নন্দীগ্রামের হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে এবার বড় চমক দিল তৃণমূল কংগ্রেস। মঙ্গলবার বিকেলে দলের প্রার্থিতালিকা ঘোষণার সময় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, নন্দীগ্রাম থেকে ঘাসফুল শিবিরের প্রার্থী হচ্ছেন পবিত্র কর। পেশায় রাজনীতিক পবিত্র এদিন সকালেই অভিষেকের হাত থেকে পতাকা নিয়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন।
শুভেন্দুর গড়ে ঘরের ছেলেকেই অস্ত্র তৃণমূলের
নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের বয়াল অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতা পবিত্র কর একসময় শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০২০ সালে শুভেন্দুর সঙ্গেই তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। তাঁর স্ত্রী বর্তমানে বিজেপির টিকিটে জেতা পঞ্চায়েত প্রধান। রাজনৈতিক মহলের মতে, নন্দীগ্রামে শুভেন্দু যে কজন নেতার ওপর সবথেকে বেশি ভরসা করতেন, পবিত্র তাঁদের অন্যতম। তাঁকে নিজেদের শিবিরে টেনে তৃণমূল মূলত শুভেন্দুর ‘ঘর’ ভাঙার বার্তাই দিতে চাইল।
বয়ালের ‘হিন্দু কার্ড’ বনাম মেরুকরণের রাজনীতি
গত বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের বয়াল ১ ও ২ নম্বর অঞ্চল থেকে বিপুল লিড পেয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। হিন্দু ভোটই ছিল তাঁর জয়ের মূল চাবিকাঠি। পবিত্র কর অতীতে ‘হিন্দু সংহতি’ এবং ‘সনাতনী সেনা’র মতো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তৃণমূলের রণকৌশল হলো, ১ নম্বর ব্লকের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক অটুট রেখে ২ নম্বর ব্লকের হিন্দু ভোটে থাবা বসানো। পবিত্রর পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে বিজেপির হিন্দু ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরাতেই এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করছে আইপ্যাক ও তৃণমূল নেতৃত্ব।
রাজীবের অনীহা ও ডেবরায় বদল
সূত্রের খবর, নন্দীগ্রামে লড়ার জন্য প্রথমে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল প্রাক্তন মন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তমলুক লোকসভার সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকায় তাঁর নাম নিয়ে চর্চা ছিল। কিন্তু রাজীব নিজের পুরনো কেন্দ্র ডোমজুড়েই লড়তে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ডোমজুড়ে টিকিট না পেলেও তাঁকে পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা থেকে প্রার্থী করেছে দল। অন্যদিকে, ডেবরা’র বিদায়ী বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে পাঠানো হয়েছে মুর্শিদাবাদের ডোমকলে।
গুঞ্জন ও পাল্টাপাল্টি যুক্তি
পবিত্র করের মতো তুলনায় ‘হালকা’ ওজনের প্রার্থী দেওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে দ্বিমত রয়েছে:
- তৃণমূলের কৌশল: শুভেন্দু এবার নন্দীগ্রামের পাশাপাশি ভবানীপুরেও লড়ছেন। তৃণমূল দেখাতে চাইছে নন্দীগ্রামে তাদের জয় নিশ্চিত, তাই হেভিওয়েট কাউকে দিয়ে শুভেন্দুকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে নারাজ তারা।
- বিজেপির কটাক্ষ: বিজেপির একাংশের দাবি, পরাজয়ের ভয়েই তৃণমূল নন্দীগ্রামে ‘ওয়াকওভার’ দিয়ে দিল।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এড়াতে ‘নতুন’ মুখ
নন্দীগ্রামে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মেটাতেই স্থানীয় কোনো নেতার বদলে সদ্য দলে আসা পবিত্রকে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আইপ্যাক-এর পরামর্শে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার। প্রার্থিপদ ঘোষণার পরেই তমলুক সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সুজিত রায়কে সঙ্গে নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছেন পবিত্র কর। আগামী ৪ মে ব্যালট বক্সেই নির্ধারিত হবে নন্দীগ্রামের এই রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের ভবিষ্যৎ।

