পুণে ব্যবসায়ী খুনের রহস্যভেদ: লোহগড় দুর্গের নিরাপত্তারক্ষীর বয়ান ও সিসিটিভি ফুটেজে ফাঁস হবু স্ত্রী সিয়া ও প্রেমিকের ভয়ংকর ছক

পুণে ব্যবসায়ী খুনের রহস্যভেদ: লোহগড় দুর্গের নিরাপত্তারক্ষীর বয়ান ও সিসিটিভি ফুটেজে ফাঁস হবু স্ত্রী সিয়া ও প্রেমিকের ভয়ংকর ছক

মহারাষ্ট্রের পুণেতে কোটিপতি ব্যবসায়ীপুত্র কেতনবিশাল অগ্রবাল খুনের ঘটনায় উঠে এল রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ১৮ জুন লোহগড় দুর্গের ট্রেকিং রুটে পাহাড়ের খাদ থেকে ধাক্কা মেরে কেতনকে ফেলে খুনের অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বাগ্‌দত্তা (হবু স্ত্রী) সিয়া গয়াল এবং সিয়ার প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধরীর বিরুদ্ধে। এবার এই হত্যাকাণ্ডের কিনারা করতে পুণে (গ্রামীণ) পুলিশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন লোহগড় দুর্গের নিরাপত্তারক্ষী ধীরজ যাদব। ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, খুনের দিন ঘটনাস্থলের কাছে উপস্থিত থাকা এই প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ও সিসিটিভি ফুটেজের যুগলবন্দিতেই সিয়ার ‘দুর্ঘটনা তত্ত্ব’ খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে।

নেটওয়ার্কের সমস্যা ও নিরাপত্তারক্ষীর বয়ান

লোহগড় দুর্গের টিকিট কাউন্টারে কর্মরত নিরাপত্তারক্ষী ধীরজ যাদব পুলিশকে জানিয়েছেন, ১৮ জুন দুপুরে প্রথমে কেতন ও সিয়া সেখানে পৌঁছান। বেস এলাকায় দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে তাঁরা ডিজিটাল স্ক্যানার দিয়ে টিকিট কাটতে পারছিলেন না। তখন নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁদের পরামর্শ দেন স্ক্যানারের ছবি তুলে ওপরে যেখানে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে, সেখান থেকে অনলাইন বুকিং সম্পন্ন করতে। এর পরেই কেতন ও সিয়া পাহাড়ের চূড়ার দিকে রওনা দেন।

এর ঠিক কিছুক্ষণ পরই হুডি এবং হেডফোন পরিহিত চেতন কাউন্টারে পৌঁছান। নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে টিকিট কাটতে বললে চেতন জানান যে তিনি কেবল ‘জগিং’ করছেন এবং ফেরার পথে প্রবেশমূল্য দিয়ে দেবেন। কিন্তু পরে টিকিট না কেটেই দ্রুত পাহাড় থেকে নেমে যান চেতন। পুলিশের দাবি, ধীরজের এই বয়ান সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছে, যা প্রমাণ করে চেতনের উপস্থিতি সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত ছিল।

এর আগেও দু’বার খুনের চেষ্টা

পুলিশি জেরার মুখে অবশেষে ভেঙে পড়ে প্রেমিক চেতনের সহায়তায় হবু স্বামীকে খুনের কথা কবুল করেছেন সিয়া। তদন্তে জানা গিয়েছে, এটিই কেতনকে খুনের প্রথম চেষ্টা ছিল না।

  • ৩১ মে: কেতন ও সিয়া প্রথমবার লোহগড় দুর্গে যান এবং রুটটি রেকি করেন।
  • ৪ জুন: চার দিন পরেই সিয়া আবার কেতনকে সেখানে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করেন, কিন্তু কেতনের মা সেবার বাধা দেওয়ায় পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
  • ১৪ জুন: সিয়া পুনরায় কেতনকে লোহগড়ে নিয়ে যান এবং পাহাড়ের খাঁদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। সে যাত্রায় কেতন একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। কেতন কারণ জানতে চাইলে সিয়া ‘সাপ দেখার’ নাটক করে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেন।

ক্যাফেতে খুনের ব্লু-প্রিন্ট ও কোটি টাকার বিয়ের আসর বাতিল

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ১৮ জুন সকালে পুণের একটি ক্যাফেতে বসে চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন সিয়া ও চেতন। তাঁরা দুর্গের ট্রেকিং পথের এমন কিছু দুর্গম জায়গা চিহ্নিত করেন যেখান থেকে সিসিটিভি এড়িয়ে ধাক্কা দেওয়া সম্ভব। বিকেলে কেতন ও সিয়া লোহাগড়ে পৌঁছালে হুডি পরা চেতন তাঁদের পিছু নেন। প্রায় ৩-৪ ঘণ্টার এই ট্রেকিং পথে চেতন ক্রমাগত হাতের ইশারায় সিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন।

খুনের নেপথ্য কারণ: তদন্তে প্রকাশ, পেশায় সহকর্মী চেতনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল সিয়ার। এর মধ্যেই পারিবারিক সম্মতিতে ব্যবসায়ীপুত্র কেতনের সঙ্গে তাঁর বাগ্‌দান সম্পন্ন হয়। আগামী নভেম্বর মাসে রাজস্থানের উদয়পুরে কয়েক কোটি টাকা খরচ করে একটি বিলাসবহুল হাভেলি ভাড়া করে তাঁদের রাজকীয় বিয়ের প্রস্তুতিও চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু কেতনকে বিয়ে করতে চাননি সিয়া। কোটি টাকার সেই বিয়ে আটকাতেই প্রেমিককে সঙ্গী করে হবু স্বামীকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার এই ভয়ংকর নীলনকশা তৈরি করেন তিনি। পুলিশ ইতিমধ্যেই সিয়া ও চেতনকে গ্রেফতার করে ঘটনার পুনর্নির্মাণ শুরু করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.