বেসরকারি হাসপাতাল ও সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত একাধিক চিকিৎসক ‘ভুয়ো’ বলে চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এসেছে। গত কয়েক দিনে অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হাসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোম (এপিএইচএন)-এর পক্ষ থেকে বেশ কিছু নথি প্রকাশ করে এই দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে চিকিৎসক সংগঠনগুলির প্রশ্ন, চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঠিকমতো যাচাই না করেই রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল কীভাবে তাঁদের এ রাজ্যে প্র্যাক্টিস করার অনুমতি দিল?
এপিএইচএন এবং ডব্লিউবিডিএফসহ বিভিন্ন চিকিৎসক সংগঠন ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে এই ঘটনার বিচার চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এর পাশাপাশি, শনিবার একই অভিযোগে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়েছেন আইএমএ রাজ্য শাখার সম্পাদক শান্তনু সেন। আইএমএ বেঙ্গল, ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর্স ফোরাম ও অ্যাসোসিয়েশন অফ হেল্থ সার্ভিসের মতো প্রায় প্রতিটি চিকিৎসক সংগঠনেরই নিশানায় রয়েছেন ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় এবং সহ-সভাপতি সুশান্ত রায়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির নতুন সংগঠন হিসেবে এপিএইচএন আত্মপ্রকাশ করে। ওই সংগঠনের সদস্যদের ঘরোয়া আলোচনায় রাজ্যজুড়ে জাল চিকিৎসকদের একটি চক্র সক্রিয় থাকার বিষয়টি উঠে আসে। সূত্রের খবর, সন্দেহভাজনদের এই তালিকার বেশিরভাগই বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে নিজেদের নাম পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলে নথিভুক্ত করিয়েছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, অন্য রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করে কেউ এ রাজ্যে প্র্যাক্টিস করতে চাইলে তাঁকে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয় এবং সেই নথি যাচাই করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের। আর এখানেই কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে সুদীপ্ত রায় ও সুশান্ত রায়কে।
এপিএইচএনের সম্পাদক রাজীব পাণ্ডে জানান, সন্দেহভাজনদের তালিকা পাওয়ার পর তাঁরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠিত কোনো মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করেছেন কি না, তা জানতে চেয়ে বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলে ইমেল করেছিলেন। সম্প্রতি সেই ইমেলের জবাবে বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিল পাঁচজনের শংসাপত্রকে ‘ফেক’ বা জাল বলে জানিয়েছে। আনন্দবাজার ডট কম-এর হাতে সেই নথির প্রতিলিপিও রয়েছে। অভিযুক্ত ওই পাঁচ জনের মধ্যে দু’জন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক। চিকিৎসক সংগঠনগুলির মতে, এটি কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র, এই কেলেঙ্কারির শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।
এই দুর্নীতির গভীরে পৌঁছানোর জন্যই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে চিঠি দিয়েছেন রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শান্তনু সেন। দ্রুত রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি ও সহ-সভাপতির পদ থেকে সুদীপ্ত রায় ও সুশান্ত রায়কে অপসারিত করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন আইএমএ রাজ্য শাখার সম্পাদক। এ দিন তিনি বলেন, ‘‘উত্তরবঙ্গ লবির কিংপিন ডাক্তার এসপি দাসের নেতৃত্বাধীন সুদীপ্ত রায়, সুশান্ত রায় ও তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা মেডিক্যাল কাউন্সিল, হেল্থ রিক্রুটমেন্ট বোর্ড, স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বাস্থ্যের সর্বক্ষেত্রে পাহাড়সমান দুর্নীতি করেছে। আইএমএ বহুবার এ নিয়ে বিগত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেও কোনো লাভ হয়নি। এখন একের পর এক জাল ডাক্তারের ঘটনা প্রমাণ করছে আমরাই ঠিক ছিলাম।’’
অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিক্যাল কাউন্সিলের সহ-সভাপতি সুশান্ত রায় বলেন, ‘‘নথি যাচাইয়ের বিষয়টি রেজিস্ট্রারের এক্তিয়ারভুক্ত। এখানে সভাপতি বা সহ-সভাপতির করণীয় কিছু নেই। সব কিছুতে আমাদের নাম জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়াপনার উদাহরণ। আরজি কর কাণ্ডেও আমাদের নাম জড়ানো হয়েছিল। সিবিআই, পুলিশ তো তদন্ত করেছে, তাতে আমাদের ভূমিকা কী প্রমাণিত হয়েছে?’’
কাউ কাউন্সিলের সভাপতি সুদীপ্ত রায় এ বিষয়ে বলেন, ‘‘যাঁদের বিরুদ্ধে ভুয়ো ডাক্তারের অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের রেজিস্ট্রেশন ২০২২ সালের আগের। আমি তখন সভাপতি ছিলাম না। আমাদের কাছে তো কেউ কোনো অভিযোগ করছে না। তবুও আমরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত শুরু করেছি। অভিযোগ সত্যি প্রমাণিত হলে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হবে।’’

