আস্থার সংকট

দীর্ঘদিন ধরে মামলা ঝুলে থাকা এবং অপরাধীদের যথাসময়ে শাস্তি না হওয়াকেই আমজনতার বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানোর মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

উচ্চতম আদালতের সাবেক বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে জানান, বিচার আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তবে বিচারালয়ের বাইরে ‘বিচার’ সেরে নেওয়ার এই প্রবণতার জন্য তিনি কেবল সাধারণ মানুষকে দায়ী করছেন না। তাঁর মতে, “বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে মানুষ আইনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারাচ্ছে, যা আইনের শাসনে বিশ্বাসীদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সঠিক বিচারে শুধু আদালত নয়, পুলিশ ও সরকারি আইনজীবীদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কামদুনি গণধর্ষণ মামলার উদাহরণ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যেখানে বারবার সরকারি আইনজীবী পরিবর্তন হয়, সেখানে দ্রুত বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সংখ্যাতত্ত্ব ও মামলার পাহাড়

সরকারি তথ্য ও ‘ন্যাশনাল জুডিশিয়াল ডেটা গ্রিড’ (NJDG)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী:

  • শাস্তির হার: দেশে গত দুই দশকে হত্যা মামলায় শাস্তির হার মাত্র ৪০-৪৫ শতাংশ এবং ধর্ষণের ক্ষেত্রে এই হার ২০-২৫ শতাংশ।
  • বিচারাধীন মামলা: ২০২৬ সালের মার্চ মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের হাইকোর্টগুলিতে প্রায় ৬৪ লক্ষ এবং নিম্ন আদালতগুলিতে প্রায় ৫ কোটি মামলা বিচারাধীন।
  • দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া: গোটা দেশে ৫২ লক্ষেরও বেশি মামলা ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে রয়েছে, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই রয়েছে সাড়ে সাত লক্ষের বেশি মামলা।

এনকাউন্টার রাজ ও আইনি বিপদ

মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র মনে করেন, জনমতের চাপে বিচার বা এনকাউন্টার কখনোই কোনো সভ্য সমাজ বা ন্যায়বিচারের মাপকাঠি হতে পারে না। এনকাউন্টারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিচারের সংস্কৃতিতে নির্দোষ ব্যক্তির বলির পাঁঠা হওয়ার বা মূল অপরাধীদের আড়াল করার ঝুঁকি থেকে যায়, যা ব্যবস্থার দায়বদ্ধতাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেয়।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালেও সুপ্রিম কোর্ট এক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছিল যে, এনকাউন্টারকে মহিমান্বিত করা বিপজ্জনক এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া এক দায়হীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে।

বর্তমানে বারুইপুরের এই এনকাউন্টারের ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের সিআইডি (CID)-কে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে পরিকাঠামোগত সংস্কার ও পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও গতিশীল না করা গেলে, ‘তারিখ পে তারিখ’-এর সংস্কৃতি ও বিচারহীনতার এই সামাজিক জটিলতা কাটানো অসম্ভব বলেই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.